-জনাব।
-আর্জি কি আছে মিঞা?
-নবাব বাহাদুরকে একবার সালাম জানাতে চাই।
-জানাইয়ে, ইয়ে তো নবাব বাহাদুরকাই দুনিয়া হ্যায়।
-একবার দরবারে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিন হুজুর।
-দেখি, কী করা যায়।
-তবে দুটো কথা আছে জনাব।
-আবার কী?
-আমি শাহজাহানাবাদের শায়র। দরবারে সেই মর্যাদাটুকু পাব আশা করি। বুজুর্গ আদমিরা কবিদের কিভাবে আপ্যায়ন করেন, সে তো আপনি জানেনই।
-দেখি
-অওর
– আরও কথা আছে নাকি?
-নবাব বাহাদুরকে কিন্তু কোন নজরানা দিতে পারব না। ওটা মাফ করে দিতে হবে।
সুভান আলি চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আয়েশ করে পান চিবোতে চিবোতে বললেন, বাড়ি ফিরে যান মিঞা। নজরানা দেবেন না, আবার নবাব বাহাদুরের সঙ্গে দেখা করবেন, তা হয় নাকি? দরবারে আসার তারিকা জানেন না বুঝি?
নবাব গাজি-উদ-দীন হায়দরের সঙ্গে দেখা হল না মির্জার। অনেক আশা ছিল, নবাবের সামনে। একবার দাঁড়াতে পারলে, কিছু তো ইনাম মিলবেই। সুবান আলি সেই আশায় জল ঢেলে দিল। মির্জা তবু আরও কিছুদিন লখনউতে রয়ে গেল। লখনউয়ের মুশায়েরার রাতগুলো তো তাঁকে ফিরিয়ে দেয়নি, তার গজলের প্রশংসায় মেতে উঠেছে, সেইসব আলাপ-আলোচনায় মির্জা বুঝেছে, মরে যাওয়া দিল্লি তার কদর করতে না পারলেও, লখনউ-এর জান তার কবিতায় সারা দিয়েছে।
তারপর আবার বেরিয়ে পড়ো। বান্দা, ইলাহাবাদ হয়ে কাশীতে এসে পৌঁছলুম। বান্দার নবাব জুলফিকার আলি বাহাদুর পথখরচের জন্য কিছু সাহায্যও করলেন আমাকে। ইলাহাবাদকে আমি একদম সহ্য করতে পারিনি, মান্টোভাই। একেবারে লাওয়ারিশ শহর, কোনও তমদুন নেই। কাশীতে পৌঁছে বুক ভরে শ্বাস নিতে পারলুম। এ এক আশ্চর্য আলোর শহর। মনে হল, এইরকম এক শহরেই আমি এতদিন পৌঁছতে চেয়েছি। সবাই বলে বেনারস, বেনারস; আমার ঘেন্না হয়, ইংরেজরা বলে বলেই আমাদেরও বলতে হবে না কী? হয় বারাণসী বলল, নয়তো কাশী। কাশী নামেই তো এ শহরের আসল পরিচয়। নওরঙ্গাবাদে একটা হাভেলিতে ঘর ভাড়া নিয়ে আমি মাসখানেক কাশীতে ছিলুম। দশাশ্বমেধঘাট, মণিকর্ণিকা ঘাটে বসে। থাকতে থাকতে মনে হত, দেবাদিদেব মহেশ্বরের এই শহরেই যদি সারাজীবন থেকে যেতে পারতুম। তা হলে তো আর নবাব -বাদশার দয়ার ভিখারি হতে হত না, গজল লিখতাম না, শুধু কাশীর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে, তবায়েফদের গান শুনে, সকাল-সন্ধ্যায় পূজো-আরতি দেখতে দেখতে আর ঘাটে বসে গঙ্গাপ্রবাহের দিকে তাকিয়ে থেকে কেমন রাহীর জীবন কাটিয়ে দেওয়া যেত।
ভাইজানেরা বিরক্ত হবেন না, কাশীর কথাটা একটু খোলসা করে বলতে হবে। জীবনে যে একবার কাশী দেখেন নি, আমি মনে করি, তার এখনও জন্মই হয় নি। মান্টোভাই, আপনি কি কাশীতে গিয়েছেন কখনও? যাননি? তা হলে আবারও আপনার জন্ম হবে, কাশী একবার দেখে আসতেই হবে আপনাকে, তবেই না বুঝবেন এই দুনিয়াতে একদিন জন্ম হয়েছিল আপনার! কী বলছেন? আপনার আগের জীবনটা? না, না, ও তো একটা খোয়াব মান্টোভাই, শুনুন, আপনি এখনও জন্মাননি। কাশী দেখার পরেই না বুঝতে পারবেন জন্ম-মৃত্যুর অর্থ কী?
বলতে পারেন, কাশীই এই গোটা দুনিয়াটা। ভারতের সব তীর্থস্থান আর পবিত্র জল, সব মিলেই কাশী, আলোর শহর, ভাইজানেরা। দেবাদিদেব শিবের ঘরগেরস্থালি এখানেই। কাশী এমন এক আলো, যা আপনার চোখের সামনে সব কিছু ফুটিয়ে তোলে; না, না চমকদার কিছু দেখতে পাবেন, ভাববেন না; এই দুনিয়ায় যা রয়েছে সে সবই ওই আলোয় স্পষ্ট দেখতে পাবেন আপনি। আবার দেখুন, কাশীতে যদি মৃত্যু হয়, তবেই এই জীবজন্ম থেকে মুক্তি পাব আমরা। কাশী মাহাত্ম্যের কত কথাই যে শুনেছিলুম; আমি দোজখের কীট, সে-সব কথা কবেই ভুলে গিয়েছি। তবে হ্যাঁ, মণিকর্ণিকার জন্মের কিস্সাটা ভুলিনি, মান্টোভাই। যেদিন কোঠায় না। যেতুম, বা কোঠায় গেলেও, সেখান থেকে বেরিয়ে আমি রোজ মণিকর্ণিকার ঘাটে গিয়ে বসতুম। মণিকর্ণিকা হচ্ছে সেই জায়গা যেখানে এই পৃথিবীর সৃষ্টি ও ধ্বংস এক হয়ে মিলে গিয়েছে। কেন জানেন? সময়ের একেবারে শুরুতে ভগবান বিষ্ণু এখানে তৈরী করেছিলেন পবিত্র কুণ্ড, আর এখানেই মহাশ্মশান, সময়ের শেষে সব পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। মণিকর্ণিকার জন্মের কথাটা শুনবেন নাকি, ভাইজানেরা? একমাত্র আমাদের দেশই বলতে পেরেছে, পুণ্যের কথা শুনলেও তোমার পাপ অনেকখানি লাগব হবে।
সে একসময় ছিল, না, না, ভুল বলছি, তখনও তো সময়ের জন্ম হয় নি, শুধুই ছিল অন্ধকার আর জলস্রোত। আকাশে সূর্য-চন্দ্র নেই; গ্রহ নক্ষত্রই বা আসবে কোথা থেকে? দিন-রাত্রী বলে কিছু নেই। শব্দ-গন্ধ -স্পর্শ -স্বাদ -আকার, কিছুই ছিল না। শুধু ছিলেন তিনি, অনাদি ব্ৰহ্ম, যাঁকে কোনও কিছু দিয়েই ধরাছোঁয়া যায় না। কিন্তু সেই অসীম নৈঃশব্দ্য, গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে কতদিন তিনি একা একা থাকবেন? তাই তিনি সৃষ্টি করলেন একজন ঈশ্বরকে। তিনিই শিব। শিবের অংশ থেকে জন্ম নিলেন শক্তি, তিনি প্রকৃতি ও মায়া। তারা দুজনে মিলে তৈরী করলেন পাঁচ ক্রোশের ভূখণ্ড কাশী। একদিন শিব ও শক্তি ভাবলেন, যদি আরেকজন কাউকে সৃষ্টি করা যায়, যে তৈরী করবে পৃথিবী, তার রক্ষণাবেক্ষণও করবে। তখনই জন্ম হল বিষ্ণুর। শিব ও শক্তি পৃথিবীর সবকিছু তৈরি করার জন্য বিষ্ণুকে নির্দেশ দিলেম।
