মেয়েটাকে নিয়ে একটা হোটেলের ঘরে এসে উঠল সাজ্জাদ। এই প্রথম সে মেয়েটাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখল। চোখের পাতা ফোলা, সোজা তাকাতে পারছে না। মনে হচ্ছিল, মেয়টা যেন একটা পুরনো ঝুঁকে পড়া বাড়ি, সে কোনও মুহূর্তে ভেঙে পড়বে।
সাজ্জাদ বলল, মুখ তুলে একটু তাকাও।
-কী চান?
-কিছু না। কয়েকটা কথা বলো।
মেয়েটার চোখ টকটকে লাল। ভাষাহীন চোখে সে তাকিয়ে থাকল সাজ্জাদের দিকে।
-তোমার নাম কী?
-কিছু না।
-কোথায় ঘর ছিল?
-আপনি কোথায় চান?
-এমনভাবে বলছ কেন?
মেয়েটা যেন এক ঝটকায় ঘুম থেকে উঠল।-আপনার যা করার করুন। আমাকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে।
-কোথায়?
-যেখান থেকে নিয়ে এসেছেন।
-তুমি এখনই চলে যেতে পারো।
-যা চান করুন। এত কথা বলছেন কেন,সাব?
-আমি তোমাকে বুঝতে চাই।
মেয়েটা ফুঁসে ওঠে।- বোঝাবুঝির দরকার নেই, সাব। আপনার কাজ আপনি করুন, তা হলে আমি চলে যেতে পারি।
সাজ্জাদ মেয়েটার পাশে এসে বসে তার মাথায় হাত রেখেছিল। মেয়েটা এক ঝটকায় হাত সরিয়ে দেয়। -তঙ্গ মত কিজিয়ে, সাব। অনেকদিন আমি ঘুমোইনি। যেদিন থেকে এখানে এসেছি, আমি ঘুমোতে পারি নি।
-এখানে ঘুমিয়ে পড়ো।
তার চোখ আরও লাল হয়ে ওঠে।-আমি এখানে ঘুমোতে আসিনি। এ তো আমার ঘর নয়।
-ওই বাড়িটা-ওটা কি তোমার ঘর?
-বাখোয়শ বনধূ কিজিয়ে সাব। আমার কোনও ঘর নেই। আপনি আপনার সেরে নিন। না হলে আমাকে নিয়ে চলুন, ওই চুতিয়ার কাছ থেকে টাকা ফেরত নিয়ে নিন।
আর কোনও কথা হয় নি। সাজ্জাদ মেয়েটাকে সেই বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়ে এসেছিল।
না, না, ভাইজানেরা, কিস্সা এখানেই শেষ নয়। কোনও কিস্সা কি এত সহজে শেষ হতে চায়? কিস্সারও তো একটা দাবি আছে, না কি? সে তো আর এতিম নয় যে, যেখানে সেখানে তাকে ফেলে দিয়ে আসবেন।
পরদিন সন্ধেবেলা কায়সার পার্কের কাছেই একটা হোটেলে বসে চা খেতে খেতে বন্ধুকে আগের দিনের ঘটনাটা বলছিল সাজ্জাদ। বন্ধুটি শুনে খুব আঘাত পেয়েছিল, জিজ্ঞেস করেছিল কমবয়সী মেয়ে?
-জানি না। মেয়েটাকে ঠিকঠাক দেখিওনি আমি। একটা কথাই বারবার মনে হয়, রাস্তা থেকে ভারী পাথর তুলে কেন দালালটার মাথা ভেঙে দিইনি।
সেদিন বন্ধুর সঙ্গেও বেশীক্ষণ থাকতে ভাল লাগছিল না সাজ্জাদের। আগের দিনের ঘটনা থেকে সে কিছুতেই বেরোতে পারছিল না। বন্ধু চলে যাওয়ার পর সে ফুটপাথে এসে দাঁড়াল; চারদিকে চোখ চালিয়ে সেই দালালকে খুঁজছিল সাজ্জাদ। রাস্তার ওপারেই ঝুঁকে পড়া বাড়িটা। সাজ্জাদ বাড়িটাতে ঢুকে পড়ল। পা টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। একসময় প্রখর আলো ছড়ানো সেই ঘরের সামনেও পৌঁছে গেল। কোথাও কোনও শব্দ নেই। ভেজানো দরজা। ফাঁক করে ভেতরে তাকাল সাজ্জাদ। তীব্র আলোয় তার চোখ যেন ঝলসে গেল, দেখতে পেল, মেঝেতে একটা মেয়ে শুয়ে আছে। দোপাট্টায় মুখ ঢাকা তার। মেয়েটা কি মরে গেছে? সাজ্জাদ ঘরে ঢুকে পড়ল, মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বুঝল, সে ঘুমোচ্ছে। তারপরেই সে দেখতে পেল লোকটাকে, একটু দূরেই মেঝেতে পড়ে আছে, চাপ চাপ রক্তের ভেতরে। পাশেই পরে আছে রক্তমাখা ইট। ভাঙা মাথা থেকে তখনও রক্ত চুইয়ে পড়েছে।
এরপর আর কখনও সাজ্জাদকে ক্যায়সর পার্কের কাছে দেখা যায়নি। তারপর একদিন তাকে পাগলাগারদে ভর্তি করতে হয়েছিল। শেষমেশ তার কী হয়েছিল, আমি আর জানি না।
কোঠার মেয়েগুলো ভারি অদ্ভুত। সব কিছুর পরেও বেঁচে থাকাটা যেন ওদের কাছে নেশার মত। সৌগন্ধীর কী ছিল জীবনে? মাথধা দিনের পর দিন ওর সঙ্গে বেইমানি করে গেছে; যেদিন। বুঝতে পেরেছে, মাধোকে লাথি মেরে রাস্তায় বের করে দিয়েছে, কিন্তু নিজেকে খতম করতে যায়নি। কেনই বা করবে? কেউ তো তাকে একটা ফোঁটা ভালবাসা দেয়নি; নিজের জীবনকে সে নিজেই ভালবেসেছে। কী বলছেন, ভাইজানেরা? খুশিয়ার কথা শুনতে চান? হ্যাঁ, হ্যাঁ, তার কথা তো বলা হয়নি। আমি ভাবছিলাম, সৌগন্ধীর গল্পটাই আপনাদের বলি। তো, ঠিক হ্যায়, খুশিয়ার কথাই হোক। খুশিয়ার জন্য আমারও কি কম আগ্রহ ছিল? কেন সে ভুল বুঝেছিল কান্তাকে? সেই কথা জানতেই একদিন একা-একা কান্তার কোঠায় গিয়েছিলাম।
-আরে মান্টোসাব, আজ ইয়ারদোস্তরা সব কোথায়?
-তুমিই তো সেদিন আমাকে একা আসতে বলেছিলে।
কান্তা হেসে ওঠে।-একা আসতে বলেছিলাম? আমার কী আছে আর যে আপনাকে দিতে পারব?
-অনেক কিছু আছে কান্তা। কোমরের অমন ভাঁজ কজনের আছে?
কান্তা হা হা করে হাসে।-ভাঁজ দেখতে এলেন বুঝি?
আমি তার পেটে হাত বুলোতে বুলোতে বলি, এই গোস্তের স্বাদই আলাদা।
-বাখোয়শ বন্ধ করুন। কিছুই করতে পারেন না, শুধু মুখে কথার ফোয়ারা।
-কী করব কান্তা? ওই এক সেকেন্ডের কিস্সায় আমার মন ভরে না। আমি চাই অনেক বড় কিস্সা, অনেকদিন ধরে চলবে, আমার নাওয়া-খাওয়া-ঘুম কেড়ে নেবে।
-তা হলে এখানে আসেন কেন মান্টোসাব?
-কিস্সার খোঁজে। আজ তুমি আমাকে খুশিয়ার গল্পটা বলবে।
-খুশিয়া?
-সেজন্যই তো তুমি আমাকে একা আসতে বলেছিলে। মনে নেই? চলো,শরাব আনাও, খেতে খেতে খুশিয়ার গল্পটা শুনি।
আমরা কোঠার ছাদে গিয়ে বসলাম।
-খুশিয়া বড় ভালো ছিল। ও যে এমন পাগলামি করতে পারে, আমি ভাবতেই পারিনি, মান্টোসাব।
-কী করেছিল খুশিয়া?
-ওই তো আমার খদ্দর ধরে আনত। যা বলতাম, হাসিমুখে করত। আমি তখন সবে এ লাইনে এসেছি। একেক দিন আমার মুখের দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে থাকত। মনে হত, আমার জন্য ও ভেতরে ভেতরে কষ্ট পায়। খুশিয়ার জন্য আমারও কষ্ট হত। এত সুন্দর ছেলে-কতই বা বয়স, সাতাশ-আঠাশ হবে- পেটের জন্য কোঠার দালালি করতে হয়। কী সুন্দর যে গল্প বলতে পারত খুশিয়া।
