-কী গল্প বলত?
ইউসুফ আর জুলেখার গল্প ও-ই আমাকে প্রথম শুনিয়েছিল।
-হুঁ। তারপর?
-জি?
-আগে বাড়ো, ভাই।
-একদিন বিকেলে আমার ঘরের দরজায় টোকা। আমি তখন চান করছি। চেঁচিয়ে বললাম, কে? খুশিয়া, আমি খুশিয়া। ও খুশিয়া, তা এইসময়ে হঠাৎ কেন? এখন তো খদ্দের আসে না। আমি জল গায়েই একটা ছোট তোয়ালে জড়িয়ে এসে দরজা খুললাম। আমাকে ওই অবস্থায় দেখে খুশিয়ার চোখ দুটো কেমন হয়ে গেছে। আমি বললাম, কী হয়েছে খুশিয়া? আমি চান করছিলাম। না, না, তুমি ভেতরে এসে বসো। এলেই যখন একটু চা নিয়ে আসতে পারতে। রামুটা আজ সকালেই পালিয়ে গেছে। খুশিয়া আমার দিকে তাকাতে পারছিল না। ও এমনই সরল ছিল মান্টোসাব। মাথা নীচু করে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর বলল, যাও, যাও, চান করো গিয়ে, এই অবস্থায় কেউ দরজা খোলে? আমি না হয় পরেই আসতাম।
-তুমিও বেশ লজ্জা পেয়েছিলে, তাই না কান্তা?
-না। লজ্জা পাব কেন? ও তো আমার খুশিয়া। ওর কাছে আবার লজ্জা কী?
-খুশিয়া তোমাকে এভাবে আগে কখনও দেখেছিল?
– না। কিন্তু খুশিয়া তো আমার ঘরের লোক। ও তো আর খদ্দের নয়।
-তারপর?
-খুশিয়া কি পাগল হয়ে গেছিল, মান্টোসাব?
-কেন?
-ও চলে গেল। সন্ধে পেরিয়ে গেল, খুশিয়া এল না। আমার ঘরেও সেদিন খদ্দের নেই। হঠাৎ একসময় দরজার কড়া নড়ে উঠল। দরজা খুলে দেখি, অচেনা একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। বলল, যাবে? বাবু বাইরে গাড়িতে বসে আছেন?
-এখানে নিয়ে এসো।
-বাবু কোঠায় আসবেন না।
-কেন?
-বলছি না, বাবু কোঠায় আসেন না। যেতে হলে চলো। কত চাও? আগাম দিচ্ছি।
-তুমি গেলে? আমি কান্তাকে জিজ্ঞেস করি।
-কি করব বলুন?
-খুশিয়া নেই, খদ্দের নেই, আমাকে তো দিনের রোজগারটা করতেই হবে। কোঠায় যারা আসে না, তারা টাকাও বেশী দেয়। না গিয়ে কী করব? বড় রাস্তার সামনেই ট্যাক্সিটা দাঁড়িয়েছিল। দালালটা আমকে ট্যাক্সিতে উঠিয়ে দিয়েই হাত বাড়িয়ে নিজের হিস্যা নিয়ে নিল। টাক্সি ছুটতে শুরু করল।
ট্যাক্সির ভেতরের অন্ধকারে প্রথমে তাঁকে খেয়াল করিনি। চোখ সয়ে যেতে খুশিয়াটাকে দেখতে পেলাম।
-খুশিয়া তুম?
-টাকা পেয়েছ তো?
-খুশিয়া
-চোপ্। টাকা পেয়েছ, যা বলব তাই করবে।
-কী করেছিল খুশিয়া?
-কিছু না। অনেক দূর যাওয়ার পর, আমাকে ট্যাক্সি থেকে নামিয়ে দিল।
-আর তুমি?
-আমি তো রাস্তা চিনি না। একা একা দাঁড়িয়ে থাকলাম। রাস্তাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ভোর হলে ফিরে এসেছিলাম কোঠায়। মান্টোসাব, খুশিয়া আমার সঙ্গে কেন এমনটা করেছিল, বলতে পারেন?
আমি কান্তাকে সেদিন কিছু বলতে পারিনি। খুশিয়ার কথা আমি অনেকদিন ভেবেছি। প্রতিশোধ মানুষের এক আদিম প্রবৃত্তি। খুশিয়া প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল। সে কোঠার দালাল হতে পারে, কিন্তু সে-ও তো একজন পুরুষ। খুশিয়াকে দালাল ভাবতে ভাবতে কান্তা এই সত্যটাই ভুলে গেছিল, তাই প্রায় নগ্ন হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পেরেছিল, আরে তুমি তো আমাদের খুশিয়া। তোমার কাছে আবার শরম কীসের?
পৌরুষ এক ভয়ঙ্কর জিনিস, ভাইজানেরা, সে যখন জেগে ওঠে, এই দুনিয়াটাকেই ভেঙে-চুরে ফেলতে চায়। কেন জানেন? পৌরুষ একটা কাচের পুতুল, আছাড় মারলেই ভেঙে যায়। তাই সামান্য আঘাতেই সে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ভাববেন না, ওটা শুধু পুরুষের মধ্যেই থাকে; মেয়ারাও। তাঁকে বহন করে। পৌরুষ কী জানেন? আমিই শেষ কথা, এর পরে আর কোনও কথা নেই।
আরে ভাই, শেষ কথা বলার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে? যে-দুনিয়ার কোথায় শুরু, কোথায় শেষ, তাই আমরা বুঝতে পারি না-সেখানে তুমি শেষ কথা বলতে এসেছ? প্রগেসিভ রাইটারদের তাই আমি সহ্য করতে পারতাম না। এরা জীবনের কিছুই দেখেনি, বানিয়ে বানিয়ে গল্প লেখে, তারপর এসে বলবে এটাই শেষ কথা। কোন পয়গম্বর তুমি যে তোমার কথাই জীবনের শেষ কথা বলে মেনে নেব আমি?
২১. যুবক রোহিত কে দেবরাজ ইন্দ্র
তা -কৈ য়েহ দপ্ত-গর্দী কব তক য়হ্ খস্তগী;
ইস্ জিন্দগীসে কুছ তুমে হাসিল হ্যায়, মর কহীঁ।
(এই মাঠে ঘাটে ঘোরা আর কত দিন, কত দিন এই ছন্নছাড়া দশা?
এমনভাবে বেঁচে থেকে কী হবে, মরলেই পারো।)
যুবক রোহিত কে দেবরাজ ইন্দ্র যা বলেছিলেন, সে কথাই আপনাদের বলছি, ভাইজানেরা, মন দিয়ে শুনুন। এ হচ্ছে জীবনটাকে নিয়ে একেবারে পথে গিয়ে দাঁড়ানোর কথা; কজন মানুষই। বা তা পারে? যদি কেউ একবার তা পারে, তবে তার চোখের সামনে থেকে সব পর্দা সরে যাবে, তখন বোঝা যায়, মান্টোভাই, কী লীলাখেলার মধ্যেই না আমরা এসেছি। হ্যাঁ, দেবরাজ ইন্দ্রের কথাই বলি। রোহিতকে তিনি বললেন, মনে রেখো, পথে যে বেরিয়ে পড়তে পারে না, তার জীবনে সুখ আসে না। মানুষের সমাজে বেশীদিন থাকলে ভাল মানুষও একদিন পাপী হয়ে যায়। তাই বলি, পথে গিয়ে দাঁড়াও, ভ্রমণের ভিতরে খুঁজে নাও জীবনকে। পথিকের দুই চরণ ফুলের মতো, তার আত্মাও দিনে দিনে বিকশিত হয়ে কত যে ফল ফলিয়ে তোলে। পথের ক্লান্তিই তার সব পাপকে সমূলে বিনাশ করে। তাই, ঘোরো, ঘুরে বেড়াও, রোহিত।
তিন বছরের মতো শাহজাহানাবাদ ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে পেরেছিলাম বলেই কত যে ফুল-ফলে। ভরে উঠেছিল আমার জীবন। কষ্ট কিছু কম হয়নি, অপমানও অনেক হজম করেছি, শেষ পর্যন্ত পেনশনের টাকাও আদায় করতে পারিনি। তবু এই তিন বছর এক আজিব তসবিরখানায় ঘুরে বেড়িয়েছি। দিল্লিতে যখন ফিরে এলুম, তখন আমি অন্য এক মানুষ; কেন জানেন? তার আগে আমার দুর্ভাগ্যের জন্য নানা মানুষকে, এমনকী খোদার ওপরেও দোষ চাপিয়েছি। কিন্তু দেশে দেশে ঘুরে যে-গালিব দিল্লিতে ফিরে এল, সে বুঝে গিয়েছিল, জীবন তোমার কাছে যেভাবে আসবে, সেভাবেই তাঁকে গ্রহণ করো, যদি পোকার মত মরতে হয়, তা-ও মরবে, নালিশ জানিয়ে বাড়তি কিছু পাবে না।
