কবিরসাব উঠে দাঁড়িয়ে আমার হাত ধরলেন। চলুন মিঞা, আপনাকে ঘরে পৌঁছিয়ে দিয়ে আসি।
-আমি একা চলে যেতে পারব।
তিনি হাসলেন। -আপনি এখনও একা হাঁটতে শেখেননি, মিঞা। আরও অপমান সহ্য করুন। তারপর তো পারবেন।
-আরও কত অপমান সহ্য করতে হবে আমাকে?
-আপনার জীবনে এখনও অপমান আসেনি, মিঞা। তবে এবার আসবে। রামরহিমের কাছে প্রার্থণা করি, আপনি যেন অত অপমান সহ্য করতে পারেন। আপনার কোনও ঘর নেই, আমি জানি। কবিরদাস প্রার্থনা মঞ্জুর হোক, আপনি শব্দের ভেতরে নিজের ঘর খুঁজে পাবেন। শব্দই আপনার শিকড়, মিঞা।
বলতে বলতে তিনি আমার কপালে চুম্বন করেছিলেন। তারপর আমার পিঠে হাত রেখে বললেন, যাওয়ার আগে একটা কিস্সা শুনে যান মিঞা। খুশ -দিল নিয়ে যেতে পারবেন। চলুন, যেতে যেতে বলি।
কাশীর গলির গলি পেরিয়ে যেতে যেতে কবিরসাব তাঁর কিস্সা বুনতে লাগলেন, বহুদিন মরুভূমিতে ঘুরতে ঘুরতে এক দরবেশ এক গ্রামে এসে পৌঁছলেন। তবে সেই জায়গাটিও বড় রুক্ষ, সবুজ প্রায় চোখেই পড়ে না বলতে গেলে। পশুপালন করেই জীবন কাটাতে হয়। ওখানকার মানুষদের। রাস্তায় দরবেশ একটি লোককে জিজ্ঞেস করলেন, একরাত থাকার মতো জায়গা কোথাও পাওয়া যাবে কিনা। লোকটা মাথা চুলকে বলল, আমাদের গ্রামে তো এখন কোনও থাকার জায়গা নেই। কেই বা আসে এখানে। তবে শাকিরসাবের বাড়িতে যেতে পারেন। উনি খুশি হয়েই লোকজনকে আশ্রয় দেন।
-সে বুঝি খুব ভালো মানুষ?
-হ্যাঁ, এমন মানুষ দ্বিতীয়টি আর এ-তল্লাটে নেই। পয়সাকড়িও প্রচুর। হাদ্দাদ তার ধারকাছেও আসবে না।
-হাদ্দাদ কে?
-পাশের গ্রামে থাকে। চলুন, শাকিরসাবের বাড়ির পথটা আপনাকে দেখিয়ে দিই।
শাকির আর তার বউ-মেয়েরা দরবেশকে খুবই আপ্যায়ন করল। একরাতের বদলে বেশ। কয়েকদিন দরবেশ থেকে গেলেন। যাওয়ার সময় শাকির পথের জন্য প্রচুর খাবার, জল দিয়ে দিল। দরবেশ তাকে আর্শীবাদ করে বললেন, আল্লা করুন, তোমার আরও সমৃদ্ধি হোক।
শাকির হেসে বলল, দরবেশ বাবা, চোখে যা দেখছেন, তাতে ভুলবেন না। এ-ও একদিন চলে যাবে।
দরবেশ শাকিরের কথা শুনে অবাক হয়ে গেলেন। কী মানে এই কথার? তারপর নিজেকেই বললেন, আমার পথ তো প্রশ্ন করার নয়। নীরবে শুনে যেতে হবে। সব কথার মানে একদিন নিজে থেকেই ধরা দেবে। সুফিসাধনায় এই শিক্ষাই তো তিনি পেয়েছেন।
দেশে-দেশে ঘুরে বছর পাঁচেক কেটে গেল। দরবেশ আবার সেই গ্রামে ফিরে এলেন। শাকিরের খোঁজ জানতে চাইলেন। জানা গেল, শাকির এখন পাশের গ্রামে থাকে। হাদ্দাদের বাড়িতে কাজ করে। দরবেশ সেই গ্রামে গিয়ে শাকিরের সঙ্গে দেখা করলেন। শাকিরকে আগের চেয়ে অনেক বুড়ো মনে হল, জামাকাপড়ও ছেড়াফাটা। শাকির আগের মতোই দরবেশকে আপ্যায়ন।
-এই অবস্থা কী করে হল তোমার? দরবেশ জিগ্যেস করলেন।
-তিন বছর আগে বিরাট বন্যা হল। আমার সব জন্তু জানোয়ার ভেসে গেল, বাড়ি ডুবে গেল। তখন হাদ্দাদ ভাইয়ের দরজাতে এসে দাঁড়াতে হল।
দরবেশ বেশ কয়েকদিন শাকিরেরে ঘরে থাকলেন। যাওয়ার সময় শাকির আগের মতোই খাবারদাবার, জল দিয়ে দিল। দরবেশ শাকিরকে বললেন, তোমার এই অবস্থা দেখে আমার খুবই কষ্ট হচ্ছে। তবে এও জানি, খোদা বিনা কারণে কিছু করেন না।
শাকির হেসে বলল, এ-ও একদিন চলে যাবে।
তার মানে? শাকির এই অবস্থা থেকে আবার উঠে দাঁড়াতে পারবে? কী করে? প্রশ্নগুলো মনে এলেও দরবেশ তাদের সরিয়ে দিলেন। অর্থ তো একদিন নিজে থেকেই ধরা দেবে।
আরও কয়েক বছর ঘুরেফিরে দরবেশ একই গ্রামে ফিরে এলেন। দেখলেন, শাকির আবার বড়লোক হয়ে গেছে। হাদ্দাদের কোনও সন্তান ছিল না। মারা যাওয়ার সময় সব সম্পত্তি শাকিরকে দিয়ে গেছে সে। এবারও বেশ কয়েকদিন শাকিরের কাছে থাকলেন তিনি। যাওয়ার সময় শাকির আবারও বলল, এ-ও একদিন চলে যাবে।
দরবেশ এবার মক্কা ঘুরে এসে শাকিরের সাথে দেখা করতে গেলেন। শাকির মারা গেছে। দরবেশ শাকিরের কবরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে গেলেন। কবরের গায়ে লেখা। আছে, এ-ও একদিন চলে যাবে। দরবেশ ভাবলেন, গরিব বড়লোক হয়, বড়লোকও গরিব হয়, কিন্তু কবর কী করে বদলাবে? এরপর থেকে প্রতি বছর দরবেশ শাকিরের কবর দেখতে আসতেন, কবরের সামনে বসে প্রার্থণা করতেন। একবার এসে দেখলেন, বন্যায় সব ভেসে গেছে। শাকিরের কবরও ধুয়ে মুছে সাফ। খণ্ডহর হয়ে যাওয়া কবরখানায় বসে দরবেশ। আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, এ-ও একদিন চলে যাবে।
দরবেশ যখন আর চলাফেরা করতে পারেন না, তখন এক জায়গায় থিতু হলেন। বহু মানুষ তাঁর কাছে আসত উপদেশ শুনতে। তার মতো জ্ঞানী নেই, খবরটা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। নবাবের উজির-এ-আজমের কানে গিয়েও পৌঁছল কথাটা।
সে এক মজার ব্যাপার মিঞা। নবাবের ইচ্ছে হয়েছিল একটা আংটি পরবেন। কিন্তু সেই আংটিতে এমন কিছু লেখা থাকবে, যাতে নবাব যখন বিসন্ন হবেন, আংটির লেখাঁটি পড়ে খুশ হবেন আর যখন সুখী থাকবেন, তখন আংটির লেখা পড়ে তিনি বিষণ্ণ হয়ে পড়বেন। কত মনিকার এল, কত জ্ঞানী-গুণীর সমাগম হল, কিন্তু নবাব কারও পরামর্শেই সন্তুষ্ট হলেন না। তখন উজির-এ-আজম দরবেশকে সব জানিয়ে খৎ পাঠালেন, আপনার সাহায্য ছাড়া এ-সমস্যার সমাধান হবে না। তাই আপনি একবার আসুন। দরবেশের তখন চলাফেরার ক্ষমতা কোথায়? তিনি চিঠিতে তার পরামর্শ জানিয়ে দিলেন।
