একটা কিস্সা বলি শুনুন। শোনার পর আমি বেশ কয়েকদিন বাল করে খেতে পারিনি। যেন কোনও সুড়ঙ্গে সরীসৃপদের সঙ্গে রয়েছি, মনে হয়েছিল। একদিন একটা লোক সন্ধেবেলা ক্যায়সার পার্কের বাইরের রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। না, না, আমি নই, সব কিছুর সঙ্গে আমাকে মেলাতে যাবেন না। লোকটার নাম? ভুলে গেছি, তবে একটা নাম থাকলে সুবিধে হয়, তাই না? আচ্ছা, লোকটার নাম দেওয়া যাক সাজ্জাদ। তো সাজ্জাদ ওখানে অপেক্ষা করছিল এক বন্ধুর জন্য, আর ঘন ঘন ঘড়ি দেখছিল, বন্ধু আসার সময় অনেকক্ষণ পেরিয়ে গেছে। বন্ধুকে মনে মনে খিস্তি করতে করতে সে ভাবছিল, সামনের হোটেলে গিয়ে এক কাপ চা খেয়ে নেওয়া যাক। তখন কেউ যেন তাঁকে ডাকল, সাব-সাব-।
সাজ্জাদ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল একটা দড়িপাকানো চেহারার লোক তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার পরনে অনেকদিন না -কাচা, তেলচিটে দাগ ধরা পাজামা আর শার্ট। সাজ্জাদ বলল, আমাকে ডাকছিলে?
-জি।
-কী চাই?
-কিছু না হুজুর। বলতে বলতে লোকটা তার দিকে এগিয়ে এল, সেই সঙ্গে বোটকা গন্ধ, সাজ্জাদের বমি পেয়ে গেল। -আপনার কিছু লাগবে জনাব?
-কী?
-জেনানা, হুজুর।
সাজ্জাদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, কোথায় তোমার জেনানা?
বুঝতেই পারছেন, সাজ্জাদের তখন মেয়েছেলের কোনও প্রয়োজনই ছিল না। কিন্তু সে নানা অঘটনের মধ্যে জড়িয়ে পড়তে ভালবাসত। জীবনে তার একটাই রোগ ছিল, নতুন কিছু দেখে নাও, যে-পথ চেনো না, সেই পথেই পা বাড়াও।
-কাছেই হুজুর। ওই তো-রাস্তার ওপারে বাড়িটা দেখছেন -অত বড় বাড়িতে?
-জি হুজুর। লোকটা ক্ষয়ে যাওয়া দাঁত বের করে হাসল।আমি এগোচ্ছি। আপনি আমার পেছন পেছন আসুন।
সাজ্জাদ দালাল কে অনুসরণ করে বাড়িটার ভেতরে ঢুকে পড়ল। বাড়ি না বলে খণ্ডহর বলাই ভালো। প্লাস্টার খসে গেছে, ইটের খাঁচা বেরিয়ে আছে, এখানে-ওখানে জংধরা লোহার পাইপ, আবর্জনা। বাড়ির ভেতরটা একেবারে অন্ধকার। দালালের পেছন পেছন সে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। কিছুটা ওঠার পর দালাল তার দিকে ফিরে বলল, সাব একটু দাঁড়ান। আমি এক মিনিটের মধ্যে আসছি।
সাজ্জাদ অপেক্ষা করতে লাগল। এদিকে দালালের দেখা নেই। সে মুখ তুলে দেখল, কিছুটা ওপরে আলো জ্বলছে। সাজ্জাদ সিঁড়ি ভেঙে উঠতে শুরু করল। আলোর কাছাকাছি পৌঁছে সে দালালের গলা শুনতে পেল, শালি, উঠবি, কি উঠবি না?
একটা মেয়ের গলা শোনা গেল।-বললাম তো না, আমাকে ঘুমোতে দাও।
-বলছি ওঠ, কথা না শুনলে কিন্তু—
-কী করবে? মেরে ফ্যালো। আমি উঠতে পারব না। আমাকে এবারের মত ছেড়ে দাও।
-ওঠ…উঠো মেরি জান। জেদ করিস না, এমন জেদ করলে, আমরা খাব কী বল তো?
-আমার খাবারের দরকার নেই। না খেয়ে মরে যাব। একটু ঘুমোতে দাও আমাকে।
-তুই তা হলে উঠবি না, কুত্তি?
-বলছি তো-না-না-না
-আস্তে কথা বল। কেউ শুনতে পাবে। শোন্,উঠে পড়। কতক্ষণ বা লাগবে? তিরিশ-চল্লিশ টাকা পেয়ে যাবি। মেয়েটা এবার কেঁদে ফেলে।
-তোমার পায়ে পড়ছি। কত দিন ঘুমোতে পারি না, আজকের দিনটা আমাকে একটু ঘুমোতে দাও।
-চোপ্। কতক্ষণ লাগবে বড়জোর ঘন্টাদুয়েক। তারপর এসে যত পারিস ঘুমাবি।
এরপর সব চুপচাপ। যে-ঘর থেকে কথা ভেসে আসছিল, সাজ্জাদ পা টিপে টিপে সেই ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ভেজানো দরজায় সামান্য ফাঁকে সে চোখ রাখল। ছোট্ট ঘরের মেঝেতে শুয়ে আছে একটা মেয়ে। কয়েকটা বাসনপত্র ছাড়া ঘরে আর কিছু নেই। দালাল লোকটা। মেয়েটার পাশে বসে তার পা টিপে দিচ্ছে। হাসতে হাসতে দালাল বলল, উঠে পড়। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে তো ফিরে আসবি। তারপর যত পারিস ঘুমোস। আমি আর জ্বালাব না, মেরি জান।
-মেরি জান? মেয়েটা হেসে উঠল।-শালা কুত্তা কাঁহি কা। বলেই এক ঝটকায় উঠে বসল।
সাজ্জাদ পা টিপে টিপে নীচে নেমে এল। তার ইচ্ছে করছিল, এই শহর, এই দুনিয়া ছেড়ে পালিয়ে যেতে। কিন্তু কোথায় যাবে? কেনই বা যাবে? কে এই মেয়ে? কেন মেয়েটার ওপর এমন নিষ্ঠুরতা? দালালের সঙ্গে মেয়েটির সম্পর্ক কী যে, ইচ্ছে না হলেও তার কথা মেনে নিতে হল? ঘরে উঁকি দিয়ে সে দেখেছে, ওইটুকু ছোট ঘরে কী তীব্র আলো। একশো ওয়াট তো। হবেই। অন্ধকারে এসে দাঁড়ানোর পরেও সেই আলো যেন ওর চোখ ভেদ করে ঢুকে যাচ্ছিল। সাজ্জাদ ভাবছিল, অত আলোর ভেতরে কীভাবে ঘুমোতে পারে একজন মানুষ?
একটু পরেই সে পায়ের আওয়াজ শুনতে পেল। দুটো ছায়া তার পাশে এসে দাঁড়াল। দালাল হেসে বলল, দেখে নিন, সাব।
-দেখেছি।
-ঠিক হ্যায়, না?
-ঠিক হ্যায়।
-চালিশ রুপিয়া দেবেন।
পকেটে হাত ঢুকিয়ে সাজ্জাদ নোটগুলি বার করে দালালের হাতে গুঁজে দিল।-গুণে নাও কত আছে?
-পঁচাশ হুজুর।
-পঞ্চাশই রাখো।
-সালাম, সাব।
সাজ্জাদ তখন ভাবছিল, হাতের কাছে যদি একটা বড় পাথর পাওয়া যেত, সেই পাথর দিয়ে দালালটার মাথা গুঁড়িয়ে দিত সে।
দালাল মিনমিন করে বলল, নিয়ে যান সাব। তবে বেশী কষ্ট দেবেন না।
সাজ্জাদ কোনও উত্তর না দিয়ে মেয়েটিকে নিয়ে বেড়িয়ে এল রাস্তায়। সামনে একটা টাঙ্গা দাঁড়িয়েছিল। মেয়েটাকে নিয়ে সে টাঙ্গায় উঠে পড়ল। দালালের গলা আবার ভেসে এল, সালাম, সাব। সাজ্জাদ ভাবছিল, হাতের কাছে বড় একটা পাথর পাওয়া গেল না কেন?
