বিষ্ণু কঠোর তপস্যা শুরু করলেন। সুদর্শন চক্র দিয়ে এক পদ্মকুণ্ড তৈরি করলেন, তার শরীরের ঘামেই ভরে উঠল পুকুর, চক্ৰপুষ্করিণীর তীরে পাথেরের মত বসে থেকে তপস্যায় ডুবে গেলেন। দেখতে দেখতে চলে গেল পাঁচ লক্ষ বছর। হাঁ করে আছেন কেন, ভাইজানেরা? ওদের কাছে লক্ষ কোটি বছর তো কয়েক মুহূর্তের ব্যাপার। এ এক অদ্ভুত মজা।
একদিন শিব ও শক্তি এই পথে এসে বিষ্ণুকে দেখতে পেলেন। তপস্যার প্রভাবে বিষ্ণু যেন অগ্নশিখার মত জ্বলছেন। শিব তাঁকে বরপ্রার্থনা করতে বললেন, বিষ্ণু বললেন, আর কিছু চাই না ভগবান, শুধু আপনার কাছকাছি থাকতে চাই। বিষ্ণুর ভক্তি দেখে শিব এমন আনন্দে মাথা নাড়লেন যে তার কানের অলঙ্কার-মণিকর্ণিকা গিয়ে পড়ল চক্ৰপুষ্করিণীর জলে। বিষ্ণুকে তথাস্তু বলে শিব আরো বললেন-এখন থেকে এই চক্ৰপুষ্করিণীর নাম হবে মণিকর্ণিকা। এই ঘাটের শ্মশানেই মানুষ তার পার্থিব শরীরটাকে তুলে দেয় মৃত্যুর হাতে, তারপর অন্য শরীর পেয়ে ঊধ্বলোকে চলে যায়। মান্টোভাই, মধ্যরাত অবধি আমি মণিকর্ণিকার ঘাটে বসে থাকতুম, একের পর এক জ্বলন্ত চিতার লেলিহান শিখা দেখতুম, আর মনে হত, আবার যদি এক জন্ম পাই, তবে যেন আমার শরীর এমন চিতাতেই পোড়ানো হয়, আমি যেন অন্তরীক্ষে মিশে যেতে পারি। লোকের মুখে মুখে কত যে কিস্সা শুনেছি। একবার একজন বলেছিল, অন্য জায়গায় রাজা হওয়ার চেয়ে কাশীর রাস্তায় গাধা হয়ে ঘুরে বেড়ানো, আকাশে পাখি হয়ে ভেসে থাকা অনেক পুণ্যের।
না, ভাইজানেরা, শুধু মৃত্যুর কথা আপনাদের শোনাতে বসিনি। মৃত্যুর অন্যপিঠে যা, আমাদের কাম, সে-কথা না বললে তো কাশির বৃত্তান্ত সম্পূর্ণ হয় না। কাম শুধু নারীর শরীরে থাকে না, সংগীতে-নৃত্যে-হাওয়ার স্পর্শে-সৌরভে, সবকিছুতেই রয়ে গিয়েছে কাম; আমাদের কামনা বাসনার কত যে কিস্সা। কাশীর তবায়েফদের কোনও তুলনা নেই, মান্টোভাই, সে সৌন্দর্য বলুন, আর ভালবাসার প্রকাশই বলুন। ভগবান বুদ্ধদেবের সময়ের একজন তবায়েফের কথা শুনেছিলুম। তিনি এক রাতে যে টাকা নিতেন, তা নাকি কাশির রাজার একদিনের রাজস্বের সমান ছিল। মৃত্যুর পাশাপাশি এ অন্য এক কাশী, তার শরীরে কামনার কত যে চন্দনপ্রলেপ। এই কাশী যেন নিজেই যেন এক নারী। না হলে কাশী ছেড়ে গিয়ে ঋষি অগস্তের ওই দশা কেন হবে বলুন? কাশী ছেড়ে অগস্ত্যকে দক্ষিণ ভারতে যেতে হয়েছিল। গোদাবরীর তীরে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতেও কাশির জন্য বিরহ তিনি সহ্য করতে পারেননি। উত্তর দিক থেকে ভেসে আসা হাওয়াকে জড়িয়ে ধরে তিনি জিজ্ঞেস করতেন, বলো তো আমার কাশী কেমন আছে? আমিও কাশীতে এসেই একজনের জন্য লিখেছিলুম,
ফির কুছ এক দিলকো বেকারারী হ্যায়,
সিনহ্ জুয়া-এ জখমকারী হ্যায়।।
(হৃদয় আবার অশান্ত
সে খুঁজছে কোনও আততায়ীকে।)
মাফ করবেন, মান্টোভাই, তার নাম আমার মনে নেই, কিন্তু গোরে যাওয়ার দিন তক্ সেই ছুরি। আমার হৃদয়ে বিঁধে ছিল। তার কাছে কত কিস্সা শুনেছি; সত্যি বলতে কী, শোওয়ার জন্য নয়, তার সৌরভ আর কিস্সা শোনার জন্যই তার কাছে যেতুম আমি। তার কাছে কুট্টনীমত কাব্যের কথা শুনেছিলাম। দামোদর গুপ্তের নাম শুনেছেন? কাশ্মীরের রাজা জয়াপীড়ের প্রধানমন্ত্রী তিনি, অনেক বয়েসেই লিখেছিলেন কুট্টনীমত। বাৎস্যায়নের কামসূত্র-এর পরে যেসব কামশাস্ত্র পাওয়া যায় তাদের মধ্যে প্রাচীনতম। এই কাব্যের কাহিনী লেখা হয়েছে। কাশীকে ঘিরেই। কেমন সে নগরী? ভাইজানেরা, মাফ করবেন, সে-নগরীর কথা আমাদের। ঘেয়ো ভাষায় বলা সম্ভব নয়; মনে করুন দামোদর গুপ্ত আজ আমাদের মাঝে এসে বারাণসী ও তার বারাঙ্গনাদের রূপবর্ণনা করছেন। এবার কবি দামোদর গুপ্তের মুখেই শুনুন :
-অনুরাগে রঞ্জিতা নারীর বাঁকাচোখের চাহনিতে যে কামনা বাসা বাঁধে, রতির পদ্মমুখে যে কামনা ভ্রমরের মতো বারবার চুম্বনে আগ্রহী সেই কামনার অধীশ্বর মদনদেবের জয় হোক।
নিখিল বিশ্বের অলঙ্কারস্বরুপ প্রভূত ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্যমণ্ডিত নগরী বারানসী ব্ৰহ্মজ্ঞ পণ্ডিতদের সমাবেশে সমুজ্জ্বল। এই নগরীর মহিমা এমনই ঐতিহ্যমণ্ডিত যে সেখানকার মানুষ ঐশ্বর্যভোগে আসক্ত হলেও জটাজালে চন্দ্ৰশোভিত মহাদেবের সঙ্গলাভ তাদের পক্ষে দুঃসাধ্য নয়। এই বারানসী নগরীর বারবনিতাগণ বহুস্ব- স্বর্ণালঙ্কারে সজ্জিত থাকেন। তাঁরা ঐশ্বর্যশালিনী এবং সর্বদাই নাগর পরিবেষ্টিত হয়ে সময় কাটান। তাদের দেহসৌষ্ঠব পশুপতির মতোই কোমল ও সুন্দর। সেখানকার আকাশ্রুম্বি দেবালয়গুলির শিখরে চিত্রিত পতাকাসমূহ বাতাসে আন্দোলিত হওয়ায় নভোদেশ পুস্পিত উদ্যানের মতই সুন্দর শোভমান। বনিতাদের ইতস্তত ভ্রমণে ধরণীতল তাদেরই পদতলের রক্তরাগে রঞ্জিত। দেখে মনে হয়, ভূমিতল বুঝি স্থলপদ্মে ঢাকা। আকাশ-বাতাস মুখরিত তাদের ভূষণ-শিঞ্জনে, ফলে পাঠরত ছাত্রদের ঘটে পাঠস্থলন যা আচার্যগণ শোধন করতে অক্ষম দেবদেবী অধ্যুষিত স্বর্গের অমরাবতী নগরী যেমন নন্দন বনের সমারোহে শোভিত এবং বহু দেবসেনায় সেবিত, ঠিক সেইরূপ বারাণসী নগরীও বহু বিদগ্ধমানুষের অধ্যুষিত এবং প্রবাহমান গঙ্গার সেবায় তুষ্ট হয়ে বিশ্বস্রষ্টার নির্মিত জগতের মাঝে আর এক অমরাবতীর মতোই বিরাজমান।
