-ভিমটোসাব, সব কিছু আমার সঙ্গে বেইমানি করছে। সবাই বলে, ম্যাজিস্ট্রেট আমার গোঁফ দেখলেই নাকি, শালা, জেলখানায় ভরে দেবে। আমি কী করব, বলো?
অনেক কথার পর শেষ পর্যন্ত আমি বললাম, আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ তো কিছু নেই, তবে গোঁফ দেখলে ম্যাজিস্ট্রেটের মনে হতেই পারে…।
-তা বলে উড়িয়ে দেব? গোঁফে হাত বোলাতে বোলাতে মহম্মদ ভাই অসহায় চোখে আমার দিকে তাকায়।
-যদি মনে করেন।
-আমার মনে করায় কিছু আসে যায় না। শালা ম্যাজিস্ট্রেট কী ভাববে, সেটাই বড় কথা। তুমি কী বলে?
-তা হলে কেটেই ফেলুন।
পরদিন মহম্মদ ভাইকে দেখতে পেলাম, গোঁফহীন, আরো অসহায়।
কোর্টে মহম্মদ ভাইকে ভয়ঙ্কর গুণ্ডা বলে ঘোষণা করা হল। বলা হল, বোম্বাইয়ের বাইরে চলে। যেতে হবে তাকে। হাতে মাত্র একদিন সময়। আমরা সবাই কোর্টে গিয়েছিলাম। মহম্মদ ভাই রায় শুনে চুপচাপ বেরিয়ে এল। মাঝে মাঝেই তার হাত নাকের নীচে চলে যাচ্ছিল।
সন্ধেবেলা ইরানি হোটেলে জনাকুড়ি শাগির্দ নিয়ে চা খাচ্ছিল মহম্মদ ভাই। আমি তার মুখোমুখি গিয়ে বসলাম। দেখলাম, তার দৃষ্টি এই হোটেল, মহল্লা ছাড়িয়ে অনেক দূরে চলে গিয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম, কী ভাবছেন?
মহম্মদ ভাই ফেটে পড়লেন। -শালা যে মহম্মদ ভাইকে তুমি জানতে, সে মরে গেছে।
-কেন এত ভাবছেন? আপনাকে তো বাঁচতে হবে। বোম্বাইতে না হলে অন্য কোথাও।
-শোনো ভিমটোসাব, বাঁচা-মরা নিয়ে আমি ভাবি না। তোমাদের কথা শুনে, শালা বুরবাক আমি, গোঁফ কেটে ফেললাম। অন্য কোথাও গেলে আমি তো গোঁফটা নিয়েই যেতে পারতাম। এর চেয়ে ওরা আমাকে ফাঁসী দিতে পারত।
মহম্মদ ভাইকে আর আমি দেখিনি। কতদিন ভেবেছি, গোঁফের জন্য কেন এত দরদ ছিল তার? গোঁফটাই কি আসলে মহম্মদ ভাই? আমি এখনও জানি না। দুএকদিন পর অমৃতসর থেকে বিবিজানের চিঠি পেলাম, বোম্বাইতে আসবে, আমার জন্য বড় মন কেমন করে তার। আমিও চিঠি লিখলাম, এসো, বিবিজান, বোম্বাইতে আমিও বড় একা, এত একা আমি কখনও থাকতে চাইনি।
২৩. মণীকর্ণিকার ঘাটে
সরাপা আরজু হেনেনে বন্দহ কর দিয়া হমকো
বগরনহ্ হম খুদা থে গর দিল বেমুদ্দোয়া হোতা।
(আপাদমস্তক যাচনা বলেই আমি মানুষ মাত্র,
নইলে আমি তো ঈশ্বর হতাম, হৃদয় যদি বাসনারহিত হত।)
এক-একদিন মাঝরাতে মণীকর্ণিকার ঘাটে গিয়ে বসে থাকতুম। কাশী ছেড়ে আমার নড়তেই ইচ্ছে করছিল না। গঙ্গার ঠাণ্ডা হাওয়ায় আমার ভেতরের সব ক্ষোভ, বিক্ষিপ্ততা শান্ত হয়ে যেত; মনে হত, কলকাতায় গিয়ে কী হবে, কেন কয়েকটা টাকার জন্য এত পথ ছুটে মরছি আমি! মণীকর্ণিকার চিতার আগুন আমার সব কামনা-বাসনাকে পুড়িয়ে দিচ্ছিল; আর সেই ছাইয়ের ওপর অদৃশ্য থেকে কারা যেন ছিটিয়ে দিচ্ছিল গঙ্গার পবিত্র জল। ভাবতুম, ইসলামের খোলসটাকেও ছুঁড়ে ফেলে দেব, কপালে তিলক কেটে, হাতে জপমালা নিয়ে গঙ্গার তীরে বসেই জীবনটা কাটিয়ে দেব,আমার অস্তিত্ব যেন একেবারে মুছে যায়, একবিন্দু জলের মতো যেন হারিয়ে যেতে পারি দেবী গঙ্গার স্রোতোধারায়। আপনি কী হাসছেন, মান্টোভাই? হাসবারই কথা; এত ভোগ-লালসায় ডুবে থাকা মির্জা গালিব বলে কী? বিশ্বাস করুন, মণীকর্ণিকার ঘাটে বসে থেকে মন একেবারে সাদা পাতা হয়ে যেত, যেন এতদিন কোথাও কিছু ঘটে নি, আমার নতুন জীবন শুরু হতে চলেছে। কিন্তু অভিশপ্ত শাহজাহানাবাদ আমাকে ছেড়ে দেবে কেন বলুন? আমি তার নুন খেয়েছি, তার হিসাব তো চুকিয়ে যেতেই হবে। কাশীর মতো আলোর শহর তো আমার মতো মুনাফেকের জন্য নয়।
যেদিন কাশী ছাড়লুম, তার আগের দিন সন্ধে থেকে মণীকর্ণিকার ঘাটে গিয়ে বসেছিলুম। সেদিন আর কোঠায় যাইনি; জানতুম, ওখানে গেলেই দিলরুবার টানে আটকে যাব, আরও কয়েকদিন কাশীতে থেকে যেতেই হবে আমাকে। কিন্তু বুঝতেই তো পারছেন, ভাইজানেরা, তখন আমার বসে থাকলে চলবে না, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কলকাতায় পৌঁছতেই হবে, জানতুম, সে আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে, সারারাত আমার জন্য জেগে থাকবে; আমি কাশী ছেড়ে চলে যাওয়ার পর হয়তো মুনিরাবাইয়ের নিয়তিই তার জন্য অপেক্ষা করে ছিল। কী হয়েছিল তার, কে জানে! হয়তো ভুলেই গিয়েছিল, আর আমিও তা-ই চেয়েছিলুম, সে যেন আমাকে ভুলে যায়। আমি দেবী গঙ্গাকে বলেছিলুম, আমার স্মৃতি যেন তোমার স্রোতে ধুয়েমুছে যায়; কিন্তু মজা কী জানেন, আমি তো তার কথা ভুলতে পারছিলুম না; তার শরীরের স্মৃতি আমাকে। আকড়ে ধরেছিল, তার কণ্ঠস্বর ভেসে আসছিল কাশীর গলির পর গলি পেরিয়ে। আর আমি ভাবছিলাম রাবেয়া বলখির কথা। মণীকর্ণিকার ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে যাচ্ছিল টাটকা রক্তের ধারা, আমি দেখতে পাচ্ছিলুম।
রাবেয়ার কথা আপনি কী জানেন, মান্টোভাই? না জানারই কথা। মোল্লারা রাবেয়ার জীবনকে মুছে দিয়েছে। ইসলামি দুনিয়ার প্রথম মহিলা, প্রথম কবি, যে আত্মহত্যা করেছিল। কবিতা, প্রেম আর মৃত্যুর জটিল নকশা আঁকা হয়েছিল রাবেয়ার জীবনের জমিনে। বখের রাজকুমারি সে; গভীর অভিশাপ নিয়ে এ-দুনিয়ায় এসেছিল; নিজেকে সে নিরাশ্রয় ভেবেছিল এই পৃথিবীতে। ছোটবেলা থেকে কবিতা লেখার নেশায় মজেছিল রাবেয়া। কবিখ্যাতিও জুটেছিল। কিন্তু নিয়তি তার জন্য অন্য খেলা নিয়ে অপেক্ষা করছিল। আর তাই একদিন পরিচয় হল বখতাসের সঙ্গে। মামুলি এক ছেলে, রাবেয়ার ভাই হারেথের ক্রিতদাস। প্রথম দেখাতেই জ্বলে উঠল ইকের আগুন। গোপনে, দেখাসাক্ষাৎ শুরু হল তাদের, লেখা হতে লাগল একের পর এক কবিতা। বখতাস, বখতাস-রাবেয়ার কবিতায় কবিতায় শুধু তারই রূপমাধুর্য। মীরাবাইয়ের গানে গানে যেমন নীলাম্বর শ্যামরায়, তাঁর আশিক গিরিগোবর্ধনের লীলা।
