নৌকো মাঝদরিয়ায় পৌঁছলে খানম বিলকিসকে বাইরে ডেকে আনল।- ওই যে বেটি, ওই ওখানে ইউসুফ ডুবে গেছিল। বিলকিস কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, খানম কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে নদীর বুকে ঝাঁপ দিল। তারপর অনেক খুঁজে খুঁজে নদীর গভীর থেকে তুলে আনা হল ইউসুফ-বিলকিসের মৃতদেহ। একে অন্যের হাত জড়িয়ে তারা জলের তলায় শুয়েছিল। জীবনে যা পায়নি, মৃত্যু তাদের সেই দান দিয়ে গেল। এরই নাম ইঙ্ক -এ-মজাজি থেকে ইক -এ হকিকির দিকে যাওয়া ভাইজানেরা।
আমাদের জীবনে ইউসুফের মতো শহাদাৎ আসে না। কেন জানেন? সারা জীবন প্রতীকের অরণ্যে পথ হারিয়ে আমরা ঘুরপাক খাই। জীবনকে যে বাজি ধরতে পারে, একমাত্র সেই পৌঁছতে পারে ইশক-এর কাছে। তার কোনও নাম নেই, সে অনাদি, অনন্ত এই বিশ্বসংসারের সৌন্দর্য। আমরা কাকে সৌন্দর্য বলি? সুরা, বাহার, যৌবন, ইক। এরা বড় তাড়াতাড়ি ঝরে যায়। যে গোলাপের রূপ আপনারা দেখেছেন, সে হয়তো কোনও সুন্দরীর কবরের মাটি খুঁড়ে জন্মেছিল। সুন্দরীও একদিন কবরে গেছিল, গোলাপও একদিন ঝরে গেছে। যে বুলবুল গান গায়, তার গানে হয়তো কোনও মৃত শায়রের কবিতা লুকিয়ে থাকে। কিন্তু সেই বুলবুলও তো একদিন মরে যায়। এই দুনিয়া সৌন্দর্য বেশীদিন বাচে না ভাইজানেরা; গোলাপের গন্ধ, বুলবুলের গান আর আমাদের জীবন কত তাড়াতাড়ি হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। আর যৌবন, এ জীবনের বাহার, আরও তাড়াতাড়ি ঝরে যায়। শুধু খোদার দুনিয়াদারির সৌন্দর্যই অবিনশ্বর।
সে সৌন্দর্য পথের ধুলোয় দেখতে পাবেন, মান্টোভাই। এই ধুলো থেকেই আদমের জন্ম, আর ধুলোতেই সব মানুষ একদিন মিশে যায়। আমি একটা কথাই বুঝেছি, ভাইজানেরা, যদি খোদার পথেও আমরা না যেতে পারি, তো ঠিক হ্যায়, কিন্তু আতরের শিশিটাকে কষ্ট দিও না। কী মান্টোভাই, অমন জুলজুল করে তাকিয়ে আছেন কেন? আরে, এই সামান্য কথাটা বুঝলেন না? দিল-এর কথাই তো বলছি। দিল একটা আতরের শিশি কি না, বলুন? মীরসাবকে কথাটা। একজন পীর বলেছিলেন, বেটা, কারোর আতরের শিশিটা কখনও ভেঙে দিও না। সেখানেই তো খোদাতালার ঘর। এই খাঁচার ভেতরে কতটুকু ছোট সে, তবু তারই মধ্যে মহাসাগর, তারই ভেতরে লুকিয়ে আছে মরুভূমি। এই কথা যে জানে, সেই তো বলতে পারে, কে তুমি নবাব, কে তুমি উজির, আমি কি পরোয়া করি, দ্যাখো, আমি কি ফকির নই?
আমি তো যমুনার জল থেকে উঠে আসা দরবেশবাবার হাত ধরেই একদিন চলে যেতে চেয়েছিলুম অজানার পথে। তিনি আমাকে সঙ্গে নিলেন না, বললেন, আয়নাটাকে বারবার মোছ, তোর জন্য অপেক্ষা করে আছে শব্দের কুহক, নিশিডাক। তারপর একদিন ভেঙেই গেল, আমি কী দেখতে পেলুম জানেন? আরে, যে -ফকির হয়ে জন্মেছিলুম, আমি তো সেই ফকিরই আছি, মাঝখানে একটু মদ-মেয়েমানুষ-নবাবের দেওয়া খেতাব। এসব ঝরে যেতে আর কদিন সময় লাগল?
১৮৫৭-র বেশ কয়েক বছর পরের কথা। একজন ফকিরসাব এসে আমার দরজার সমানে গান গাইতে গাইতে ভিক্ষা চাইছিলেন। আমি চমকে উঠলাম। এ তো আমার লেখা গজল। ফকিরসাব কোথায় পেলেন? আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলুম, এই গান কার লেখা?
-এসব তো পথেই লেখা হয়, হুজুর।
আমি ফকির হতে পেরেছি কি না জানি। মান্টোভাই, আমার গান তো ফকিরির পথে চলে যেতে পেরেছে। ধূলায় ধূলায় যাঁর চরণ পাতা, সেই চরণের আলপনায় মাথা রাখতে পেরেছে। কবির কাছে এই তো তার রিজবানের বাগিচা।
১৮. রিজবানের বাগিচা
ফল-কো দেখ-কে করতা হূঁ য়াদ উসকো, অসদ;
জফা-্মেঁ উস-কে হৈ আন্দাজ কার্ফর্মাঁ-কা।।
(আকাশের দিকে তাকালে তার কথাই মনে আসে,
আসাদ; তার নিষ্ঠুরতায় আমি যে দেখেছি বিধাতার নিষ্ঠুরতার আদল।)
রিজবানের বাগিচা। না, মির্জাসাব, স্বর্গের বাগানে ঢোকার অধিকার আমার ছিল না, এমনকী সেই বাগানের খুশবুটুকুও আমার কাছে এসে কোনওদিন পৌঁছয়নি। তবু আল্লার কাছে আমি প্রার্থনা জানিয়েছিলাম, এই কালো আত্মা, সাদাত হাসান মান্টোকে দুনিয়া থেকে নিয়ে যাও, সুগন্ধ ছেড়ে সে কেবল বদবুর পেছনেই দৌড়য়। জ্বলন্ত সূর্যকে সে ঘৃণা করে আর ঢুকে পড়ে। অন্ধকার গোলকধাঁধায়। যা কিছু ভদ্র-সভ্য, তার মুখে লাথি ঝেড়ে সে ল্যাংটো সত্যকে জড়িয়ে ধরে। তেতো ফল খেতেই ভালবাসে সে। বাড়ির বেগমদের প্রতি কোনও টান নেই, বেশ্যাদের নিয়ে আনন্দের সপ্তম স্বর্গে পৌঁছতে চায়। সবাই যখন কাঁদে, সে হাসে; আর অন্যরা যখন হাসে, সে কাঁদে। নোংরায় যে মুখ কালো হয়ে গেছে তাকে ধুয়েমুছে, পুরনো মুখটা খুঁজে পেতে চায় মান্টো। খোদা, এই শয়তানকে, ভ্রষ্ট ফরিস্তাকে তুমি একবার বাঁচাও।
না, ভাইজানেরা, খোদা আমার ডাকে সাড়া দেননি। আমি তখন কী করি? কিস্সার পর কিস্সা জমা করতে লাগলাম জামার পকেটে। সবার কিস্স মাথায় থাকে, আর আমার পকেটে। কেন জানেন? কিস্সা লেখার জন্য আগাম টাকা নিতাম যে। টাকা যেমন পকেটে ঢোকে, কিস্সাও তেমনই পকেট থেকে বেরোয়। লোকে ভাবত, জাদুকর। এত কিস্সা পায় কোথা থেকে? আরে ভাই, কিস্সার কী অভাব আছে? তোমার চোখে যদি ঠুলি না পরানো থাকে, তবে তুমি সব জায়গাতেই কিস্সা খুঁজে পাবে। তোমার হাতে যদি কোনও গজফিতে না থাকে, তা হলে সব মানুষের কিস্সাই তোমার কিস্সা। প্রগতিশীলেরা আর মোল্লারা এইজন্য আমাকে সহ্য করতে পারত না, ওদের হাতে তো গজফিতে থাকত, সেই মাপে মিললে গপ্পো লেখা যাবে, না হলে সে গপ্পোকে জীবন থেকে বাদ দাও। ওদের কীভাবে বোঝাব বলুন, মান্টো কখনও নিজেকে লেখক হিসেবে দেখাতে চায়নি। একটা ভেঙেপড়া দেওয়াল, প্লাস্টার খসে পড়ছে, আর মাটিতে কত অজানা নকশা তৈরি হচ্ছে-আমি ওইরকম একটা দেওয়াল। গাড়ির পেছনে যে পাঁচ নম্বর চাকাটা আটকানো থাকে, কাজে লাগতে পারে, নাও লাগতে পারে, আমি সেই চাকাটা। বিশ্বাস করুন, কখনও শান্তি পাইনি আমি, কোনও কিছু পেয়ে মনে হয়নি, এবার পূর্ণ হলাম। কী এক অভাববোধ, ভাইজানেরা, একটা কিছু আমার মধ্যে নেই, আমি অসম্পূর্ণ, সবসময় এমনটাই মনে হত। আমার শরীরের তাপমাত্রা সবসময় স্বাভাবিকের থেকে এক ডিগ্রি ওপরে থাকত। সবসময় যেন এক ঘূর্ণিস্রোত আমার ভিতরে পাক খেয়ে চলেছে। আপনারা হয়ত হাসবেন, তবু আমার মনে হয়, যাদের শরীরের তাপমাত্রা সবসময় স্বাভাবিক থাকে, কবিতা-কিস্সা লেখা তো বাদ দিন, তারা একটা গাছ বা নদীকেও ভালোবাসতে পারে না। আমি বলছি, ভাইজানেরা, শুনে রাখুন, পাগলামি ছাড়া, অস্বাভাবিকতা ছাড়া কোনও সৃষ্টি, ভালবাসার জন্ম হয় না, ভালবাসা মাপজোক করে হয় না; তুমি আমাকে এতটুকু দেবে তো, আমি তোমাকে এতটুকু দেব, এর। নাম সংসার, ভালবাসা নয়, মজার কথা, এইরকম হিসেবনিকেশকে মানুষ ভালবাসা মনে করে। সত্যিকারের মহব্বৎ আমি দেখেছি হিরামান্ডিতে, ফরাস রোডে-সব লালবাতির মহল্লা-ভালবাসার জন্য ফতুর হয়ে যেতে পারে, খুন করতেও পারে। কিন্তু বাবুদের চোখে ওরা তো সব রেন্ডি, শরীর নিয়ে ব্যবসা করে, মহব্বতের ওরা কী জানে? না, না, মির্জাসাব, অমন অসহায় চোখে। আপনি তাকিয়ে থাকবেন না, আমি তো জানি, আপনি, একমাত্র আপনিই তবায়েফদের দিলমঞ্জিলে পৌঁছতে পেরেছিলেন। আমিও তো তাই দেখলাম, কোঠায় কোঠায় মাংস বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, আর মাংসের ভেতরের নূর- সৌগন্ধীদের দি-ইকের জন্য নিজেকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।
