তা হলে ভাইজানেরা, আমি না হয় মীরসাবের একটা মনসবির কথা বলি। ইশকের কথা বলতে গেলে মীরসাবের কথাই বারবার বলতে হবে আমাদের। ভালবাসায় আহত, নুয়ে পড়া মানুষ ছিল তাঁর কাছে খাঁচায় বন্দি বুলবুলের মতো, আর সেই বুলবুলের বিলাপ শুনতে শুনতে তার মনে হয়েছিল, আসলে তিনিই ওই খাঁচায় বন্দি পাখি। মান্টোভাই, আপনি কি কখনও দরিয়া-এ-ইশ পড়েছেন? ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন কেন? আরে, আমি তো জানি, আপনি পড়েননি। আমি তো দিল্লিতে কত কত লোককে দেখেছি, কলকাতায় দেখেছি, তাঁরা হিন্দুস্থানের লেখাজোখা পড়তই না, গোরাদের লেখাই ছিল তাদের কাছে শেষ কথা। তা সাদা চামড়া আর ওঁদের তমদুনের প্রতি আমারও একসময় খুব মোহ ছিল। তাঁদের বন্ধু বলেও ভাবতুম, কিন্তু ১৮৫৭ আমার চোখ খুলে দিয়েছিল। তমদুনের নামে ওরা যে এই দেশে একের পর এক কারবালা তৈরি করতে এসেছে, বুঝতে পারলুম।
না, না, উত্তেজিত হবেন না ভাইজানেরা, দরিয়া-এ ইশক-এর কিস্সাটা এবার আপনাদের শোনাব। এই কিস্সা শোনবার কথা নয় আপনাদের। যদি অন্য কোনও জন্মে যান এই কিস্সার স্মৃতি নিয়ে যেতে পারবেন। যতই বদনসিব হই, আমার আবার এই দুনিয়ায় জন্মাতে ইচ্ছে করে। কেন জানেন? আমরা হলুম আসরাফ-উল-মশ্লাকাৎ, আল্লার তৈরি সেরা জীব, আদম; জিব্রাইলরাও আমাদের সামনে মাথা নুইয়েছিল, ইবলিশ তা করেনি বলে তাঁকে বেহস্ত থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। আমরা এক-একটা আয়না, ভাইজানেরা, যার ভেতরে খোদা নিজেকে দেখতে পান। আর ইক্ষ হচ্ছে আয়নার গভীরে লুকিয়ে থাকা সেই ছায়া, আপনারা কখনও তাকে দেখতে পাবেন না।
মাঝে দু-একটা কথা বলে নিতে দিন। ভাববেন না, বুড়োহাবড়া গালিব যা মনে আসছে তা-ই বলছে। কিস্স বলারও তো একটা তরিকা আছে। তরিকার প্রথম কথাটা হচ্ছে এই, যে কিস্সার মধ্যে আপনি নেই, তা আপনি বলতে পারেন না। তো কীভাবে থাকেন আপনি একটা কিস্সার মধ্যে? আপনার বাগানের যে-গাছটার কথা আপনি মন দিয়ে বলেন, তা তো বলতে পারেন, গাছটাকে ভালবাসেন বলেই। এই ভালবাসার মধ্যেই আপনি থাকেন; আপনি মানে তো শুধু রক্তমাংসের একটা শরীর নয়, আপনার কত রহস্য, যা দিয়ে আপনি গাছটাকে ভালবাসেন। তাই এত কথা বলছি। মীরসাবের মনসিবগুলো আমি লিখিনি, কিন্তু পাঠক হিসাবে কোথাও তো আমি তাদের সঙ্গে জড়িয়ে আছি, সেটাই তো থাকা; এভাবেই একজন কবিও তার কবিতার। মধ্যে থাকেন। বাজপাখিটা যখন ওড়ে আকাশে, তার ছায়া পড়ে মাটির বুকে; থাকাটা এইরকম, ছায়ার মতো; আমি নেই, কিন্তু আমি-ই আছি অন্য চেহারায়।
আশিকও সেভাবেই থাকে। সারাজীবন তো সে থাকে না, এমনকী পাশে পাশে থাকলেও সে আসলে পাশে থাকে না। শুধু তার একটা ছায়া থেকে যায়, যাকে আমরা সারাজীবন ভালবাসি। দীর্ঘদিন ধরে চুইয়ে চুইয়ে পড়া রক্তের মতো সেই ছায়া; নগ্ন বালিকার মতো, কোমল, যেন এই মাত্র সে ঘুমিয়ে পড়বে।
দরিয়া-এ-ইশক এমনই এক ঘুমিয়ে পড়ার কিস্সা। ভালবেসে, সেই ছেলেটি, এই ঘুম চেয়েছিল বুঝি? কে জানে! মেয়েটাও তো জানেনি, ইকের কাছেই একদিন ঘুমোতে যেতে হবে তাকে। ছেলেটি বড় সুন্দর ছিল, ভাইজানেরা। সাইপ্রেস গাছের মতো দীর্ঘ, হৃদয় তার মোমের চেয়ে কোমল, প্রত্যেক শিরা-ধমনীতে ভালবাসার স্রোত। এইরকম পুরুষ পৃথিবীতে মরার জন্যই জন্মায়। না-হলে তাদের জেলখানায় বেগার খাটানো হয়, পাগলাগারদে পাঠিয়ে মারা হয়। মীরসাবেকে মাঝে মাঝে স্বপ্নে দেখতুম আমি, সেই কুঠুরিতে, যেখানে তাঁকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। কুকুরের মতো গুটি পাকিয়ে শুয়ে আছেন। একদিন তাঁর সামনে মেহর নিগার ফুটে উঠলেন।
-তুমি? মীরসাব অস্ফুটে বললেন।
-এভাবে বেঁচে থাকবে?
-খোয়াব-এ-খেয়াল বেগম।
-শুধু আমার জন্য?
-না।
-তা হলে?
-মেহর নিগার। বেগম, একটা নাম আমাকে ভালবেসেছিল। আমি তার জন্যই এভাবে বেঁচে আছি।
-আর আমি?
-তুমি কেউ নও, তুমি তো ভয় পেয়েছিলে। সবাইকে সব কথা বলে দিয়েছিলে।
-আমাকে কেউ বাঁচতে দিত না, মীর। ওরা আমাকে গোরে পাঠিয়ে দিত।
-জানি।
-তুমি আমাকে নফরৎ কর?
-না। মেহর নিগারকে আমি এখনও দেখতে পাই। সে এখনও আমার দিলমঞ্জিলে বেঁচে আছে। যখন সে আমার জীবনে এসেছিল, সে তো অনেক পুরনো দিকের কথা।
-বলল, আমাকে ঘেন্না করো।
-না।
-কেন?
-তুমি আজ আর আমার জীবনে নেই, বেগম। একটা নাম পড়ে আছে। খোদার দেওয়া একটা নাম, আমি তাকেই ভালবাসি।
ভালবাসার নদীতে খোদার দেওয়া কত নাম যে এভাবে ভেসে যায়।
না, আমি আপনাদের ঠকাব না। সেই সুন্দর ছেলেটার কিস্সাতেই ফিরে আসছি, দরিয়া-এ ইশক-এ ডুবে যার মৃত্যু হয়েছিল। তার নামও ছিল ইউসুফ। খোদা কী যে এক দিন আনলেন তার জীবনে, রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার চোখ আটকে গেল এক মহলের জানলায়। কে। ছিল সেই জানলায়? নিয়তি বলুন, আর আশিকই বলুন, তারই মুখ সে দেখতে পেল জানলায়। শিকারীর মতো দুটি চোখ যেন তাকিয়ে আছে তার দিকে, ইউসুফের মনে হল, মরার জন্যই সে ওই চোখের দিকে তাকিয়ে প্রেমে পড়ে গেল। ইউসুফ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল রাস্তায়। মেয়েটি তোয়াক্কাও করল না, ওড়নায় মুখ ঢেকে জানলা থেকে হারিয়ে গেল। কিন্তু ইউসুফ তো দিওয়ানা বেতাব। হাফিহসাব যেন তার মনের নাগাল পেয়েছিলেন!
