ডাক্তার চলে যাওয়ার পর আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে আপনি চেনেন মহম্মদ ভাই?
-চিনি না? এখানে এমন কেউ আছে, যাকে শালা মহম্মদ ভাই চেনে না? শোনো ইয়ার, মহম্মদ ভাই মহল্লার রাজা, সবার খোঁজ খবর রাখে। কত লোকজন জানো, আমরা? তারা সবকিছু জানিয়ে দেয়। কে কখন আসছে, যাচ্ছে, কে কী করছে? তোমার সম্পর্কে সব জানি আমি।
-তাই?
-শালা, আমি ছাড়া কে জানবে? তুমি অমৃতসর থেকে এসেছ, তো? কাশ্মীরি, ঠিক কি না, শালা?
তুমি একটা কাগজে কাজ করো। বাজারের বিসমিল্লা হোটেল তোমার কাছ থেকে দশ টাকা পায়, তাই তুমি ওই রাস্তা দিয়ে যাও না। ঠিক বলেছি? ভিন্ডিবাজারের পানোয়ালাটা তোমাকে দিনরাত খিস্তি করে। সিগ্রেটের জন্য শালা তোমার কাছে কুড়ি টাকা দশ আনা পায়।
আমি হাঁ করে তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, আর মনে হচ্ছিল, মাটির গভীরে তলিয়ে যাচ্ছি। এই লোকটার চোখ সব জায়গায়?
-ভিমটোসাব, কোই ডর নেহি। তোমার সব ধার আমি মিটিয়ে দিয়েছি। তুমি আবার সব নতুন করে শুরু করো। লজ্জা পাচ্ছো কেন, ভিমটোসাব? লম্বা জীবনে কত কী ঘটে। আমি সব শালাকে বলে দিয়েছি, তোমার পিছনে যেন না লাগে। মহম্মদ ভাইয়ের কথার, শালা, নড়চড় হয় না।
ভাইজানেরা, মহম্মদ ভাই শুনতে পেয়েছিলেন কি না জানি না, আমি বিড় বিড় করে বলেছিলাম, খোদা, আপনাকে খুশি রাখুন। মহম্মদ ভাই গোঁফ চুমড়োতে চুমড়োতে তার স্যাঙাতদের নিয়ে চলে গেল।
দুসপ্তাহের মাথায় আমি সুস্থ হয়ে উঠলাম। মহম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার ভাব জমে উঠল। অনেক সময়ই সে আমার কথা চুপচাপ শুনে যেত। ভাই আমার চেয়ে বছর পাঁচেকের বড় ছিল। শুধু তার গোঁফটা ছিল আমার বয়েসের চেয়ে অনেক বড়। পরে শুনেছিলাম, রোজ মাখন লাগিয়ে নাকি গোঁফের তরিবৎ করে মহম্মদ ভাই। আমি ভাবতাম, কে আসল মহম্মদ ভাই, তার গোঁফটা, না ধারালো ছোরাটা?
একদিন আরব গলির চিনা হোটেলের সামনে তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কথায় কথায় তাকে বললাম, মহম্মদ ভাই, এটা তো বন্দুক আর রিভলবারের যুগ। আপনি ছোরা নিয়ে ঘোরেন কেন?
গোঁফে হাত বোলাতে বোলাতে মহম্মদ ভাই বলে, ভিমটোসাব, বন্দুকের মতো বিরক্তিকর জিনিস আর নেই, শালা। একটা বাচ্চাও বন্দুক চালাতে পারবে। ট্রিগার টেপো, হয়ে গেল। কিন্তু ছোরা…খোদা কসম…ছোরা চালানোর মজাই আলাদা। তুমি একবার কী যেন বলেছিলে? হ্যাঁ, হ্যাঁ, আর্ট, শোনো ভিমটোসাব, ছোরা চালানোটা একটা আর্ট। আর রিভলবার কী? খিলৌনা। বলতে বলতে সে তার ঝকঝকে ছোরাটা বার করে।-দ্যাখো, একে দ্যাখো, শালা, কী ধার দ্যাখো। যখন চালাবে কোনও শব্দ হবে না। পেটে ঢুকিয়ে একটা মোচড়, সব শেষ। বন্দুক-ফন্দুক সব রাবিশ।
মহম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে যত মিশছিলাম, মনে হচ্ছিল, লোকটাকে সবাই এত ভয় পায় কেন? ইয়া বড় গোঁফটা ছাড়া তো ভাইয়ের মধ্যে ভয় পাওয়ার মতো কিছু নেই। ভয় আসলে বাইরে থাকে না, ভাইজানেরা, ভয় লুকিয়ে থাকে মানুষের মনের ভিতরের অন্ধকারে। একদিন অফিস যাওয়ার পথে চিনা হোটেলের সামনে শুনলাম, মহম্মদ ভাইকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে। তা কী করে সম্ভব? পুলিশের সঙ্গে ভাইয়ের বেশ ভালই মাখামাখি ছিল। তা। হলে? ঘটনাটা এইরকম : শিরিনবাই নামে আরব গলিতে এক বেশ্যা থাকত। তার একটা ছোট মেয়ে ছিল। ভাইকে গ্রেফতারের আগের দিন শিরনবাই মহম্মদ ভাইয়ের পায়ে গিয়ে পড়েছিল। তার মেয়েকে না কি কে ধর্ষণ করেছে।
-ভাই, আপনি মহল্লার দাদা, আর আমার মেয়েকে সেখানে বেইজ্জত করে গেল। আপনি বদলা নেবেন না?
ভাই নাকি শিরিনবাইকে প্রথমে অনেক খিস্তি খাস্তা করেছিল, তারপর গম্ভীর হয়ে বলেছিল, কী চাও, মাদারচোদের পেটটা ফাঁসিয়ে দেব? যাও শালী। কোঠাও যাও, যা করার আমি করব।
আধঘন্টার মধ্যেই কাজ খতম। লোকটা খুন হয়ে গেল। তবু মহম্মদ ভাইকে পুলিশ কী করে ধরল? ভাই এসব কাজের কোন সাক্ষী রাখে না, কেউ দেখলেও ভাইয়ের বিরুদ্ধে কিছু বলতে আসবে না। দুদিন লক আপে থাকার পর বেল পেল মহম্মদ ভাই। কিন্তু লক আপ থেকে। বেরিয়ে আসা ভাই যেন অন্য মানুষ। চিনা হোটেলে যখন তার সঙ্গে দেখা হল, মনে হচ্ছিল, একটা ঝোড়ো কাক। আমি কিছু বলার আগেই সে বলল, ভিমটোসাব, শালা মরতে এত সময় নিল। সব আমার দোষ। ঠিকঠাক ছোরা ঢোকাতে পারিনি। কী আশ্চর্য, ভাবুন ভাইজানেরা, একটা মানুষকে মারার জন্য তার দুঃখ নেই, সে ভাবছে ছোরাটা ঠিকঠাক চালানো হয় নি।
কোর্টে হাজিরার দিন যতই এগিয়ে আসছিল, মহম্মদ ভাই ততই মুষড়ে পড়ছিল। তার সঙ্গে কথা বলে বুঝেছিলাম, কোর্ট সম্পর্কে কোন ধারনাই নেই, তাই এত ভয়। কোর্ট তো দূরের কথা, হাজতেই কখনও থাকতে হয় নি ভাইকে। একদিন সে আমার হাত চেপে ধরল, ভিমটোসাব, কোর্টে যাওয়ার চেয়ে আমি মরে যাব, শালা। কোর্ট-ফোর্ট তো আমি কখনও দেখিনি।
আরব গলির স্যাঙাতরা তাঁকে বোঝালো, ভয়ের কিছু নেই, কোনও সাক্ষী নেই, কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বলতে যাবে না। তবে হ্যাঁ, তার পেল্লায় গোঁফ দেখে ম্যাজিস্ট্রেটের অন্যরকম ধারনা হতে পারে। এমন যার গোঁফ, সে ক্রিমিনাল না হয়ে যায় না।
একদিন ইরানি হোটেলে বসে আছি। মহম্মদ ভাই ছোরাটা বার করে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে ফেলল। আমি বললাম, এ কী করছেন, মহম্মদ ভাই।
