-ঠিক আছে। আমি হেসে ফেললাম।-এবার যাও।
বেগু অনেকটা চলে যাওয়ার পর ফিরে এল। আমি একটা গাছের নীচে বসেছিলাম। দূর থেকে হাতের জিনিসটা সে আমার কোলে ছুঁড়ে দিয়ে দৌড় লাগাল। কী হল জানেন? একটা লজেন্স। আমি অবাক হয়ে গেলাম, কেন সে অমন লজ্জা পেয়েছিল লজেন্সটা দেখাতে, কেনই বা ফিরে এসে আমাকে দিয়ে চলে গিয়েছিল। মির্জাসাব, সেদিনই বেগমের সঙ্গে আমার শেষ দেখা। আর তাঁকে দেখিনি। দুয়েকদিনের মধ্যে আমিও বাতোতকে বিদায় জানিয়েছিলাম। লজেন্সটা আমার জামার পকেটেই রয়ে গিয়েছিল। বাড়ি ফিরে টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিলাম। বেগমের একমাত্র স্মৃতি। কিন্তু স্মৃতি আর কতদিন বাঁচে বলুন, একদিন ড্রয়ার খুলে দেখলাম, লজেন্সটাকে ঘিরে বেশ ভোজ জমে গেছে পিঁপড়েদের।
ইসমতকে একদিন বেগমের কথা বলেছিলাম। সব শুনে সে বলল উঠল, এটা একটা প্রেম হল, মান্টোভাই? তোমার কাছ থেকে আমি একটা দুর্দান্ত লাভ স্টোরি আশা করেছিলাম। হাস্যকর।
-কেন হাস্যকর কেন?
-একটা পচা, থার্ড ক্লাশ লাভ স্টোরি। একটা চিনির ড্যালা পকেটে নিয়ে ফিরে এসে ভাবলে, কী নায়কের মতো কাজই না করেছ। ছ্যাঃ ছ্যাঃ।
আমি চুপ করে গিয়েছিলাম।
-কী হল? কিছু তো বলো। ইসমত আমাকে খোঁচাতে লাগল।
-কী করতাম ইসমত? কী করলে তুমি খুশি হতে?বেগমের সঙ্গে শুয়ে ওর পেটে একটা অবৈধ বাচ্চা রেখে আসতাম, তাই তো? তা হলে লাভ স্টোরিটা জমত, না? হাতের পেশী ফুলিয়ে বলা যেত, আমার মতো পুরুষ দুনিয়ায় নেই। হাঃ হাঃ, আমাকে কি তুমি এইরকম দেখতে চেয়েছ ইসমত?
ইসমত আমার হাত চেপে ধরেছিল, তার দুচোখে কুয়াশা।
১৭. পয়গম্বর, হৃদয়, পথ হৃদয়, খুদাও হৃদয়
তরীক-এ ইশ মেঁ হ্যয় রাহনুমা দিল
পয়ম্বর দিল হ্যয় কিবলহ্ দিল খুদা দিল।।
(প্রেমধর্মে পথপ্রদর্শক এই হৃদয়,
পয়গম্বর, হৃদয়, পথ হৃদয়, খুদাও হৃদয়।)
মুনিরাবাই আমাকে ছেড়ে চলে গেল, আমার উর্দু গজলের প্রথম দিবান সংকলন করলুম, সেই সঙ্গে ঠিক করলুম, এখন থেকে ফারসিতেই লিখব, ফারসি ছাড়া গজলের রোশনাই তো খোলে না, কিন্তু কোথা থেকে কী যে হয়ে গেল, মান্টোভাই, শুরু হল আমাকে নিয়ে নসিবের খেলা। হৃদয়ের সঙ্গে আনন্দের যে সম্পর্ক ছিল, তা ভেঙে গেল, শুধু গোপনে, কোথায় যেন টুপ টুপ ফোঁটায় রক্ত ঝরতে লাগল। খুশির সঙ্গে আমাদের যে-সম্পর্ক, তা তো খুব জোরদার, না। মান্টোভাই? খুশি ছাড়া আমরা আর কী চাই জীবনে? আরও কত জোরালো শক্তি এসে এই স্বাভাবিক সম্পর্কটাকে ভেঙে দেয় ভাবুন। একদিন রাতে আমি আমার দিল্কে বললুম, হ্যাঁ হৃদয়কেই তো একমাত্র বলা যায়, সে-ই তো আমাদের এবাদত-গাহ্, আমি তাঁকে বললুম, আমাকে কথা বলার শক্তি দাও, আমি যেন জাঁহাপনার কাছে গিয়ে বলতে পারি, হুজুর, আমিই সব রহস্যের আয়না, আমাকে ঝকমকে করে তুলুন; কবিতা আমার ভেতর থেকে জন্ম নেয়। আমাকে একটু আরাম দিন। হৃদয় আমাকে মুচকি হেসে বলল, বুরবাক কাহিকা, এসব কথা বলার সময় এখন পেরিয়ে গেছে। যদি কিছু বলারই থাকে, তবে শুধু এটুকুই বলল, আমি আহত, আমার ক্ষতের জন্য মলম দিন; আমি মৃত, আমাকে আবার বাঁচিয়ে তুলুন। আমি যেন কারো হাতে আঁকা, বিবর্ণ বুলবুল হয়ে গেলুম; শত গোলাপের গন্ধেও তো সেই বুলবুলের হৃদয় গান গেয়ে উঠবে না।
না, না, ভাইজানেরা, অমন মলিন মুখে শুয়ে পড়বেন না, দুই বদনসিব আত্মার কিস্সা যখন শুনতে শুরু করেছেন, তা শেষতক শোনার দায় তো আপনাদের নিতেই হবে। কিন্তু এতক্ষণ। ধরে আমাদের মহব্বতের কথা শুনতে শুনতে যে -খোঁয়াড়ির ভেতরে আপনারা ডুবে গেছেন, সে -খোঁয়াড়িটা এখনই ভেঙে দিতে চাই না। আর কথা দিচ্ছি, আমার এই অন্ধকারের কিস্সা যতদিন চলবে, মাঝে মাঝে আপনারা আলো-হাওয়া পাবেন ভাইজানেরা, আমি আপনাদের মাঝে মাঝে এমন সব কিস্সা -হিকায়ৎ শোনাব, এমন সব দস্তানগোদের কাছে নিয়ে যাব যে এই জীবনটাকে ভারী পাথরের মতো মনে হবে না। হ্যাঁ, উঠে বসুন সবাই, মহব্বতের নানা কথা – কিস্লাই এখন আপনাদের শোনাতে চাই। সত্যি বলতে কী, জীবনে আমি যতই দোজখের গভীর থেকে গভীরে ঢুকেছি, ততই ইশক – এর স্মৃতিই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এই যে জীবন আমাদের, এই যে পয়দা হওয়া, এও ইঙ্ক ছাড়া কী? এ হল ইশক -এ মজাজি, এই দুনিয়ার প্রেম। আর আমরা যতই মৃত্যুর দিকে এগোই, ইশক-এ-হকিকির পথ খুলে যায়। আমাদের সামনে। ইশক-এ-হকিকি তো খোদার জন্যই তুলে রাখতে হয়। তখন আপনার। সামনে আর বেগম ফলক আরা নেই, মুনিরাবাই নেই, মান্টোভাইয়ের বেগু নেই, ইসমত নেই, আছেন শুধু তিনি, অহুমদুলিল্লা। কিন্তু ইশক-এ হকিকির পথে কজন আর যেতে পারে বলুন? পেরেছিলেন মওলা রুমি। আমরা তো এক একটা পতঙ্গ, ইশক-এ-মজাজির ফাঁদেই ঘুরপাক খাই। মজাটা খেয়াল করেছেন, মান্টোভাই? এই দুনিয়ার প্রেম হচ্ছে ই-এ-মজাজি, যেন একটা ছবিকে ভালবাসা, প্রতীককে ভালবাসা; আর ইশক-এ-হকিকি, যা শুধু আল্লার জন্য, তা-ই সত্যিকারের প্রেম। এর মানে কী দাঁড়ায়, বলুন? আমরা সব ছায়াপুতুল, ভালবাসার প্রতিকী অরণ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি। ইঙ্ক-এ-হকিকির পথে যদি নাও যেতে পারি, এই বা কম কী, মান্টোভাই? একটা ছবিকে ভালবাসতে পারাও কি কম কথা? এই দুনিয়াদারির জীবন তো ওটুকুতেই ধন্য হয়ে যায়। ছবিকে ভালবেসে তো কেউ মৃত্যুকেও বেছে নেয় -সেই মৃত্যু কি ইশক-এ-হকিকির পথের দিকে তাকিয়ে থাকে না?
