এবার মালতীর কথা বলছেন দামোদর গুপ্ত, মন দিয়ে শুনুন ভাইজানেরা, এ-কাব্য কবেই হারিয়ে ফেলেছি আমরা।
-এই বারাণসীতেই বাস করত মালতী নামে এর বারবনিতা। কামদেবের ঈর্ষণীয় শরীরী শক্তির মতোই বারাঙ্গনাকুলের ঈর্ষাপ্রদ অলঙ্কারের নাম মালতী। গরুড়কে দেখে গর্তবাসী নাগিণীদের যেমন শোক জেগে ওঠে, তাঁকে দেখেও তেমনই বিলাসিনী বারাঙ্গনাদের হৃদয় ইর্ষায় কাতর হয়। হিমালয়-কন্যা পার্বতী যেমন দেবেশ্বর মহাদেবের হৃদয় আকৃষ্ট করেছিলেন, মালতীও সেইরূপ ধনপতিদের হৃদয় আকর্ষণ করত। সমুদ্র মন্থনকালে শেষনাগের মন্থনরঙ্কুতে মান্দার পর্বত যেমন আবদ্ধ হয়েছিল, ভোগীদের চোখও তেমনই সর্বদা মালতীর প্রতি আবদ্ধ থাকত। শিবের শূলের ওপর আসীন অন্ধকাসুরের দেহের মতোই মালতী ছিল গণিকাবৃন্দের শীর্ষস্থানীয়া। সে ছিল স্মিতভাষী, লীলাময়ী, প্রেমাশ্রয়ী, পরিহাসপ্রিয়া ও বাকচাতুর্যে পারদর্শী। একদিন ছাদে বিচরণ করতে করতে মালতী একটা গান শুনতে পেল–
দূরে ফেলে দাও কামিনী তুমি
রূপমহিমা আর মক্তযৌবন
কৌশল করো যতনে এবার
কামুকহৃদয় করিতে হরণ।
গান শুনে বিপুলজঘনা মালতীর মনে হল, যে ওই গান গাইছে, সে আমার বন্ধুর মতোই উপদেশ দিয়েছে। কামবিলাসী পুরুষগণ যার ঘরে দিন-রাত পড়ে থাকে, সংসারের সর্ববিষয়ে অভিজ্ঞা সেই বিকরালার কেছেই এবার পরমর্শ নিতে হবে।
বিকরালা কে জানেন, মান্টোভাই? সে এক বুড়ি বেশ্যা। দাঁত নেই, চামড়া ঝুলে পড়েছে, স্তন শুকিয়ে গেছে, মাথায় কয়েকটা মাত্র সাদা চুল। কিন্তু তাঁকে ঘিরে থাকে সব গণিকারা। কেন? কীভাবে যোগ্য পুরুষ বাছবে, কেমনভাবে তার মন হরণ করবে, সেই পরমর্শের আশায়। শুনে আমার মনে হত, জীবন্ত কামনা-বাসনারা সব মৃত্যুর দরজায় এসে দাড়িয়েছে, একমাত্র মৃত্যুই যেন তাদের বলে দিতে পারে, কীভাবে জীবনকে উপভোগ করতে হয়। তাই মালতীর মতো বারাঙ্গনাকেও বিকরালার কাছে যেতে হল।
একদিকে কামনা-বাসনার কোঠি, অন্যদিকে মৃত্যুর মণিকর্ণিকা-একসঙ্গে শুধুমাত্র কাশীই ধারন করতে পারে। ঋষি নারদের এক আশ্চর্য কিস্সা শুনেছিলুম। এ হল গিয়ে ভৈরবী-যাতনার কথা। যেন স্বপ্নের মধ্যে পেরিয়ে এলুম অনেক জীবন। কামনা বাসনা মৃত্যু, সব সেখানে একাকার।নারদের গল্পটা না বললে ভৈরবী-যাতনার কথা বুঝতে পারবেন না, ভাইজানেরা। ব্রহ্মা একদিন নারদকে গঙ্গায় ডুব দিতে বললেন। নারদ ডুব দিয়ে উঠতেই কী দেখা গেল। জানেন? এক পরমাসুন্দরী কন্যা দাঁড়িয়ে আছে। বিয়ে হল; ছেলেমেয়ে, নাতিনাতনিও হল, তারপর একদিন সেই কন্যার বাবা আর স্বামীর মধ্যে বাধল ঘোরতর যুদ্ধ, যুদ্ধে দুজনেরই মৃত্যু হল, কন্যার অনেক সন্তানও মারা গেল। সহমৃতা হওয়ার জন্য স্বামীর চিতায় গিয়ে উঠল কন্যা। জ্বলে উঠল আগুন, কিন্তু আগুনের ভেতর কী আশ্চর্য ঠাণ্ডা, যেন নদীর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে সে। নারদ দেখলেন, তিনি সবে ডুব দিয়ে উঠেছেন। এর মধ্যেই ঘটে গেল এতকিছু? এসবই কাশিমাহাত্মের কথা, মান্টোভাই। দেবাদিদেব মহাদেব পার্বতীকে কী বলেছিলেন জানেন? কাশীতে থেকে আমি যে আনন্দ পাই, তা কোন যোগীর হৃদয়েও পাওয়া যায় না, পার্বতী, এমনকী কৈলাস বা মন্দার পর্বতেও নয়। পার্বতী এই বিশ্বে দুই অনন্তস্বরুপকেই আমি। ভালবাসি। তুমি পার্বতী, গৌরি আমার, যে তুমি সব কলাবিদ্যা জানো, আর এই কাশী। কাশী ছাড়া আমার অন্য কোনও জায়গা নেই। কাশীতেই আনন্দ, কাশীতেই নির্বাসন। আমরা অনন্তকাল কাশিতেই থেকে যাব।
ওই আলোর শহর থেকে আমার একেবারেই যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু আমি তো বেরিয়েছি পেনশনের জন্য দরবার করতে, কলকাতায় যেতেই হবে আমাকে। না হলে খাব কী বলুন? শাহজাহানাবাদের হাভেলিতে কতগুলো মুখ আমার দিকে তাকিয়েই বসেছিল। আর ওপর পাওনাদাররা আছে। কাশীতে থেকে যেতে পারতুমই আমি। কিন্তু ওদিকে পাওনাদাররা তো। আমার পরিবারকে পথে নামিয়ে ছাড়ত। উমরাও বেগমকে হয়তো আমি ভালবাসিনি, কিন্তু তার ইজ্জতকে তো রাস্তায় এনে দাঁড় করাতে পারি না। এদিকে কাশীতে কোঠার সেই সুন্দরীও আমাকে ছাড়বে না, বার বার বলে, মিঞা আপনি থেকে যান, আপনার সঙ্গেই আমার। জীবনটাকে কেটে যাবে। কিন্তু কাশীতে টাকা কে দেবে আমাকে, মান্টোভাই? টাকা ফুরিয়ে গেলে মহব্বতও ফুরিয়ে যায়, সে আমি ভালভাবেই জানতুম। অত যে তার প্রেম, টাকা না থাকলে। সে-ও আমাকে লাথি মারতে একবার ভাববে না। শুধু একজন মানুষের স্মৃতি নিয়ে আমি কাশীকে বিদায় জানালুম। আজ বড় ঘুম পাচ্ছে ভাইজানেরা, পরে তার কথা বলব, সন্ত কবিরসাবের কথা কি অত সহজে বালা যায়? কাশীর মতোই অনন্তকাল ধরে যেন তিনি বেঁচে আছেন। নইলে তাঁর সঙ্গে তো আমার দেখা হওয়ার কথা নয়।
২২. আপনি চললেন কলকাতা
রও-মেঁ হৈ রখশ্-এ উমর, কহাঁ দেখিয়ে থমে,
ন হাথ বাগ পর হৈ, নহ্ পা হৈ রকাব-মেঁ
(জীবনের ঘোড়া ছুটে চলেছে, দ্যাখো কোথায় থামে;
হাতে আছে লাগাম, না পা আছে রেকাবে।)।
আপনি চললেন কলকাতা, মির্জাসাব, আর আমাকে ডাকল বোম্বাই। একেবারে নিষ্কর্মা হয়ে বসে আছি অমৃতসরে। বাবা মারা যাওয়ার পর মায়ের দেখাশোনার দায়িত্বও আমার ওপর বর্তাল। এদিকে রোজগারপাতি কিছু নেই। বিবিজানের জমানো টাকা ভেঙে চলতে লাগল; কিন্তু তাতে আর কতদিন চলবে? আমি কোন ধান্দায় না ঢুকতে পারলে তো একদিন মা-বেটা দুজনকেই না খেয়ে মরতে হবে। হঠাৎ নসিবে আলো এসে পড়ল। বোম্বাই থেকে নাজির লুধিয়ানভির ডাক এসে পৌঁছল। তাড়াতাড়ি বোম্বাই এসে আমার সাথে দেখা করো। বিবিজানকে বলতে সে তো কেঁদেকেটে একসা। -তুমি কী করে বোম্বাই যাবে বেটা? বোম্বাই তুমি চেনো? শুনেছি, কত বড় শহর। কে তোমার দেখভাল করবে?
