আমি সে-রাতে কোঠাতেই থেকে গিয়েছিলাম। বারিসাব, বলবন্ত কখন চলে গিয়েছিল, কে জানে। মালকিন আমাকে জড়িয়ে ধরে বসেছিল; নেশার ঘোরে আমি, তার কান্না একটা মরা নদীর মতো আঁকড়ে ধরছিল আমাকে। ভোরের দিকে যখন আমার নেশা কাটল, দেখলাম, তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছি, আর তার চোখ দুটো আমার মুখের ওপর স্থির হয়ে আছে। কেন, কেন যে আমার কান্না পেল জানি না, আমি তার পেটে মুখ ডুবিয়ে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগলাম। সে আমার মাথায় হাত রেখে বসে থাকল, একটি কথাও জিজ্ঞেস করল না।
আমি তার কোঠাতেই স্নান করলাম। সে আমার জন্য চা-নাস্তা নিয়ে এল। সকালের আলোয় প্রথম আমি তাকে ভাল দেখলাম। বিবর্ণ, তবু বোঝা যায়, একসময় তার শরীর শ্বেতচন্দনের রঙে উদ্ভাসিত ছিল; চোখের নীচে কালি, কিন্তু একসময় এই চোখ মরকতমণির মতই উজ্জ্বল ছিল; তার শরীর, এখন অনেক ভাঙচুর, একসময় চিনারের মতোই সুঠাম ছিল।
-তোমার নাম কী? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
-কান্তা।
-কবে এসেছিলে এখানে?
– মনে নেই।
-কী মনে আছে, তোমার কান্তা?
-কিছু না, জনাব।
-কাউকে মনে পড়ে না?
কান্তা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, খুশিয়াকে মনে পড়ে মাঝে মাঝে।
-কে খুশিয়া?
-দালাল। আমার জন্য খদ্দর নিয়ে আসত।
-খুশিয়া মরে গেছে?
-জানি না।
-খুশিয়া কোথায় জানো না?
-না।
-তা হলে খুশিয়ার কথা বলো। আমি তার হাত ধরি।
-খুশিয়া আমাকে ভুল বুঝেছিল।
-কেন?
-খুশিয়ার সামনে আমি লজ্জা পাইনি। কেন পাবো, বলুন? ও তো খুশিয়া, আমার কোঠার খুশিয়া।
-কী করেছিল খুশিয়া?
-জনাব, এবার আপনি যান, সকালবেলায় এ-মহল্লায় আপনাদের থাকতে নেই। আমিও তো একটু ঘুমোতে যাব।
-খুশিয়ার কথা একদিন বলবে?
-বলব। আপনি আসবেন। তবে একা। এত লোক নিয়ে নয়।
-কেন?
কান্তা শুনে হেসে ওঠে। -রেন্ডির আবার কথা কী? সে তো কাপড় তুলবে, আপনি যা করার করবেন। কেউ কেউ আসল নাম জিজ্ঞেস করে, কেন লাইনে এসেছি জানতে চায়। মাফ করবেন জনাব, এই কুত্তাগুলোর মুখে মুতে দিতে ইচ্ছে করে। মারাতে এসেছিস, মারা। আমাকে জানার কেন ইচ্ছে হয় তোর? ঘন্টাখানেকের মামলা, গতর দ্যাখ, যা করার কর, ফুটে যা। কিন্তু, আপনি আবার আসবেন তো? খুশিয়া যে কেন এমন করল, আমি আজও বুঝতে পারিনা, জনাব।
১৯. এক ভোরবেলায় স্বপ্ন দেখে
সজ হোতী হী নহীঁ য়হ্, সরজমীঁ
তুখ্ম-এ খ্বাহিশ দিলমে তু বোতা হ্যয় কেয়া।।
(এ বক্ষভূমি শস্যশ্যামলা হবে না কোনও দিন,
কেনই বা তাতে বাসনার বীজ বুনে যাচ্ছ?)
এক ভোরবেলায় স্বপ্ন দেখে আতঙ্কে ধড়মড় করে উঠে বসলুম। গলা শুকিয়ে কাঠ, হাত-পা থরথর করে কাঁপছে, কাল্লুকে ডাকার চেষ্টা করলুম, কিন্তু আওয়াজ বেরুল না। স্বপ্নটা আমি সারা জীবনেও ভুলতে পারিনি। মরুভূমির মধ্য দিয়ে এক কাফেলা চলেছে। নীল আল ছড়িয়ে আছে মরুভূমিতে। উট আর মানুষগুলি সত্যিকারের নয়, যেন ছায়ায় মিলিয়ে চলেছে। কেউ কারোর সাথে কথা বলছে না। শুধু মাঝে মাঝে বহু দূর থেকে ভেসে আসছে সমবেত আর্ত চিৎকার, যেন কোথাও যুদ্ধ হচ্ছে, আর ওই চিক্কার যে মৃত্যুর সঙ্গে মোলাকাতের আর্তনাদ তা আমি বুঝতে পারছিলুম। আমার খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছিল সাবার সঙ্গে। বুঝতে পারছিলুম না তো, কাফেলার সঙ্গে আমি কোথায় চলেছি? কেনই বা জুড়ে গেছি এই দলের সঙ্গে? পাশের একজনকে জিজ্ঞেস করলুম, কোথায় যাচ্ছি, জনাব?
লোকটা উত্তর দিল না।
কিছুক্ষণ পর আবার একজনকে জিজ্ঞেস করলুম, আর কতদূর যেতে হবে আমাদের?
সে-ও কোন কথা বলল না।
এরা কী কথা বলতে পারে না? না, আমার সঙ্গে কথা বলবে না? তা হলে আমাকে তাদের দলে নিয়েছে কেন?
একটা কালো ছায়া যেন আমার বুকের মধ্যে ছড়িয়ে যাচ্ছিল। কয়েকজনের কাছে জানতে চাইলুম, তারা শুধু আমার মুখের দিকে তাকাল, কথা বলল না, জলও দিল না। ঠিক করলুম, এই দল ছেড়ে আমাকে পালিয়ে যেতেই হবে। উটের মুখ উল্টোপথে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলুম, কিন্তু সে কিছুতেই কাফেলা থেকে আলাদা হবে না। শেষমেশ এক ঝটকায় সে আমাকে পিঠ থেকে ফেলে দিল। আমি বালির ওপর পরে গিয়ে দেখলুম কাফেলা এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ভাইজানেরা, কী বলব, উঠে দাঁড়ানোর শক্তি আমার ছিল না, মনে হচ্ছিল, মরুভূমি যেন আমাকে গ্রাস করে নিতে চাইছে। একসময় দেখলুম, একটা চাপ বাঁধা অন্ধকার আমার ওপর। নেমে আসছে। হ্যাঁ, বিরাট ডানার এক পাখি, লম্বা গলায় শুধু কাঁটা আর কাঁটা, এমন পাখি তো আগে কখনও দেখনি, কোথা থেকে এল এই পাখি, আমার দিকে সে ধেয়ে আসছে কেন? পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে দেখলুম, শরীর নাড়ানোর কোনও ক্ষমতাই আমার নেই। পাখিটা আমার বুকের ওপর এসে বসল, দুই ডানা ছড়ানো, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল,। দেখলুম, তার চোখ নেই, শুধু দুটি কোটর, আর তারপর তার লম্বা ঠোঁট নেমে এল আমার বুকের ওপর, পাখিটা ঠোকরাতে শুরু করল, বুক ফুটো করে সে আমার শাঁস-রক্ত খেতে চায়, সে ঠুকরে যেতে লাগল, মাংস ছিড়তে থাকল…. তখনই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল আমার। সত্যি বলতে কী মান্টোভাই, জীবনে প্রথম আমি ভয় পেলুম। কী মানে এই স্বপ্নের? আমার কেয়ামতের দিন তা হলে এসে গেছে! এত যে খেতে ভালবাসি, সারাদিন কিছু খেতে পারলুম না, যতবারই খাবারের দিকে তাকাই খতরনাক পাখিটার লম্বা ঠোঁট দেখতে পাই। কাল্লু গিয়ে হয় তো জেনানামহলে জানিয়েছিল, তাই সন্ধেবেলা বেগম আমার কাছে এল।
