হ্যাঁ, মাহিমে আমার দিদি ইকবাল বেগম ছিল বটে, কিন্তু তার বর আমাকে একদম দেখতে পারত না, কোনও দিন মাহিমে ওদের বাড়িতে ঢুকতে দেয় নি।
-বিবিজান, অমৃতসরে থেকে আমি করব বলো? এখানে কোনও কাজ আমার জুটবে না। বোম্বাইতে কিছু না কিছু হয়ে যাবে। আর নাজিরসাব যখন ডেকেছেন—
-বেটা তোমার দিদির কাছে শুনেছি, ওই শহরে কেউ কারো দিকে ফিরে পর্যন্ত তাকায় না।
-ভালই তো। একবার চেষ্টা করে দেখি, বিবিজান।
তখন আমার বয়স চব্বিশ। খোদার কাছে বিবিজানকে রেখে আমি বোম্বাইয়ের ডাকেই সাড়া দিলাম। ভাইজানেরা, বোম্বাই না দেখলে আমি জানতেই পারতাম না, এই দুনিয়াতে মানুষ কতরকম ভাবে বেঁচে থাকে। বোম্বাইয়ের ওপর-মহল আর নীচের মহলের মতো তফাত আর কোনও শহরে নেই। ওপর মহলে টাকা উড়ছে, কত রোশনাই, গ্ল্যামার; আর নীচের মহলে তত খিদে, অন্ধকার, খুনখারাবি। কিন্তু এই দুই মহলের মধ্যে গোপন যোগাযোগও আছে। সেসব বড় আশ্চর্য কিস্সা।
নাজির লুধিয়ানভি আমাকে কাজে জুতে দিলেন। তাঁর সাপ্তাহিক মুসাওয়ার পত্রিকার সম্পাদক হয়ে গেলাম আমি। মাইনে মাসে চল্লিশ টাকা। আমাকে আর পায় কে। এ তো শালা হাতে চাঁদ পাওয়া। অফিসেই একটা ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে নিলাম। কিন্তু বেশীদিন পোষাল না। অফিসের ঘরে থাকি বলে নাজিরসাব যখন তখন এসে বিরক্ত করতেন। লোকটাকে বোঝাই কী করে, আমি তো শুধু কাগজে চাকরি করার জন্য জন্মাইনি। আমার পড়া আছে, লেখা আছে, সবচেয়ে বড় কথা একা একা থাকতে ইচ্ছে করে আমার। তাই ঠিক করে ফেললাম, একটা বাসা ভাড়া নিতেই হবে।
রোজগার করি মাসে চল্লিশ টাকা। বোম্বাইতে তো এই টাকায় ভদ্র থাকার জায়গা পাওয়া যায় না। মাসে নটাকা ভাড়ায় একটা খোলিতে গিয়ে উঠলাম। খোলিই বটে। না দেখলে বুঝতে পারবেন না, ভাইজানেরা, সে কি মানুষের থাকার জায়গা, না ইঁদুরের গর্ত। একটা লড়ে দোতলা বাড়িতে চল্লিশটা খুপরি, সূর্যের আলো ঢোকে না, সবসময় স্যাঁতস্যাঁতে, দিনের বেলাতেও ঘরে আলো জ্বালিয়ে রাখতে হয়। মশা,ছাড়পোকা,ইঁদুর কী নেই সেখানে। মির্জাসাব, বোম্বাইয়ের ওই খোলিতেই আমি প্রথম দোজখ দেখেছি। খোলিতে আপনি মরে পড়ে থাকলেও কেউ খোঁজ নিতে যাবে না। চল্লিশটা খোলিতে কত যে মেয়ে-মরদ-বালবাচ্চা ছিল কে জানে। আর সবার হাগা-মোতা-চানের জন্য দরজা ভাঙা দুটো বাথরুম। সবাই জাগবার আগে আমি ঘুম থেকে উঠে গোসল সেরে বেরিয়ে পড়তাম। সারাদিন অফিসে কাটিয়ে অনেক রাতে ফিরতাম; সারা দিনের ক্লান্তি আর খোলির গরমে ভাজা ভাজা হতে হতে ঘুমিয়ে পড়তাম।
খোলির দিনগুলোর কথা বলতে হলে মহম্মদ কিস্সাটাও আপনাদের শোনাতে হবে। বোম্বাইয়ে যত আজিব মানুষ আমি দেখেছি, মহম্মদভাই সবার চেয়ে আলাদা। আমার খোলিটা ছিল আরব গলিতে। একটু বুঝিয়ে বলতে হবে। রেন্ডিপট্টির জন্য ফরাস রোড বিখ্যাত। ফরাস রোড থেকে একটু বাঁক নিলেই গিয়ে পৌঁছবেন সফেদ গলিতে। ওখানে অনেক কাফে আর রেস্তোরাঁ ছিল। পুরো জায়গা জুড়েই বেশ্যাদের কোঠি। ভারতবর্ষের সব জাত-ধর্মের বেশ্যা ওখানে পাবেন। সফেদ গলি ছাড়িয়ে ছিল একটা সিনেমা হল, প্লে হাউস, সারাদিন সিনেমা চলত।
একটা লোক সারাক্ষণ চেঁচিয়ে যেত, আইয়ে, আইয়ে, দো আনা মে ফার্স্ট ক্লাস শো। যাদের সিনেমা দেখার ইচ্ছে থাকত না, তেমন লোকেদেরও জোর করে হলে ঢুকিয়ে দিতে সে। আর এক মজার জিনিস ছিল। মালিশওয়ালা। যখন-তখন রাস্তায় বসে লোকজন মাথায় মালিশ করাচ্ছে। চোখ বুজে মালিশের আরাম নিতে নিতে কেউ কেউ গান গাইত। আমার বেশ মজাই লাগত। বাঁশের চিক লাগানো ছোট ছোট ঘরে বসে থাকত মেয়েগুলো। ওদের দাম? আট। আনা থেকে আট টাকা। আট টাকা থেকে আটশ টাকা। এই বাজারে এসে আপনি সব দেখেশুনে, পছন্দের মতো তাজা গোস্ত কিনে নিন।
আরব গলিতে জনা পঁচিশেক আরব থাকত; মুক্তো কেনাবেচাতেই নাকি ছিল ওদের ব্যবসা। আর যারা এই গলিতে থাকত, তার হয় পাঞ্জাবি, নয়তো রামপুরি। মহম্মদ ভাই থাকত আমাদের আরব গলিতেই। কেউ কারও খোঁজ না রাখুক, শুনেছি মহম্মদভাই নাকি মহল্লার সকলের খোঁজ রাখত। রামপুরের মানুষ, লাঠি খেলা, ছুরি চালানোয় একেবারে ওস্তাদ। এক সঙ্গে কুড়ি-পঁচিশটা লোককে কাবু করা তার কাছে জলভাত। তার ছুরি চালানোর হাত নিয়ে কত গল্প যে শুনেছি। এতই নিখুঁত ছিল তার হাত, যে মরছে, সে নাকি বুঝতেই পারত না। কিন্তু সবাই কসম খেয়ে একটা কথাই বলত, মেয়েছেলের দোষ মহম্মদের ভাইয়ের নেই। শুনেছি, গরিব, ভিখারি মেয়েদের সে সাহায্য করত। তার শার্গিদরা গিয়ে রোজ তাদের পয়সা। দিয়ে আসত। কী যে তার ধান্দা ছিল, তা আমি জানতাম না, শুনতাম, পোশাক-আশাকে বেশ ফিটফাট, খায়দায়ও ভাল, আর একটা ঝলমলে টাঙ্গায় চেপে দুতিনজন শার্গিদ নিয়ে সে মহল্লায় ঘুরে বেড়ায়। তার বেশীর ভাগ সময় কাটে ইরানি কাফেতে বসে। তো, এই মহম্মদ ভাইকে অনেকদিন ধরেই দেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আমি সকালে বেরিয়ে অনেক রাতে ফিরি, কিছুতেই তাঁকে দেখার সুযোগ পাচ্ছিলাম না। তার সম্পর্কে একটা আশ্চর্য গল্প শুনেছিলাম আশিক হুসেনের কাছে। আমার পাশের খোলিতেই থাকত আশিক, সিনেমায় নাচ করত।
একদিন কথায় কথায় আশিক বলল, মহম্মদ ভাইয়ের তুলনা নেই, মান্টোসাব।
