-কেন? তোমার জন্য সে কিছু করেছে নাকি?
-সেবার আমার কলেরা হয়েছিল, খবর পেয়ে মহম্মদ ভাই এসে হাজির। তারপর কী হল, জানো? ফরাস রোডের যত ডাক্তার, দেখি, সবাই আমার খোলিতে হাজির। মহম্মফ ভাই শুধু বলল, আশিকের যদি কিছু হয়, আমি তোমাদের দেখে নেব। ডাক্তাররা তো তার কথা শুনে থরথর করে কাঁপছে।
-তারপর?
-দুদিনেই ভাল হয়ে গেলাম। ফরিস্তা মান্টোসাব, ফরিস্তা ছাড়া আর কিছু নয় মহম্মদ ভাই।
আরও কত যে গল্প মহম্মদ ভাইকে নিয়ে। তার উরুর কাছে নাকি একটা ধারালো ছোরা বাঁধা থাকে। হাসতে হাসতে সে ওই ছোরা বার করে নানা খেলা দেখায়। এসব শুনতে শুনতে আমি তার চেহারাটা কল্পনা করতাম। লম্বা-পেশল শরীর, তাকালেই বুক হিম হয়ে যায়। তবু কিছুতেই নিজের চোখে মহম্মদ ভাইকে দেখা হয়ে উঠছিল না। মাঝে মাঝে ভাবতাম, একদিন। ছুটি নিয়ে লোকটাকে দেখতেই হবে। কিন্তু পত্রিকায় চাকরির যে কত হ্যাপা। সম্পাদক থেকে বেয়ারাগিরি-সবই প্রায় আমাকে করতে হত।
হঠাৎ একদিন ধুম জ্বর এল আমার, বিছানা থেকে ওঠার ক্ষমতা নেই। আশিকও গিয়েছে দেশের বাড়িতে। দুদিন একা একা খোলিতে পড়ে রইলাম। মাঝে মাঝে ইরানি হোটেলের ছেলেটা এসে খাবার দিয়ে যেত। বোম্বাইয়ে কে আমার খোঁজ নেবে? আমিই বা কজনকে চিনি? নাজিরসাবও জানতেন না, আমি কোথায় থাকি। মরে গেলে খবর পর্যন্ত পেত না। আর বোম্বাই এমন জায়গা, কে মরল আর কে বাঁচল, কেউ খোঁজ রাখে না।
তিনদিনের দিন ঠিক করলাম, যেভাবেই হোক উঠে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল। ভাবলাম, হোটেলের ছোকরাটা বোধহয় এসেছে।- ভেতরে আয়।
দরজা খুলে দেখলাম, একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমেই চোখে পড়ল তার পেল্লায় গোঁফ, দুহাতে সে গোঁফ মোচড়াচ্ছে। আমার মনে হল, গোঁফটা না থাকলে লোকটার দিকে কেউ ফিরেও তাকাবে না, এতই সাধারণ সে। চার-পাঁচজন লোক নিয়ে সে ঘরে ঢুকে পড়ল। তারপর নরম গলায় ডাকল, ভিমটোসাব–
-ভিমটো নেহি, মান্টো।
-একই হ্যায় শালা। ভিমটোসাব, এ তো ভাল কথা নয়। তোমার বুখার হয়েছে, আমাকে জানাও নি কেন?
-আপনি কে?
সে তার সঙ্গীদের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে বলল, মহম্মদ ভাই।
আমি ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসলাম। -মহম্মদ ভাই, মহম্মদ ভাই-দাদা?
-হ্যাঁ, ভিমটোসাব, আমি মহম্মদ দাদা। হোটেলের ছোকরাটাই বলল, তোমার তবিয়ত খুব খারাপ। এ তো শালা ভালো কথা নয়। আমাকে খবর পাঠালে না কেন? এমন হলে মহম্মদ ভাই শালার মেজাজ ঠিক থাকে না। এবার সে তার এক শাগিদের দিকে তাকায়, এই-এই। তোর নাম কী শালা? যা, ওই শালা ডাক্তারের কাছে যা। বলবি, মহম্মদ ভাই বলেছে, ডবল কুইক যেন চলে আসে। আর শালাকে সব যন্তরপাতি নিয়ে আস্তে বলবি।
আমি মহম্মদ ভাইকে দেখতে দেখতে তার সম্পর্কে শোনা গল্পগুলো ভাবছিলাম। কিন্তু যে মহম্মদ ভাইকে আমি কল্পনা করেছিলাম, এ তো সে নয়। শুধু তার গোঁফটা দেখতে পাচ্ছিলাম, আর মনে হচ্ছিল, একটা নরম মনের মানুষ শুধু বিরাট গোঁফ তৈরি করে মহল্লার দাদা হয়ে গেছে। আমার ঘরে কোনও চেয়ার ছিল না। তাই বিছানাতেই বসতে বললাম তাকে। মাছি ওড়ানোর ভঙ্গিতে হাত নাড়িয়ে মহম্মদ ভাই বলল, এসব ভাবতে হবে না, ভিমটোসাব।
দমচাপা খোলির মধ্যে পায়চারি করতে লাগল মহম্মদ ভাই। এক সময় দেখি, তার হাতে সেই বিখ্যাত ছোড়া ঝকঝকে করছে। মহম্মদ ভাই হাতের ওপর ছোরা ঘসছিল, আর লোমগুলো ঝরে পড়ছিল। দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, আমার জ্বর কয়েক ডিগ্রি নেমে গেছে। আমি আমতা-আমতা করে বললাম, মহম্মদ ভাই, ছোরাটা তো ভয়ানক ধারালো। আপনার হাত কেটে যেতে পারে।
-ভিমটোসাব ছোরাটা আমার দুশমনের জন্য। আমার হাত কেন কাটবে? তারপর ছোরাটার গায়ে হাত বুলোতে বুলোতে বলল, ছেলে কি বাবাকে মারতে পারে?
ডাক্তার এসে পৌঁছল। সে এক ভারী মজার ব্যাপার, মির্জাসাব, আমার নাম হয়ে গেছে ভিমটো আর ডাক্তারের নাম পিন্টো।
ডাক্তার পিন্টো মিনমিন করে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?
-সেটা শালা আমি বলব? ভিমটোসাবকে ভাল না করতে পারলে, শালা, তোমাকে দাম চোকাতে হবে।
ডাক্তার পিন্টো আমাকে সবরকম ভাবে দেখে মহম্মদ ভাইকে বলল, ভয়ের কিছু নেই মহম্মদ ভাই। ম্যালেরিয়া। আমি একটা শট দিয়ে দিচ্ছি।
-ডাক্তার, এসবের আমি কিছু বুঝি না। শট দিতে চাইলে, শালা, শট দাও, কিন্তু খারাপ কিছু হলে–
-সব ঠিক হয়ে যাবে মহম্মদ ভাই। তা হলে শটটা দিয়ে দিই। বলে ডাক্তার পিন্টো ব্যাগ খুলে সিরিঞ্জ আর ইঞ্জেকশনের অ্যাম্পুল বের করল।
-দাঁড়াও ডাক্তার। মহম্মদ ভাই প্রায় আর্তনাদ করে উঠল। ডাক্তার ভয় পেয়ে ব্যাগে সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে ফেলল।
-এসব সুঁই দেওয়া-ফেওয়া, শালা আমি দেখতে পারি না। বলতে বলতে মহম্মদ ভাই তার স্যাঙাৎদের নিয়ে খোলি থেকে বেরিয়ে গেল।
ডাক্তার পিন্টো খুব সাবধানে কুইনাইন ইঞ্জেকশন দিল আমাকে। জিজ্ঞেস করলাম, কত দিতে হবে?
-দশ টাকা।
ব্যাগ বার করে ডাক্তার পিন্টোর হাতে টাকা দিতেই মহম্মদ ভাই এসে ঢুকল। -শালা, এসব কী হচ্ছে?
ডাক্তার পিন্টো কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, মহম্মদ ভাই খোদা কসম, আমি কিছু চাইনি।
-শালা, টাকা চাইলে আমার কাছে চাও। ভিমটোসাবকে এক্ষুনি টাকা ফেরত দাও। তারপর আমার দিকে ফিরে মহম্মদ ভাই বলতে থাকে, আমার এলাকার ডাক্তার তোমার কাছ থেকে। টাকা নেবে ভিমটোসাব? শালা, এ-কখনও হতে পারে? তাহলে আমার গোঁফই কেটে ফেলব। জেনে রাখো ভিমটোসাব, আমার মহল্লার সবাই তোমার চাকর।
