না, না, উতলা হবেন না ভাইজানেরা, এবার আমার ভ্রমণের কিস্সাই আপনাদের শোনাব। এক-একসময় ভেবেছিলাম, এই দিনগুলোর কথা ফারসিতে লিখে রাখতে হয়। কিন্তু সময় হয়ে ওঠেনি। তার চেয়েও বড় কথা, দিল্লিতে ফিরে আসার পর সারা জীবনের জন্য এমন সব জালে জড়িয়ে গেলুম যে, লিখতে বসার কথা ভাবলে হাত নড়তে চাইত না। কিন্তু আমি জানি, সেই দিনগুলোর কথা লিখে রাখতে পারলে ফারসি গদ্যে আমি এক নতুন দুনিয়া খুলে দিতে পারতুম। আসুন, আপনাদের সঙ্গে মির্জার ভ্রমণবৃত্তান্তটা আমিও একবার ফিরে চোখে দেখি।
১৮২৭-এর বসন্ত। মির্জা গালিব শাহজাহানাবাদ থেকে বেরিয়ে পড়ল তার ভাগ্যের খোঁজে। তার পূর্বপুরুষেরা বেরিয়ে পড়ত অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে; ধুলোর ঝড় তুলে, তলোয়ার ঘোরাতে ঘোরাতে, সে তো বীর সৈনিকদের যাত্রা। আর মির্জা গালিব তো কলকাতা চলেছে, তার পেনশনের জন্য দরবার করতে। সঙ্গে দু-তিনজন চাকর বই আর কেউ নেই। কখনও ঘোড়ায়, কখনও গরুর গাড়িতে চেপে তার টিকিয়ে টিকিয়ে চলা। রাতে কোন সরাইখানায় থাকো, যদি তা না মেলে, তবে পথেই তাঁবু খাঁটিয়ে থাকার বন্দোবস্ত করে নিতে হবে। দিনের বেলা তবু একরকম, সামনে অনন্ত পথ, কিন্তু রাতগুলো তো একেবারে অন্ধকারে জমাট বাঁধা, পথের কোন হদিশ নেই, চাকরবাকরের সঙ্গে কতক্ষণ আর কথা বলা যায়, তাই নিজের সঙ্গেই নিজে কথা বলো। মির্জার একা-একা কথা বলার মানে কী জানেন তো,ভাইজানেরা। কথার পর কথায় আপনি কেবল নিজেকেই ঠকিয়ে যাবেন, কত স্বপ্নের মিনার বানিয়ে তুলবেন, পরের মুহূর্তেই সে মিনার চুরচুর করে ভেঙে পড়বে।
কানপুরে পৌঁছে মির্জার শরীরটা বেশ খারাপ হয়েছিল। এদিকে কানপুরে কোন হাকিমের দেখা মেলে না। তা হলে লখনউ না গিয়ে উপায় নেই। এ-যাত্রায় লখনউ যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। মির্জার। তবে মির্জা কলকাতা যাচ্ছে শুনে লখনউয়ের বহু শরিফ আদমি জানিয়েছিলেন, পথে একবার আমাদের শহরটাও ঘুরে যান। লখনউ-এর প্রতি মির্জারও লোভ কম ছিল না। দিল্লি কবেই তার রোশনাই হারিয়ে ফেলেছে। মুঘল সংস্কৃতির যা-কিছু সবই লখনউতে। কবেই সওদা, মীরসাবের মত কবিরা দিল্লি ছেড়ে লখনউতে চলে গিয়েছেন। মির্জা ভেবে ঠিক করল, লখনউটা একবার ঘুরেই যাওয়া যাক। নবাবের কাছ থেকে নিশ্চয় কিছু ইনাম মিলবে, দুএকটা মুশায়েরায় গজল শুনিয়েও রোজগার হবে; পথের খরচ কিছুটা জোগাড় হয়ে যাবে। পাল্কি ভাড়া করা হল, সেই পাল্কিতে চেপে গঙ্গা পেরিয়ে লখনউ পৌঁছল মির্জা।
কী বলব,ভাইজানেরা, সেই লখনউকে বুঝিয়ে বলার মতো ভাষা আমার ঝুলিতে নেই। শুধু একটা কথাই বলতে পারি, এ-শহর যেন হিন্দুস্থানের বাগদাদ। আর রাতের লখনউ-এর কথা কী বলব? তাকে তো পরতে পরতে আদর করতে ইচ্ছে করে, প্রত্যেকটা রাত যেন নতুন নতুন সুরতের রাত, প্রত্যেকটা চুম্বনের পরেও যেমন আরও অনেক চুম্বন বাকি থেকে যায়, তেমনই আকাক্ষা নিয়ে জেগে থাকার রাত। সেই শহরের সেরা কবি তখন কে জানেন? নাসিখসাব। গজল ছাড়া কখনও কিছু লেখেনে নি। আমার প্রথমদিকের গজলে নাসিখসাবের ছায়া খুঁজে পেলেও পেতে পারেন। নাসিখসাব তাঁর হাভেলিতে আমাকে দাওয়াত দিলেন। আমি তাঁকে বললুম, নবাবের কাছে একবার যাওয়া যাবে না নাসিখসাব।
-আগের সে দিন আর নেই মিঞা।
-মানে? নবাব আমার সঙ্গে দেখা করবেন না।
-এখন অনেক মই বেয়ে তাঁর কাছে পৌঁছতে হয়।
-কীরকম?
-নবাবের উজির-এ আজম হচ্ছেন মোতামিদদৌলা আগা মীর। তাঁর পরের উজির সুলতান সুভান আলি খান। সুভান আলিকে খুশি করে পৌঁছতে হবে আগামীর সাবের কাছে। তিনি খুশ হলে তবে গিয়ে পৌঁছবেন নবাবের সামনে। এ তো আর নবাব আসফ-উদ-দৌলার আমল নয়, তিনি সওদাসাবকে নিজে দরবারে ডেকে নিয়েছিলেন। বেগম শামসউন্নিসাও ছিলেন শায়রা। নবাবের এক গজলের উত্তরে বেগম কী লিখেছিলেন জানেন?
-শুনাইয়ে জনাব।
-খুশি দিল মে হম্ অপনে কম দেখতে হ্যাঁয়
অগর দেখতে হ্যাঁয় তো গম দেখতে হ্যাঁয়
ন কহ কোই খুন কা বাকী হ্যায় দিল মে
ন আঁখো কো হম্ অপনী নম্ দেখতে হ্যায়।
তু আয়ে ন আয়ে য়হাঁ হম্ তো হর শব্
পড়ে বাহ্ তা সুবহুদম দেখতে হ্যাঁয়
-কেয়া বাত, কেয়া বাত। দিল কা এক টুকরা নিকল গয়া জনাব।
-মিঞা, আমাদের নবাব গাজি-উদ-দীন হায়দরের সময়ে দিল কা টুকরা নিকলতে নেহি।
–হায় আল্লা! তবু একবার চেষ্টা করে দেখুন। গরিবের কপালে যদি কিছু টাকা-পয়সা জোটে।
-জানি মিঞা, অনেক দূরের পথ যেতে হবে আপনাকে। চেষ্টা করি দেখি। আগে তো সুভান আলির কাছে যেতে হবে। সুভান আলির সামনে তো পৌঁছতে পারলুম। তাড়াহুড়োয় তাঁর জন্য কসীদা লিখে নিয়ে যেতে পারিনি, স্তুতি করে একটুকরো গদ্য লিখতে পেরেছিলুম। কিন্তু কী জানেন, কসীদা লিখতে আমার ভাল লাগত না; তবু লিখতে তো হয়েছে। সত্যি বলতে কী, জীবনে অর্ধেকটা সময় নবাব-বাদশা তাঁদের উজিরদের স্তুতি করে কবিতা লিখেই নষ্ট হয়ে গিয়েছে, মান্টোভাই। ওই গাধাগুলোর প্রশংসা করে কবিতা লেখার জন্য কি একজন কবির জন্ম হয়? তবু কী করব বলুন, পেটের ধান্দায় কবিতাকে কিচরে নামাতে হয়েছে। এ তো কবির ধর্ম হতে পারে না। কবির ইমানের পথ থেকে যে সরে গিয়েছি, তা আমি জানি। তবে একটা ব্যাপার লক্ষ করবেন। কসীদার শুরুটা আমি যেমন মনপ্রাণ দিয়ে লিখেছি, স্তুতির অংশে এসে কিন্তু দায়সারা কয়েকটা কথা বলেছি মাত্র। সুভান আলি আমার গদ্যটুকু পড়ে গম্ভীর মুখে বসে রইলেন। একে-ওকে নানা কথা বলতে লাগলেন। আমার দিকে আর ফিরেই তাকান না।
