দস্ত অয তলব ন দারম
তা কামে মন রব আয়দ
য়া জাঁ রসব ব জানা
যা জাঁ যূ তন বর আয়।
বু কুশাএ তুরবতমরা
বাদ অয বফাৎ ব বনিগর
কয আতিশে দরম
দূদ অয কফন বর আয়দ
(আকাঙ্খ থেকে সরাব না হাত
বাসনা আমার সিদ্ধ না হলে;
হয় পাবে প্রাণ বধূর নাগাল,
নয়ত যাবে সে দেহ ছেড়ে চলে।
মরলে আমার কবরটা খুঁড়ে,
দেখো তুমি, গেছে অন্তরে রয়ে
যেহেতু আগুন, কাফন আমার
রয়েছে ধোঁয়ায় ধোঁয়াকার হয়ে।)
সেই দিন থেকে ইউসুফ পাথরের মূর্তির মতোই সেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইল জানলার দিকে তাকিয়ে, কখন আবার সেখানে পূর্ণিমার চাঁদ দেখা দেবে। রাস্তা দিয়ে লোকজন যায়, ইউসুফের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, ভাবে এ ছোকরা নিশ্চয়ই পাগল হয়ে গেছে। কারোর কারোর কষ্টও হয়, ইউসুফকে জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে ভাই, কোন দুঃখে এমন পাথর হয়ে আছ? ইউসুফ কথা বলে না, শধু জানলার দিকে আঙুল তুলে দেখায়। একদিন সবাই রহস্যটা বুঝতে পারল। আরে, এ ছেলে তো বিলকিসের জন্য দিওয়ানা হয়ে গেছে। বলতে ভুলেছি, ভাইজানেরা, মেয়েটির নাম ছিল বিলকিস। তো তার বাপ-ভায়েরা প্রথমে ভাবল, এ ছোকরাকে নিকেশ করে দিতে হবে; পরে মনে হল, খুনের দায়ে ধরা পড়লে তাদের মহলে কাক-চিলও এসে বসবে না। কী করল জানেন? রটিয়ে দিল, ইউসুফ পাগল। কেউ পাগল হয়ে গেছে, কথাটা রটিয়ে দেওয়ার জন্য তো কোনও দায় নিতে হয় না। একজন মানুষের জীবন নরক। করে দেওয়ার জন্য তো কোনও দায় নিতে হয় না। একজন মানুষের জীবন নরক করে দেওয়ায় জন্য এর চেয়ে ভাল উপায় আর কী আছে? ও পাগল? বেশ, তা হলে এবার ওর গায়ে। থুতু ফ্যালো, পাথর ছোঁড়ো, ওকে শেকল দিয়ে বাঁধ, কুঠুরিতে আটকে ফেলো। কিন্তু ইউসুফের গায়ে পাথর ছুঁড়ে ছুঁড়েও কিছু হল না, রক্তাক্ত হয়েও সে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।
হযার দুশ্মনম অর
মী কুনন্দ ক হনাক
গরম তু দোস্তী অয
দুশ্মনাঁ ন দদারম বাক।
মরা উম্মীদে বিসালে-তু
যিন্দা মীদারদ
বগরনা হরদমম অয
হিজতস্ত বীমে হলাক।
(আমার হাজারো দুশমন যদি
আঁটে মতলব আমাকে মারার,
আমি একটুও ভয় করব না
যদি কাছে থাকো, বন্ধু আমার।
মিলবেই সান্নিধ্য তোমার–
বাঁচায় আমাকে এই আশ্বাস;
তুমি কাছে নেই অহরহ তাই
দেখাচ্ছে ভয় সমূহবিনাশ।)
বিলকিসের বাপ-মা তখন ঠিক করল, নদীর ওপারের শহরে তার চাচার বাড়িতে বিলকিসকে রেখে আসাই ঠিক হবে। গোপন পালকিতে চাপিয়ে বের করা হল বিলকিসকে, সঙ্গে তার পুরনো দাসী। ইউসুফ যেন আশিকের গন্ধ পেয়েছিল, সে পালকির সঙ্গে দৌড়তে লাগল, আর চিৎকার করছিল, রহ করো মেরি জান, একবার মুঝসে বাত করো। বিলকিস কোনও কথা বলেনি, কিন্তু সেই দাসীর মন উথালপাথাল করে উঠেছিল। পালকি থেকে মুখ বের করে সে বলেছিল, আরও কিছুদিন অপেক্ষা করো, আমার বেটির সঙ্গে তোমার দেখা হবেই। পালকি নদীর ঘাটে গিয়ে পৌঁছল, বিলকিস নৌকায় উঠে গেল, ইউসুফ নৌকার দিকে তাকিয়ে ঘাটেই বসে রইল, নৌকো যখন মাঝদরিয়ায়, দাসী বিলকিসের একপাটি চটি নদীতে ছুঁড়ে দিয়ে ইউসুফকে চেঁচিয়ে বলল, আমার বেটিকে সত্যিই ভালবাসলে চটিটা ফিরিয়ে এনে দাও। দাসী সত্যিই চেয়েছিল, ইউসুফ আর বিলকিসের যেন মিলন হয়, সে তো জানত না ইউসুফ সাঁতার জানে না। ইউসুফ কিন্তু জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল, তার পর খাবি খেতে খেতে তলিয়ে গেল। বিলকিস নৌকায় দাঁড়িয়ে ইউসুফের মৃত্যু দেখতে পেল। এ কে? বেহস্তের কোন ফুল? তাঁকে। এত ভালবাসত? বিলকিস কোনও কথা বলতে পারেনি, তার হয় তো মনে হয়েছিল, বাহার তো এসে গেছে, ফুলও ফুটেছে গাছে গাছে, তবু হে প্রিয় বাগান আমার, তাঁকে কেন এভাবে কেড়ে নিলে?
বাহার অওর বাগ। এই দুটো শব্দ বলতে গেলে আমার গলা কেন এমন ধরে আসে, বলুন তো মান্টোভাই? শব্দ দুটো যখন উচ্চারণ করি, মনে হয়, মুখের ভেতরে গোলাপের পাপড়ি পাখনা মেলেছে। তবু এই দুটি শব্দ মৃত্যুর কুয়াশায় ঢাকা কেন বলুন তো? ও বাহার, ও বাগ। বসন্ত আর বাগান কেন আমাকে বারবার মৃত্যুর কথাই বলে?
ভয় পাবেন না, ভাইজানেরা, কিস্যার কথা আমি ভুলিনি। শুধু বলতে বলতে এক একটা শব্দের জন্য এত কষ্ট হয়, মনে হয় তাদের জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। তো যে কথা বলছিলুম, ইউসুফ তো জলে ডুবে মারা গেল। বিলকিস কিছুদিন চাচার বাড়িতে থাকার পর তার বাপ-মা ভাবল, ছোঁড়াটা তো মরেইছে, এবার মেয়েকে ফিরিয়ে আনাই যায়। সেই নদীপথেই তো ফিরে আসা। বিলকিস নৌকায় উঠে দাসীকে বলল, খানম, একবার এই নদীকে দেখতে দেবে? আমি তো এমন নদী কখনও দেখিনি।
-দেখো না বেটি, মন ভরে দেখ। একবার নদিকে যদি দেখতে থাকো, তোমার দেখা আর ফুরোতে চাইবে না।
নদীর সম্পর্কে কত কথাই না জানতে চাইল বিলকিস, নদীর পাড়ে পাড়ে যত বসতি, সেখানে কারা থাকে, কেমন মানুষ তারা, কী করে-কথা যেন তার ফুরোতেই চায় না। শেষে সে জিজ্ঞেস করল, খানম, সে কোথায় ডুবেছিল বল তো, চিনতে পারো?
-কেন বেটি?
-সেখানে কি খুব জল?
-মাঝদরিয়া যে।
-আমায় দেখাবে।
-কী দেখবে বেটি?
-মাঝদরিয়ায় কত জল।
-দেখাব বেটি। মাঝদরিয়ায় কত জল, কত স্রোত, অতচ কী যে শান্ত। খোদা জানেন, কেন এমন হয়!
বিলকিস আপন মনে বিড়বিড় করে কথা বলছিল, খানম তা শুনতে পায়নি। বিলকিস কী বলছিল জানেন?-সে কেন জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা একা কথা কয়! এসব কথা মীরসাব যে কোথায় পেলেন, আর বিলকিসের মুখে বসিয়ে দিলেন, খোদাই জানেন। মান্টোভাই, আপনি কি শেরটা কোথাও শুনেছেন?
