-না, জাঁহাপনা। আমি তো কতদিন স্নানই করি না।
-তা হলে?
-আজ স্নান করতে করতে যা দেখলাম, আমি জল থেকে উঠতেই পারছিলাম না।
-কী দেখলে? হাজার হাজার কুমির তোমার দিকে ধেয়ে আসছে? সম্রাটের কথায় দরবার জুড়ে হাসির রোল উঠল।
-সে বড় মজার দৃশ্য জাঁহাপনা। ছুঁচের মাথায় ফুটো দেখেছেন তো?
-ছুচ? সে আবার কী?
-গোস্তাকি মাফ করবেন। জাঁহাপনারা কে আর কবে ছুঁচ দেখেছেন। কী বোঝাই আপনাকে—
সিকন্দর লোদি চিৎকার করে উঠলেন, কে আছিস, ছুঁচ নিয়ে আয়। এমন কী জিনিস, তা আমি দেখিনি।
আমি হেসে ফেললাম। সম্রাট আরও জোরে গর্জে উঠলেন, হাসছ কেন কাফের? হাসির কী হল?
বুঝলেন মির্জা, হাসি দেখেও যারা খেপে ওঠে, তাদের আর দুর্দশার অন্ত থাকে না। জাঁহাপনার দিকে তাকিয়ে আমি একটা কবিতা নিজেকেই শোনাচ্ছিলাম;
এই নগরে কোটাল হবে কে?
মাংস এত ছড়িয়ে আছে–
চৌকিদারি শকুন করে যে।
ইঁদুর তরী, বিড়াল তাকে বায়,
দাদুরী শুয়ে, সর্প পাহারায়।
বলদ বিয়োয়, বন্ধ্যা হল গাই,
তিন সন্ধে বাছুর দোয়ায় তাই।
শেয়াল রোজই সিংহের সাথে জোঝে।
কবীর -কথা বিরল কেউ তা বোঝে।
দরবারে এবার ছুঁচ এল। সম্রাট ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে উঁচটি দেখলেন, ঘুচের মাথার ফুটোয় চোখ রাখলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ছুঁচের কথা কী হচ্ছিল?
-ঘঁচের ফুটো দিয়ে কিছু দেখলেন জাঁহাপনা?
-না। এই ফুটো দিয়ে কিছু দেখা যায়?
-আমি কী দেখছিলাম, এবার তাহলে বলি। ছুঁচের মাথার ফুটোর চেয়েও সরু একটা গলি দিয়ে একসারি উট চলে যাচ্ছে।
-বখোয়াস বন্ধ করো। মিথ্যেবাদী কোথাকার।
-মিথ্যে কথা বলছি না হুজুর। জন্নত আর এই দুনিয়া কত দূরে আপনি তো জানেন জাঁহাপনা। সূর্য আর চাঁদের মধ্যে যে দূরত্ব সেখানে কোটি কোটি হাতি, উট ধরে যেতে পারে। চোখের তারার একটা বিন্দুর ভেতর দিয়ে আমরা তাদের দেখি। জাঁহাপনা আপনি তো জানেন, চোখের তারার সেই বিন্দু ছুঁচের মাথার ফুটোর চেয়েও ছোট।
সম্রাট আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর আমাকে ছেড়ে দিলেন। মির্জাসাব, আর সবকিছু আপনি লুকোতে পারেন, কিন্তু চোখের ভাষা লুকোতে পারবেন না। আনন্দে, বিষাদে আমাদের মন চোখেই এসে ঘর খুঁজে নেবে। সে এক আশ্চর্য সরোবর। তার দিকে তাকালে একেবারে গভীর পর্যন্ত আমি দেখতে পাই। আপনাকে আমি রোজ দেখি মির্জাসাব, আর ভাবি, রামরহিমের পা ছুঁয়ে থেকেও কত না খিদমতগারি করতে হচ্ছে আপনাকে, কোথাও আপনি স্থির হয়ে বসতে পারছেন না।
কবিরসাবের কথা শুনে আমার হাসি পেল, বললুম, সবচেয়ে বড় কাফের যদি দুনিয়ায় কেউ থাকে, সে আমি। রামরহিমের পা ছোঁয়ার যোগ্যতা কোথায় আমার?
-আপনি শব্দের সাধক মির্জাসাব। শব্দ থেকে তাঁর জন্ম। তিনি কি আপনাকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন?
-কিন্তু আপনার মত সাধনা তো আমার জীবনে নেই।
-সাধনা কী এত সহজ, মিঞা? সে সাধ্য কী আমার। সাঁই দশ মাস ধরে যে চাদর বোনেন, আমি তার একটু যত্ন করেছি মাত্র, যাতে ময়লা না লাগে। যাঁর চাদর তার হাতেই তো একদিন তুলে দিতে হবে। ময়লা চাদর কি ফিরিয়ে দেওয়া যায়, বলুন?
-আমি তো নোংরা চাদরই তাঁর হাতে তুলে দেব কবিরজি।
-তা কি করে হবে? সে তো আপনি পারবেনই না, মির্জাসাব। সময় হলে তিনি আপনাকে দিয়েই চাদরখানা পরিস্কার করিয়ে নেবেন। তা হলে কবীরদাসের গান আপনাকে শোনাই—
সাহিব হৈ রংগবেজ চু
নর মেরী রংগ ডারী।
স্যাহী রংগ ছুড়ায়কেরো
দিয়ে মজীঠা রংগ।
ধোয়েসে ছুটে নহীঁ রে
দিন দিন হোত সুরংগ।
ভাবকে কুণ্ড নেহকে জলমেঁ।
প্রেম দংগ দই বোর।
দুঃখ দই মৈল ছুটায় দেরে
খুব রংগী ঝকঝোর।।
সাহিবনে চুনরে রংগীরে
পীতম চতুর সুজান।
সব কুছ উনপর বার দূঁ রে
তন মন ধন ঔর প্রাণ
কহৈঁ কবীর রংরেজ পিয়া রে
মুঝপর হুয় দয়াল।
শীতল চুনরী ওঢ়িকে বে
ভঙ্গ হোঁ মগন নিগাল।।
মিঞা, ভবের কুণ্ডে প্রীতির জলে তিনিই তো প্রেম রং-এ আপনার চাদরটা রাঙিয়ে দেবেন। তিনি দিয়েছেন, তিনি নেবেন, রূপ -রস-রং-এ রাঙিয়ে, তবেই না নেবেন। আপনার সাধ্য কী যে তাঁর হাতে ময়লা চাদর তুলে দেবেন। আবার ঘরে ফিরে যান মিঞা, ভোর হতে আর বেশী দেরী নেই, আপনাকে তো আবার বেরিয়ে পড়তে হবে।
-আপনি যাবেন না?
– গঙ্গামাইকে ভৈরবী শুনিয়ে তবে না আমি ঘরে যেতে পারব।
-আমি আর কোথাও যাব না কবিরসাব। কাশীতেই থেকে যাব। এত দৌড়ঝাঁপ আমার ভালো লাগে না।
কবিরসাব মাথা ঝাকাতে লাগলেন।-না, না মিঞা, এ কথা ঠিক নয়, জীবন আপনার সামনে যে-পথ খুলে দিয়েছে, সে পথটুকু আপনাকে পেরোতেই হবে। সে-পথে যত কষ্ট, যত বঞ্চনা থাক, সাহিবের লিখে যাওয়া পথটাকে আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না। আপনার পথে আপনি ছাড়া কে যাবে, বলুন?
-কলকাতায় গিয়ে আমি কি কিছু পাব?
-যা চাইছেন, তা হয়তো পাবেন না। আরও অনেক কিছু পাবেন, যা শাহজাহানাবাদ আপনাকে দিতে পারে নি, কাশী দিতে পারবে না। শুনুন মিঞা, মরার আগে আমি কাশী ছেড়ে মগহরে চলে গিয়েছিলাম। মহগরে যাব শুনে সবাই বলে, কাশীর মতো পবিত্র ছেড়ে মহগর? ওখানে মরলে তো পরজন্মে গাধা হয়ে জন্মাতে হবে। তা-ই হবে। সাহিব যদি চান, আমি আবার গাধা হয়ে জন্মাব, তবে তাই হোক। কিন্তু তিনিই তো ঠিক করে দিয়েছেন, মহগরে গিয়েই মরতে হবে আমাকে। মহগরে পৌঁছনোর আগে অমী নদীর তীরে কসরবাল গ্রামে কিছুদিন ছিলাম। বিজলী খাঁ তখন মহগর শাসন করেন। তিনি আমাদের জন্য ভাণ্ডারার ব্যবস্থা করেছিলেন। মহগরে বারো বছর ধরে খরা চলছিল, কোথাও একফোঁটা জল পাওয়া যায় না। আমাদের ভাণ্ডারায় গোরখনাথ নামে এক সাধুজি ছিলেন। সবাই তাকে গিয়ে ধরল সাধুজি মাটিতে পা ঠুকে জলস্রোত বইয়ে দিলেন। কিন্তু তাতেও জলের অভাব মিটল না। তখন সবাই আমাকে এসে ধরল। আমি যত বোঝাই, গোরখনাথজির মত সাধু আমি নই, আমার কোনও ক্ষমতাই নেই, তারা কিছুতেই কথা শোনে না। মিঞা, সত্যি বলছি মাটিতে পা ঠুকে জলস্রোত বইয়ে দেব, এমন ক্ষমতা আমার ছিল না। আমি বললাম, সবাই মিলে রামনাম করো, প্রভুই যা করার করবেন। ভাণ্ডারার সবাই রামনাম গাইতে শুরু করল। বিশ্বাস করুন মিঞা, সত্যি সত্যিই রামনামের গুণে বর্ষা নামল। অমী নদী জলে ফুলেফেঁপে উঠল। রাম নামে কী হতে পারে, তা তো আমি মহগরে যাওয়ার পথেই দেখতে পেলাম। দয়াল আমাকে এজন্যই তো কাশী থেকে মহগরে নিয়ে এসেছিলেন। এরপর যদি আমি গাধা হয়ে জন্মাই, তাতে কী এসে যায় বলুন?
