হারেথ একদিন রাবেয়ার গোপন অভিসারের কথা জানতে পারল। বখতাসকে রাজধানী থেকে বের করে দেওয়া হল; কয়েকদিন পরে জানা গেল, তাঁকে খুন করা হয়েছে। দাঁড়িয়ে দেখল, কালো আকাশের বুক চিরে এক ঝাঁক সারস উড়ে যাচ্ছে। তারপর সে স্নানঘরে গিয়েছিল; চুলের কাঁটা দিয়ে বিদ্ধ করেছিল হাতের শিরা, প্রবাহিত রক্তের দিকে সে আচ্ছন্নের মতো তাকিয়েছিল, তারপর সেই রক্ত দিয়ে স্নানঘরের দেওয়ালে লিখেছিল তার শেষ কবিতা, বিষ পান করো রাবেয়া, তবু মুখে যেন মিষ্টি লেগে থাকে। মান্টোভাই, সে রাতে আমি খুব অস্থির হয়ে পড়েছিলুম; আমার দিলরুবা যদি রাবেয়ার মতো…কিন্তু কেন…আমার দুনিয়ায় তো কেউ কাউকে ভালবাসে না; কোঠার একটা মেয়ে, তার সঙ্গে আমার দুদিনের দেখা, সে-ই বা আমাকে রাবেয়ার মত ভালবাসবে কেন? মণীকর্ণিকার ঘাটে বসে এইসব ভাবতে ভাবতেই শুনতে পেলুম, কে যেন গুন গুন করে গাইছে :
কৌন মুরলী শব্দ সুন আনন্দভয়ে
জোত বরে বিন বাতী।
বিনা মূলকে কমল প্রগট ভয়ো
ফুলবা ফুলত ভাঁতী ভাঁতী।
জৈসে চাকোর চন্দ্রমা চিতবে।
জৈসে চাতৃক স্বাঁতী।
জৈসে সন্ত সুরতকে হোকে
হো হয়ে জনম সংঘাতী।
বেশ কিছু দূরে একজন ছায়া-ছায়া মানুষ বসে আছেন। গান তিনিই গাইছেন, বুঝতে পারলুম। আপন মনে মাথা নাড়তে নাড়তে আবার গেয়ে উঠলেন,
চরখা চলৈ সুরত-বিরহিনকা।
কায়া নগরী বনি অতি সুন্দর
মহল বনা চেতনকা।
সুরত ভাবরী হোত গগনমে
পীঢ়া জ্ঞান রতনকা।
মিহিন সূত বিরহিন কাঁতৈ
মাঝাঁ প্রেমে ভগতিকা
কহৈ কবীর শুনো ভাই সাধো।
মালা গূথৌ দিন রৈনকা।
পিয়া মোর ঐহেঁ পা রাখিহৈঁ
আসুঁ ভেট দৈহে নৈনকা।
গান শুনতে শুনতে আমি তাঁর পায়ের কাছে গিয়ে বসলুম। শীর্ণ একজন মানুষ, কোমরে শুধু একখণ্ড কাপড় জড়ানো, আর গলায় তুলসির মালা। মান্টোভাই, বিশ্বাস করুন, সে যেন গান নয়, বহুদিন ধরে আটকে থাক্কা কান্না বেরিয়ে আসছে। মানুষটার দুচোখ বোজা গাল ভিজে যাচ্ছে অশ্রুতে। তিবি যত গান গাইছেন, যত কাঁদছেন, ততই তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, গান শুনতে শুনতে, আমার ভিতরটাও শান্ত হয়ে আসছিল, একসময় আমিও গাইতে শুরু করেছিলুম, চরখা চলৈ সুরত-বিরহিনকা।
তিনি একসময় চোখ খুললেন, আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, কী মজা ভাবুন মির্জাসাব, প্রেমবিরহিনীর চরখা চলছে তো চলছেই।
-গুরুজি–
-গুরু কোথায় মিঞা! আমি তো কবিরদাস। আপনি যে গুরুর দাস, আমিও সেই গুরুরই দাস।
-কে সেই গুরু?
-মিঞা, বিষয়বাসনা নিয়ে মনপাখি এখানে-ওখানে উড়ে বেড়ায়। বাজপাখি যতক্ষণ না তাকে ঝাপট মেরে তুলে নিয়ে যাবে, ততক্ষণ তো গুরুর দেখা মিলবে না। তা, মিঞা, কাল তো আপনি কাশী ছেড়ে চলে যাবেন, তাই না?
-আপনি জানেন?
কবিরসাব হাসলেন।-রোজই তো দেখি, আপনাকে। কাশীর পথে ঘাটে ঘুরে বেড়ান। রোজ একটু-একটু করে দেখি আর একটু-একটু করে আপনার ভেতরে ঢুকি। এভাবে তো জানা হয়, না কি?
-আমার ভেতরে ঢোকেন? কীভাবে ঢোকেন?
-একটু ভুল হল মির্জাসাব। আমি ঢুকব, তার সাধ্য কী! এই যে দুটি নূর দেখছেন-কবিরসাব আঙুল দিয়ে তার দুটি চোখকে দেখান-এই দুটি নূরের মধ্যে দিয়েই আমার ভেতরে সব ঢুকে পড়ে। সে এক মজা হয়েছিল জানেন মির্জাসাব। তাও এই চোখ দুটো দিয়েই। শেখ তুকী নামে একজন পির ছিলেন এই কাশীতে। পিরসাহেব সিকন্দর লোদির কাছে গিয়ে আমার নামে নালিশ করলেন, আমি নাকি লোকের কাছে বলে বেড়াই, ভগবানের দেখা পেয়েছি। হাসি পায় না বলুন? আমার মতো সাধারণ দাসকে দেখা দেবেন কেন তিনি? সে যাকগে। সম্রাট আমাকে বন্দি করার জন্য পরোয়ানা জারি করলেন, তাঁর বিচারসভায় হাজির হওয়ার জন্য আমার বাড়িতে লোক পাঠালেন। তো আমি ওদের বললাম, সম্রাটের অত বড় বিচারসভায় আমার মত সামান্য মানুষকে ডাকা কেন?
-বিচার হবে, তাই-ই। একজন পেয়াদা বলল।
-জাঁহাপনার কাজ বিচার করা। তা তিনি বিচার করুন। যা শাস্তি দেবেন, মাথা পেতে নেব। কিন্তু আমি গিয়ে কী করব?
-সম্রাটের হুকুম।
-তাঁর হুকুম তিনি জারি করেছেন। তাই বলে আমাকে যেতে হবে কেন?
-জাঁহাপনার রাজত্বে বাস করো, ভুলে গেছ?
-রামরহিমের প্রজা আমি। তাঁদের তালুকেই আমার বাস। আপনাদের জাঁহাপনার অত বড় দুনিয়ায় বাস করার ক্ষমতা কোথায় আমার?
-তা হলে বেঁধে নিয়ে যেতে হবে দেখছি।
-তাই করুন। আপনাদের এত ক্ষমতা না দেখিয়ে, তা না দেখিয়ে, এমনি এমনিই নিয়ে যাবেন কেন? কিন্তু তার আগে আমি একটু স্নান করে আসি।
-কেন?
-সাফসুরত না হয়ে জাঁহাপনার দরবারে যাওয়া যায়?
আমি গঙ্গামাই-এর বুকে আশ্রয় নিলাম, পেয়াদারা সব ঘাটে বসে রইল। আপন মনে সাঁতার কাটতে কাটতে, জলে ডুবে থাকতে থাকতে বিকেল হয়ে এল। ঘাট থেকে পেয়াদারা মাঝে। মাঝেই চেঁচাচ্ছে, কত যে গালাগালি দিচ্ছে আমাকে, কিন্তু সে ব্যাটারা জলে এসেও নামবে না। জাঁহাপনার দেওয়া উর্দি ভিজে যাবে যে।
তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, আমাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে আসা হল দরবারে।
আমি চুপ করে সম্রাটের সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম। সম্রাট তাঁর পেয়াদাদের কাছ থেকে সব ঘটনা শুনে বললেন, সকালে তোমাকে আনতে পাঠিয়েছিলাম, সন্ধেয় এসে হাজির হলে? স্নান করতে তোমার এতক্ষণ লাগে?
