-সারাদিন কিছু খাননি শুনলাম। তবিয়ৎ খারাপ?
-না, বেগম।
-তা হলে?
জানেনই, উমরাও বেগমের সঙ্গে আমার কথাবার্তা প্রায় বন্ধ হয়েই গিয়েছিল। কিন্তু স্বপ্নটা আমি তাঁকে বলতে চাইছিলুম। বেগম হয়তো আমাকে সামান্য হলেও আশ্রয় দিতে পারবে। পুরুষরা এক-একসময় কেমন অসহায় হয়ে যায়, মান্টোভাই, আল্লার হাত ধরার চেয়ে সে তখন নারীর কাছে মুখোমুখি বসিবার সামান্য একটু জায়গা খুঁজতে চায়।
-একটা বদখোয়াব দেখে সারাদিন ধরে শুধু উল্টি আসছে।
-কী দেখেছেন, আমাকে বলুন।
আমি বেগমকে স্বপ্নটা বললুম। শুনে তাঁর ঠোঁটে বাঁকা হাসি খেলল।-এ খোয়াব তো আপনারই দেখার কথা মির্জাসাব।
-জি-
-উল্টি আসছিল বলে কিছু খাননি, শরাব তো পিয়া, না?
আমি কোনও কথা বললুম না।
-শরাব আর জুয়ার মধ্যে ডুবে আছেন, আর কোন খোয়াব দেখবেন আপনি? ভাল খোয়াব তো আপনার জন্য নয়, আপনি দেখতেও চান না।
আমি মনে নিজের গালে চড় মারলুম। কেন বেগমকে খোয়াবের কথা বলতে গেলুম? এবার তো আমাকে শুনতে হবে, আমি কতটা বেশরিয়তি, আর শরিয়ত যে মানে না, তার জীবনটাই তো একটা বদখেয়াল। এই রকম সময়ে নিজেকে বাঁচানোর জন্য আমি তো একটা কাজই করতে পারি, ঠাট্টামশকরা করা, ওইটুকুই তো আমার সম্বল। বেগমকে বললুম, হজরত মুসাকি বহ্ন, আমার জন্য তা হলে দোয়া করুন।
-আপনার জন্য দোয়া? আপনি শরিয়ত মানেন না, রোজা রাখা তো দূর, নমাজও পড়েন না, আপনার জন্য কী দোয়া করব বলুন। আল্লাই জানেন, আপনার কী হবে—
আমি হেসে বললুম, আমার হশর তোমার চেয়ে খারাপ হবে না বেগম। ভালই হবে।
-কী করে বুঝলেন?
-আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি।
-কী দেখছেন?
-হশরে তোমার সঙ্গে থাকবে মাথা মুড়োনো ধার্মিক লোকেরা, তাদের নীল পোশাক, কোমরে দাঁতন, হাতে বদনা, সব গোমড়ামুখো মানুষ।
-তাই? বেগমও হেসে ফেলে। -আর আপনার সঙ্গে কারা থাকবেন?
-তারা সব দুধর্ষ, অত্যাচারী বাদশা। ফরাউন, নিমরোদ। তাদের কোমরে তলোয়ার ঝুলছে। আমি গোঁফে তা দিতে দিতে বুক ফুলিয়ে তাদের সঙ্গে হেঁটে যাব। আর আমার দুপাশে ফরিস্তারা আমাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাবেন।
-বেশ তো, সেভাবেই যাবেন। বেগম উঠে দাঁড়ায়।-আমি যাই। রাতে একটু খেয়ে নেবেন। খালি পেটে শরাব ঠিক না।
-বেগম-
-বলুন।
শরিয়ত কি এতই কঠোর, যে তা মানে না, তার কথা শোনাও হারাম? একটা কিস্সা শোনার সময় আছে তোমার হাতে?
-কার কিস্যা?
-শেখ আবু সয়ীদের। খোরাসানের সুফি সাধক। তো শেখকে একদিন তাঁর শিষ্যরা জিজ্ঞেস করল, এ-শহরে সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন মানুষ কে? শেখ বললেন, কেন, লোকমান, ওর মতো সাফ মানুষ আর আছে নাকি? শাগির্দরা তো অবাক। লোকমান তো একটা পাগল, চুলে জটা, ছেড়া ননাংরা আলখাল্লা পরে থাকে, আর কথায়-কথায় মুখে খিস্তি। শেখ তখন বোঝালেন, পরিচ্ছন্ন মানুষ কাকে বলে জানো? যে কোনও কিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে নেই। তাই লোকমানের মত পরিচ্ছন্ন আর কে আছে?
-আপনি নিজেকে এমনই সাফসুরতি মনে করেন?
-না বেগম। তোমার শরিয়ত মানায় যে সাফসুরতি নেই, সেটুকুই আমি বুঝি। সত্যি কথা যদি পাথরের মত আঘাত করে, আমার কাছে তার কোনও মূল্য নেই। তার চেয়ে মিথ্যা নিয়ে বেঁচে থাকা ভাল।আমরা তো কেউই জানি না, কেয়ামতের দিন কে কোথায় গিয়ে দাঁড়াব।
বেগম কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে মহলসরায় চলে গেল।
.
তখন আমার উনত্রিশ বছর বয়স, মান্টোভাই। কত তাড়াতাড়ি খোয়বের ভেতরে আমি কেয়ামতের দিনের ছবিটা দেখতে পেলুম। সে-বছরই আমার ভাই ইউসুফ মির্জা পুরো পাগল হয়ে গেল। আগের বছর আমার শ্বশুর মারুফসাব মারা গেছেন।জীবনটা তো খুল্লমখুল্লাই কেটে যাচ্ছিল, পেনশনের সামান্য কটা টাকা, এরপর দানখয়রাতে, আর ধারদেনা করে। কিন্তু এবার একটা অন্ধগলির ভেতরে এসে দাঁড়ালুম আমি। মারুফসাব মারা যাওয়ায় আমার ভিতটাই টলে গেল। পাওনাদাররা টাকা শোধ দেওয়ার জন্য চাপ দিতে শুরু করল। যে-জীবনযাপনে আমি অভ্যস্ত তা তো আর বদলাতে পারব না, তা হলে একটা কাজই করার, কীভাবে কোথা থেকে। টাকা পাওয়া যায়? একটা কথাই নিজেকে বলতুম, রোজগার বাড়াতে হবে মির্জা গালিব, না হলে তুমি বাঁচবে কীভাবে, আর নিজের মতো করে বাঁচতে না পারলে, কী করে গজল লিখবে? উপোস করে কে কবে সৌন্দর্যের জন্ম দিতে পেরেছে দুনিয়ায়, মান্টোভাই?
গোরাদের কাছ থেকে যে-পেনশন পেতুম, এবার তার হিসেব-নিকেশ নিয়ে বসতেই হল আমাকে। ভাববেন না, শুধু নিজের জন্য। ইউসুফ মির্জার পরিবার, চাকর-বাকর-দাসী, তাদের ছেলেমেয়েদেরও দেখতে হবে আমাকে। হ্যাঁ, নিজের মৌতাতে থাকতাম ঠিকই, কিন্তু কাউকে তো জীবন থেকে ফেলে দেওয়ার কথা ভাবিনি। কী করে ভাবব, বলুন? ওরা চারপাশে আছে। বলেই তো আমি আছি। একা একা আমার কী ক্ষমতা? দুটো লাইন লেখার জন্যও অনেক। মানুষের সঙ্গে থাকতে হয়, সে তো আপনি জানেন, মান্টোভাই।
কোনওদিন তো ভাবিনি টাকাপয়সার হিসেবের মধ্যে মাথা গুঁজতে হবে আমাকে। ভোগ করার জন্য টাকা তো লাগেই, টাকা কোত্থেকে আসবে, কীভাবে জোগাড় করব, এ সব ধান্দার কথার ভাবলেই আমার মাথায় বাজ ভেঙে পড়ত। কিন্তু মানুষ কী না পারে বলুন? মেঘের সঙ্গে মেঘ হয়ে ভাসতে পারে, আবার একটা কেন্নোর মতো মাটিতে সেঁধিয়ে যেতেও পারে। ফলে ব্রিটিশের দেওয়া পেনশনের ব্যাপারটা এবার আমাকে খতিয়ে দেখতেই হল।
