বারিসাবের সঙ্গে লাহোরে কাজ করতে গিয়ে হিরামান্ডিতে আমার যাতায়াত শুরু। তখন থেকেই ওদের আমি দেখতে শুরু করেছিলাম, ঘর শব্দটা যাদের কাছে সারা জীবন স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়। ওরা সবাই আলাদা আলাদা, সকলের ভিন্ন ভিন্ন গল্প। টলস্টয় বলেছিলেন, সব সুখী পরিবার একরকম, দুঃখী পরিবারদের গল্পগুলো নানা রঙের। হিরামান্ডির ওই রংদার দুনিয়ায় ঢুকে পড়লে মনে হত, আমার হাতের ভেতরে কতরকমের হৃৎপিণ্ড যে ধকধক করছে, কেউ মালকোষ তো, কেউ বেহাগ, কেউ ভৈরবী তো অন্যজন পূরবী; রাগ-রাগিণীর কতরকম যে খেলা। রাগের ভেতরেই অশ্রু, রক্ত, আর্তনাদ,ছুরি শানানোর শব্দ। বারিসাবের সঙ্গে তো যেতামই, তা বাদে একা একা ঢু মারতাম হিরামান্ডিতে। রেন্ডিরা তো আছেই, দালাল, ফুলওয়ালা, পানওয়ালাদের সঙ্গে গল্প করতাম, আমাকে দেখলেই ওরা হই হই করে উঠত, মান্টোভাই আ গিয়া, অব মজা জমেগা। তা, ভাইজানেরা, আপনাদের দয়ায়, মজা জমাতে আমার জুড়ি ছিল না, মজা শেষ হওয়ার পর দেখতে পেতাম, মান্টোর ভিতরের ন্যাড়া জমিটা যেমন ছিল তেমনই রয়ে গেছে, একটাও ঘাস গজায় নি। আরে ভাই, আমি তো জানতামই, ওই নাবাল জমিতে। কখনও ঘাস জন্মাবে না, যতদিন বেঁচে আছ, দেখে নাও, যা দেখছ কিছু তো লিখে রাখো, সেই লেখার ভেতরে মরুদ্যান তৈরি হলেও হতে পারে, তবে সব কাঁটাগাছে ভরা, এই যা।
হিরামান্ডিতে আমরা যেতাম একেবারে বাদশার মতো। একদিনের গল্প বলি। সেদিন আমি আর বারিসাব বলবন্ত গার্গীকে পাকড়াও করেছি। বলবন্ত নিপাট ভালো মানুষ লেখক, তাই কোথায় যাচ্ছি, আগে তা বলিনি। একটা পেশোয়ারি টাঙ্গা ভাড়া নিলাম। বলবন্ত বার বার জিজ্ঞেস করে, কোথায় যাবে মান্টোভাই?
বারিসাব মিটিমিটি হাসেন। আমি বলি, শুধু খবরের কাগজের অফিসে বসে থাকলে লেখক হওয়া যায় না বলবন্ত। চলো, আজ একটু পাপ করে আসি।
-মতলব?
-বলবন্ত, মান্টোর কথাই না হয় আজ শোনো। দোজখে তো আর নিয়ে যেতে পারবে না। তার একটু ওপরেই থাকবে। বারিসাব হা-হা করে হাসতে লাগলেন।
শাহি মসজিদের সামনে গিয়ে আমাদের টাঙ্গা থামল, পাশেই তো জ্যান্ত মাংসের বাজার। তখন সন্ধে হয়েছে; রাস্তায় রেন্ডি, দালাল, ফুলওয়ালা, কুলফিওয়ালাদের ভিড়, টিক্কা কাবাবের গন্ধে চারদিক ম ম করছে, হাওয়ায় ভাসছে সারেঙ্গির সুর, ঠুংরির দুএকটা কলি; বলবন্ত আমার হাত চেপে ধরে বলল, কোথায় নিয়ে এলে, মান্টোভাই?
-হিরামান্ডি। নাম শোননি?
সে ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।
-ভয় পেলে নাকি?
-না। বলবন্ত ঢোঁক গিলে বলল, তুমি তো আছ।
-ভরসা রাখো বন্ধু, মান্টোর ওপর ভরসা রাখো।
এদিকে দেখি, বারিসাব এক পাঠান দালালের সঙ্গে দরদাম শুরু করে দিয়েছেন। আশ্চর্য স্বভাব লোকটার। মস্তি করতে এসেও দরদাম করবেই। শালা আরামকেদারার বিপ্লবী তো, সবকিছু নিক্তি মেপে করবে। কমিউনিস্ট হারামিদের আমার এই জন্য সহ্য হয় না, ফুর্তি মারার ইচ্ছে ষোলো আনা, লুকিয়ে-চুরিয়ে মজাও মারবে, কিন্তু সবসময় কপালে কাস্তে-হাতুড়ির তিলক এঁকে বসে আছে, আর সব কিছু নিয়ে দরদাম করবেই। ওদের হিসেবের বাইরে পা রাখলেই আপনি প্রতিক্রিয়াশীল। বিপ্লব মারাচ্ছে! কে তোদের ওপর দায় দিয়েছে রে সবাইকে সমান করার? সে শুধু সুফি সাধনাতেই সম্ভব, সে পথ ফকির-দরবেশের, কমিউনিজমে তার কোনও রাস্তা নেই। ক্ষমতা দখল যার লক্ষ্য, সবাইকে সমান দেখার সাধনার পথ তার জন্য নয়। মাফ করবেন। ভাইজানেরা, আবার বাথোয়াশি করে ফেলেছি; আধুনিক মানুষ তো, একটা গল্পও সহজভাবে বলতে পারি না, জ্ঞান দেওয়ার ভূতটা সবসময় ঘাড়ে চেপে আছে।
বারিসাবকে বললাম, কত দিন বলেছি, দরদাম করতে হয় আপনি একা কোনও কোঠায় যান।
-আরে এ শুয়োরের বাচ্চারা-
-আপনি, আমি, কম শুয়োরের বাচ্চা? মনে থাকে না?
আমার এইরকম খিস্তি শুনলে বারিসাব একেবারে গুম মেরে যান। আমার কথা শুনে পাঠান দালাল চনমনে হয়ে বলে ওঠে, ওপর চলুন সাব। দারুন লেড়কি আছে, একদম দম্পুখত্।
ওই কোঠায় সেদিন আমরা প্রথম গেছি। দোতলার একটা ঘরে ঢুকে দেখলাম, বছর পঁয়ত্রিশের এক পাঠান মহিলা বসে আছে, মালকিন আর কী। মোটাসোটা চেহারা, খোঁপায় মোটা উঁইফুলের মালা জড়ানো, পান-রাঙানো ঠোঁট। বেশ দিলখোশই বলতে হবে।
কী দেখছেন মিঞা? সে কপট রাগের ভঙ্গিতে বলে।
আমিও কম বদমাইস না, খেলে দিলাম, মির্জাসাবের একটা বায়েৎ বলে উঠলাম।
ইশক মুঝকো নহী, বশত্ হী সহী
মেরী বশত, তেরী শোহরত হী সহী
-কেয়া বাত, কেয়া বাত। জব্বার-জব্বার মিঞা-
-জি, মালকিন। ভেতর থেকে আওয়াজ আসে।
-মেহমান হাজির। গ্লাস লে আও।
গ্লাস আসে। জব্বার মিঞাকে আমি সোডা, টিক্কা কাবাব আনতে বলি। বলবন্ত আবার তখন গোস্ত খায় না, তার জন্য ওমলেট। দশ মিনিটের মধ্যেই জব্বার সব ব্যবস্থা করে ফেলে। জনি ওয়াকার সঙ্গেই নিয়ে এসেছিলেন বারিসাব। তিনটে গ্লাসে হুইস্কি, সোডা ঢালা হল। সঙ্গে বরফ। আমি জানতাম, বলবন্ত খাবে না। একটা গ্লাস মালকিনের দিকে এগিয়ে দিয়ে তার উরুতে চাপড় মেরে বললাম, পিজিয়ে, মেরি জান।
ছুরির ফলার মতো তার দৃষ্টি আমকে বিধল, আমার হাত থেকে গ্লাস নিয়ে মালকিন বলল, মেরি জান কা মতলব জানতে হো জনাব?
