কিন্তু কী করে যাই বলুন, তো? হাতে কোনও টাকাপয়সা নেই; যাতায়েতের খরচা ছাড়াও, পরিবারের দিন গুজরানের কথাও ভাবতে হবে। শামসউদ্দিন কখন টাকা পাঠাবে, তার তো। ঠিকঠিকানা নেই। তার ওপর ইউসুফ মিঞা বদ্ধ পাগল হয়ে গেছে। তার দিকে তাকানো যায় না। একা একা বসে কী যে বিড়বিড় করে বলে। বেশ কয়েকদিনের জন্য সে উধাও হয়ে যায়, আবার ফিরে আসে। এক একসময় মনে হত, ওকে পাগলাগারদে ভরে দিয়ে আসি। কিন্তু সেখানে তো শেকল দিয়ে বেঁধে রাখে। ইউসুফ বড় কোমল প্রাণের মানুষ ছিল, মান্টোভাই। তাঁকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখবে, তার ওপর চাবুক চালাবে, এ আমি ভাবতেও পারতুম না। পাগলদের মত অসহায় আর কেউ নেই দুনিয়ায়, তাদের নি যে যা খুশি করতে পারে; কিন্তু। মানুষের কি তা করার অধিকার আছে? যে মানুষটা যুক্তি দিয়ে সবসময় দুনিয়াকে বিচার করে, সে পাগল নয়? শুধু যুক্তি নিয়ে যে বাঁচে, সে নিজেই তো একটা পাগলাগারদ। মানুষকে কে বোঝাবে বলুন, পাগল আর স্বাভাবিক মানুষের মধ্যে ব্যবধানটা একটা সুতোর মাত্র। কেউ তার আকাক্ষা পিষে মারতে পারে, কেউ পারে না; যে পারে না, সে পাগল হয়ে যায় আর অন্যজন স্বাভাবিককের মতোই হাঁটে-চলে-কথা বলে, কিন্তু যা সে গোপন করেছে, তা একদিন ফুটেও বেরুতে পারে, এতে তার কোনও হাত নেই; তাই আমি মনে করতুম, সব মানুষই পাগল হওয়ার পথে এগিয়েই রয়েছে, তবু কবে সেই জিন ভর করবে, এটুকু কেউই বলতে পারে না।
ইউসুফকে একদিন ধরেবেঁধে বসালুম আমার সামনে। তার মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বললুম, তোর কী কষ্ট, আমাকে বল।
সে শুধু হাসল, এমনভাবে যেন আমার কথাই বোঝেনি।
-ইউসুফ—
-জি।
-কী ভাবিস তুই?
সে কোনও কথা বলল না। আমি কত প্রশ্ন করলুম, সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। মান্টোভাই, আমি বুঝতে পারলুম, আমাদের যুক্তিতে যত জোরই থাক, পাগলের মনের ভেতরে আমরা ঢুকতে পারব না, তার ভাষা আর আমার ভাষা আলাদা; ও আমাদের ভাষা হারিয়ে ফেলেছিল।
তখন অন্য কিছু ভাবার সময় নেই আমার, কলকাতায় আমাকে যেতেই হবে। পেনশনের ব্যাপারটা নিয়ে একটা হেস্তনেস্ত হওয়া দরকার। জুনের চুক্তিটা যে জাল, তা আমাকে প্রমাণ করতেই হবে। বেগমকে তাই সব বলতে গেলুম।
-আপনি কলকাতা যাবেন? সে তো বহু দূর শুনেছি।
-কিন্তু আমাকে যেতেই হবে। নয়তো একদিন না খেয়ে মরব আমরা।
-আপনি পারবেন, মির্জাসাব?
-পারতেই হবে বেগম।
উমরাও আমার হাতে হাত রেখে বলে, টাকাপয়সা নিয়ে কাজিয়া তো আপনার কাজ নয়, মির্জাসাব।
-এখন তা-ই করতে হবে।
-আর আপনার গজল?
-গজল! সে কথা তুমি ভাবো নাকি, বেগম?
-না। গজলের ভেতরে আপনি ভাল থাকেন, এটুকু তো বুঝি।
সেদিন এক অন্য রুপ দেখলুম বেগমের, ভাইজানেরা। প্রথম সে আমার গজল নিয়ে কথা বলল।
আমি বললুম, কয়েকটা বছর তোমাকে সব দেখেশুনে রাখতে হবে, বেগম।
-আপনি ভাববেন না। এত দূরের পথ যাবেন, টাকাপয়সা তো লাগবে, কোথায় পাবেন?
-ধার করব।
-আবার ধার?
-আমি জিতে ফিরব বেগম। সবার সব টাকা শোধ করে দেব।
-কেউ আর ধার দেবে আপনাকে?
-আলবৎ দেবে। কলকাতায় যাচ্ছি তো সব পাওনাগণ্ডা বুঝে নিতে, বেগম। অনেক দিন ধরে অনেক ঠকেছি। এবার আমাকে আর ঠকাতে পারবে না।
-আপনি তো ঠকতেই ভালবাসেন, মির্জাসাব। বেগম হেসে বলল।
-না, বেগম না, আর কেউ আমাকে ঠকাতে পারবে না। গজল লিখি বলে কি আমার পেট নেই?
কলকাতায় যাব শুনে মথুরা দাস, দরবারি মলরা আমার ওপর বাজি ধরল। আমিও তাদের বোঝাতে পারলুম যে এ মামলায় আমি জিতে ফিরবই। তখন সুদে-আসলে সব টাকা ফেরত পাবে তারা। বেশ মজাই পেলুম। খেলাটা তা হলে জমে উঠেছে। জিতে ফিরতেই হবে আমাকে। আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে মনে হত, আমি যেন একটা শেয়ালের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। চলো মিঞা, কলকাত্তা চলো, দেখো নসিব বদলায় কি না।
২০. রূপমতীদের কিস্সা
সব-কহাঁ লাল্হ ও গুল-মেঁ নুমায়াঁ হো গয়ীঁ,
খাক-মেঁ কেয়া সূরতেঁ হোগী কেহ্ পিনহাঁ হো গয়ীঁ।।
(না, সব নয়, অতি অল্পই রূপ নিয়েছে লাল ও গোলাপের রূপে;
কী রূপসীই ছিলেন যাঁরা এই মাটির তলায় চাপা পড়ে আছেন।)
ভাইজানেরা, উঠে বসুন, এবার সেই রূপমতীদের কিস্সা আমি আপনাদের শোনাব, হীরামান্ডি, ফরাস রোড, জি বি রোডের কোঠিতে যাদের রূপযৌবন পুড়তে পুড়তে ছাই হয়ে গেছে। বোম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কত সুন্দরী নায়িকা আমি দেখেছি, তারা কেউ আমার দেলকিতাবে একটু দাগ রাখতে পারেনি; আর পটের বিবি সাজা ঘরের বউদের তো সহ্য করতেই পারতাম না, সব একরকম, মুখে সবসময় প্রেমের বুলি, ভেতরটা একেবারে ফাঁপা, সেখানে শুধু সোনা গয়না টাকাপয়সার হিসেব। আরে বাবা, প্রেম করার জন্য পাগলামি লাগে, হিসেব কষে প্রেম হয় না। কোঠির মেয়েরা, বিশ্বাস করুন, ওরা জানে, ইঙ্ক কাকে বলে। কেন জানেন? শরীর বেচে খাবার জোগাড় করতে হয় তো, তাই বুঝতে পারে, কোন্টা প্রেম আর কোন্টা নৌটঙ্কিবাজি। ওদের দেখতে দেখতেই আমি বুঝেছিলাম, মেয়েদের ভেতরে কীভাবে জন্নত লুকিয়ে থাকে; সংসার-সমাজ পর্দার ঘেরাটোপে এই মেয়েরাই ছারপোকার মতো হয়ে যায়। ভাববেন না, আমি ওদের খুব মহৎ বলতে চাইছি, মহত্ত্ব বলে কিছু নেই, ভাইজানেরা, আছে শুধু জীবনের টুকরো টুকরো সত্য, তাও একজনের সত্য অন্যের জীবনে কাজে আসে না, এটুকু মেনে নিতে পারলে আমাদের জীবন অনেক সহজ হত। ওরা সহজ হতে পেরেছিল। কেন জানেন? ওরা ভান। করেনি; ওরা যা, সেভাবেই নিজেকে দেখাতে চেয়েছে।
