একটু খোলসা করেই বলতে হয় আপনাদের, নইলে বুঝবেন না। ব্রিটিশের দেওয়া পেনশনটা আমরা পেতুম লোহরু-ফিরোজপুরের নবাব আহমদ বক্স খানের কাছ থেকে। ইনি আবার আমার শ্বশুর মারুফসাবের বড় ভাই। আমার চাচা নসরুল্লা বেগ খান তো মারাঠা বাহিনীতে কাজ করতেন। ১৮০৩- ব্রিটিশের কাছে মারাঠারা হেরে যাওয়ার পর চাচার হালও খারাপ হল। এদিকে আহমদসাবের বোন ছিলেন চাচার বেগম। চোস্ত মানুষ ছিলেন আহমদসাব। অলওয়ারের রাজার হয়ে লর্ড লেক আর ব্রিটিশের সঙ্গে কথাবার্তা চালাতেন তিনিই। একইসঙ্গে রাজা ও ব্রিটিশকে খুশি করে লোহারু আর ফিরোজপুরের নবাবি পেয়েছিলেন। তো তিনি আমার চাচাকে ব্রিটিশের বাহিনীতে ঢুকিয়ে দিলেন। ১৮০৬-এ চাচা মারা যাওয়ার পর, আহমদসাব ব্রিটিশেদের বোঝালেন, নসরুল্লা বেগ খানের পরিবারের ভরণপোষণ দেখা তাঁদের দায়িত্ব। তবে কিনা ব্রিটিশের হয়ে দায়িত্বটা পালন করবেন তিনিই, শুধু নবাবীর জন্য বছরে ২৫ হাজার টাকার পাওনাটা তাঁরা মুকুব করে দিন। বদলে তিনি নসরুল্লা বেগ খানের। পরিবারের খাওয়াপরা তো দেখবেনই, ব্রিটিশের জন্য পঞ্চাশ অশ্বরোহী বাহিনীও মজুত রাখবেন। পেনশনের ব্যাপার নিয়ে খোঁজখবর করতে গিয়ে দেখলুম, চাচার পরিবারের ভরণপোষণের। জন্য ধার্য হয়েছিল বছরে ১০ হাজার টাকা, কিন্তু আসলে দেওয়া হত পাঁচ হাজার টাকা। আমি পেতুম ৭৫০ টাকা। আমার ভাইয়ের জন্য কোনও বরাদ্দ ছিল না। এদিকে খাজা হাজি নামে। একজন টাকা পেয়ে যাচ্ছে, যার সঙ্গে আমার চাচার কোন সম্পর্ক ছিল না। এ এক বিরাট জট, মান্টোভাই, আপনি তো জানেনই টাকাপয়সার জট সহজে ছাড়ানো যায় না।
এ তো গেল একদিক, কিন্তু আরও সমস্যা তৈরি হয়েছিল। আহমদ বক্স খানের ছিল দুই বিবি। এক বিবির ছেলে শামসউদ্দিন, অন্য বিবির ছেলে আমিনউদ্দিন আর জিয়াউদ্দিন। আমিনউদ্দিনের সঙ্গে আমার খুবই দোস্তি ছিল। ১৮২২ সনে অলওয়ারের রাজা ও ব্রিটিশের মত নিয়ে আহমদসাব শামসউদ্দিনকে তাঁর নবাবির উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেছিলেন। এতে তো ছোট দুই ভাই খেপে গেল। তাদের মা খানদানি মুসলমান আর শামসউদ্দিনের মা সাধারণ। মেওয়াতি, শামসউদ্দিন হবে কিনা উত্তরাধিকারী? আমিনভাই আমার বন্ধু, তাই আমিও পড়লাম মুসবিতে। শামসউদ্দিন আমাকে নিয়ে খেলতে শুরু করল। কখনও আমার বরাদ্দের টাকা কম পাঠায়, কখনও মাসের পর মাস পাঠায়ই না। মারুফসাব মারা যাওয়ার পর আমি তো একেবারে খাদে পড়ে গেলুম। এতগুলো লোকের দেখভাল করা, তার ওপর পাওনাদারের চাপ। আহমদসাবকে কতবার চিঠি লিখেছি, ভেবেছি তিনি নিশ্চয় কোন ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু তাঁর দিক থেকে কোনও উত্তর নেই। একদিন ফিরোজপুরে গিয়ে হাজির হলুম। তাঁর তখন খুবই খারাপ অবস্থা। সারা শরীরে ঘা, কোনও মতে বিছানায় উঠে বসলেন। আমি সোজাসুজি তাঁকে বললুম, জনাব, হয় আপনি আপনার কথা রাখুন, আমরা যাতে ঠিকঠাক টাকা পয়সা পাই দেখুন, না হলে বলুন, আমি সরকারের দরবারে গিয়ে আর্জি পেশ করব। তিনি আমার হাত চেপে ধরে কাঁদতে লাগলেন। বুঝতে পারলুম,আহমদসাবের আর কিছু করার নেই, শামসউদ্দিনের কথা মেনেই চলতে হবে তাঁকে। ঠিক করলুম, শামসউদ্দিনের সঙ্গেই দেখা করব, বোঝাপড়াটা এবার শেষ করে নিতে হবে। আমার পথ এবার আমাকেই দেখতে হবে। ১৮০৬-এর মে মাসে আহমদসাব আর ব্রিটিশের সঙ্গে চুক্তিতে বলা হয়েছে, নসরুল্লা বেগ খানের উত্তরাধিকারীদের বছরে ১০ হাজার টাকা ভাতা দিতে হবে। আর ওই বছরেই জুন মাসের চুক্তিতে ভাতা নামিয়ে আনা হচ্ছে পাঁচ হাজার টাকায়। তা কী করে হতে পারে? এটা নকল চুক্তি বই আর কিছু নয়। আমি শামসউদ্দিনের সঙ্গে দেখা করলুম। কথায়-ব্যবহারে সে বেশ খাতিরই করল আমাকে। আসল কথাটা পাড়তেই বলল, ওসব চুক্তির কথা আমি কিছু জানি না, মির্জা।
-তাহলে আমি কী করব?
-সে তুমি যা ভালো বোঝো, করো।
-কিন্তু টাকাও তো তুমি ঠিক সময়ে পাঠাচ্ছ না।
-টাকা কি আসমান থেকে পড়ে?
-মতলব?
-টাকা হাতে এলে তবেই না পাঠাব।
-কিন্তু আমি কী করে সংসার চালাই, বলো?
-আরে ইয়ার, তোমার আবার সংসার কী? শরাব, রেন্ডি, গজল-এই তো? তুমি বড় শায়র, আমরা তোমাকে সম্মান করি, এত টাকা-টাকা করো কেন? আরে এখানে থাকো কদিন মস্তি করো।
ইউসুফ মিঞার শরীর ভালো না। মাঝে মাঝেই ধুম জ্বর আসে, আবোল-তাবোল বকে।
-বদর বার করে দাও শরীর থেকে। ঠিক হয়ে যাবে।
-তুমি ঠিক সময়ে টাকা পাঠালেই আমরা একটু ভাল থাকতে পারি শামসভাই।
-দেখি। খোদা যা করেন।
ওই যে কথাটা, খোদা যা করেন, ওটা হচ্ছে আমার বুকে শামসউদ্দিনের শেষ লাথি। তখনই ঠিক করলুম, রাজধানী কলকাতায় যেতে হবে আমাকে, রাজার দরবারে নকল চুক্তিটাকে ফাঁসিয়ে দিতে হবে। নিজেকে বললুম, মির্জা তুমি আকাশে-আকাশে ঘুরে বেড়াও, বেড়াতে বেড়াতে গজল লেখো, কিন্তু একবার এই জীবনের মুখোমুখি দাঁড়াও তো, নিজের পাওনাগণ্ডাটা বুঝে নাও, দেখি কত হিম্মৎ আছে তোমার, একইসঙ্গে আশমানে ওড়ো, আবার মাটিপৃথিবীর হিসেবটাও বুঝে নাও। তবে না তুমি কবি। মেহর নিগারকে ভালবাসার জন্য মীরসাব যদি এত অপমান, পাগল হওয়ার শাস্তি বহন করতে পারেন, তুমি এটুকু পারবে না? কতগুলো মানুষ শুধু দিনরাতের খাওয়ার জন্য তোমার দিকে তাকিয়ে আছে; গজলের সৌন্দর্য আর ভালভাবে বাঁচার খুবসুরতি তো আলাদা নয় মির্জা। দরবার করতে তাই আমাকে কলকাতায় যেতেই হবে।
