ওর নাম সত্যি সত্যিই কী ছিল, আমি ভুলে গেছি। হ্যাঁ, বেগু বলেই ডাকতাম মনে হয়, কখনও। ওয়াজির, কখনও বা বেগম বলেও ডেকেছি। পাহাড়দেশের মেয়ে সে, গায়ের রং ছিল। একেবারে গোলাপের মতো, আর লজ্জা পেলে তার মুখ হয়ে যেত ভোরের সূর্যের মতো। সারাদিন পাহাড়ে পাহাড়ে ছাগল চড়িয়ে বেড়াত বেগু। মাঝে মাঝেই কোনও ছাগল হারিয়ে গেলে মুখের কাছে দুহাত এনে তাকে ডাকত বেগু আর তার ডাকের প্রতিধ্বনিতে পাহাড় যেন। প্রাণ পেয়ে জেগে উঠত।
এমন মেয়েকে এ-দুনিয়া সত্যিই একেবারই পায়। সরু, লম্বা নাক। আর চোখ? অমন চোখ আমি খুব কম দেখেছি। বেগুর দুচোখ যেন ধরে রেখেছিল পাহাড়ের গভীরতা। লম্বা, পুরু। আমার সামনে দিয়ে যখন হেঁটে যেত, মনে হত, সূর্যের একটা রশ্মি এসে ওর চোখের পাতায় আটকে আছে। চওড়া কাঁধ, গোল গোল হাত। আর বুক দুটোকে মনে হত পাহাড়ি মুরগির মতো। একটুও বানিয়ে বলছি না, ভাইজানেরা, এই সৌন্দর্য একমাত্র দেখা যায় পাহাড়ি মিনিয়েচার ছবিতে। তার রূপের কথা বলতে হলে ওইসব ছবিতে দেখা অভিসারিকা রাধার কথাই বলতে হবে। পাহাড়ি পথে তাঁর হাটা, মাঝে মাঝে গান গেয়ে ওঠা, নিজের মনে মুচকি হাসা, যেন কারোর সঙ্গে মিলনের আকাঙ্খায় সে পাকদণ্ডি পথ বেয়ে চলেছে। সে এক অভিসারযাত্রাই।
আমি যখন বেগমকে প্রথম দেখি, মনে হল, আমার ভেতরে এত দিন ধরে জমে থাকা অন্ধকারে বিদ্যুৎরেখা ঝলসে উঠল। বেশ কয়েকদিন গাছের আড়াল থেকে আমি ওকে দেখতাম। বেগম তার ছাগল-ভেড়াদের সুর করে ডাকত, যেন সে কোনও গানের কলি হাওয়ায় ভাসিয়ে দিচ্ছে, আর সেই ডাকের প্রতিধ্বনি আমার ভেতরে একটা সম্পূর্ণ গানের ঝরনার মতোই এসে ফেটে পড়ত। একদিন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। দৌড়ে গিয়ে তার হাত চেপে ধরলাম, আর সে ভয় পাওয়া হরিণীর মতো আমাকেই আঁকড়ে ধরল। আমার খুব চুমু খেতে ইচ্ছে করছিল, ওকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতেও গিয়েছিলাম, কিন্তু এক ঝটকায় আমাকে ঠেলে দিয়ে বেগু পালাল। আর ওই চেষ্টা করিনি। কিন্তু ও একদিন নিজে থেকে এসেই আমার সঙ্গে কথা বলল। তারপর দিনের পর দিন বসে বসে আমরা যে কত গল্প করেছি। ভাইজানেরা, সেসব আমার পুরো মনে নেই। জানেন তো, মদ প্রথমে মাথাটাকে খায়, সব স্মৃতি আস্তে আস্তে মুছে যেতে থাকে, জীবনে যা ঘটেনি, তাকেও সত্যি বলে মনে হয়।
বেগমকে আমি আমার ভালবাসার কথা জানিয়েছিলাম। ও খিলখিল করে হেসে উঠেছিল।
তারপর ওড়নার খুঁট দাঁতে চিবোতে চিবোতে বলল, তুমি তো এই সরাইখানা থেকে চলে যাবে। তখনও ভালবাসবে আমাকে?
-কোথায় সরাইখানা?
-এই সরাইখানা।
-এই পাহাড় সরাইখানা! আমি তার কথায় হেসে ফেলি।
-দাদি বলে–
-কী বলে?
বেগু আর কিছু বলেনি। আমি বুঝতাম, সব কথা বলার মতো ভাষা নেই। কিন্তু ও অনুভব করতে পারে। মির্জাসাব, অনেকদিন পর একটা গল্প শুনে বেগুর কথা আমি বুঝতে পেরেছিলাম।
মাফ করবেন ভাইজানেরা, কিস্যাটা এখানে আমাকে বলে নিতেই হবে। না হলে, কী করে আপ্নারা বুঝবেন, একটা সরাইখানাতেই আমাদের দুজনের বেগমের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল?
ইব্রাহিম ইবন আদম একদিন দেওয়ান-ই-আম-এ বসে আছেন। রয়েছে তাঁর উজিরেরা, অন্য প্রজারা। এমন সময় লম্বা দাড়িওলা, ছেঁড়া আলখাল্লা পরা এক ফকির সোজা এসে সম্রাটের সিংহাসনের সামনে দাঁড়ালেন।
-কী চান আপনি? ইব্রাহিম জিজ্ঞেস করলেন।
-একটু দাঁড়াতে দিন। সবে তো এই সরাইখানায় এসে পৌঁছলাম।
-আপনি পাগল নাকি! ইব্রাহিম চড়া গলায় বলে উঠলেন, এটা সরাইখানা নয়, আমার প্রাসাদ।
-আপনার আগে এই প্রাসাদ কার ছিল? ফকির জিজ্ঞেস করলেন।
-আমার ওয়ালিদের।
-তাঁর ওয়ালিদের।
-তার আগে?
-সে অনেক পুরুষের কথা।
-তাঁরা এখন কোথায়?
-এত দিন বেঁচে থাকবেন নাকি? সকলেই গোরে গেছেন।
-যেখানে মানুষ আসে আর যায়, সেটা সরাইখানা ছাড়া কি? কথাটা বলেই ফকির অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
বেগুর দাদি ঠিকই বলেছিল, একের পর এক সরাইখানা পেরিয়েই তো আমরা মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাই।
বেগু একদিন বলল, তুমি আমার ওপর রাগ করে থাকবে না তো?
-কেন?
-ওই যে সেদিন-
-কী?
-তোমাকে চুমু খেতে দিইনি।
-আমি ভুলে গেছি বেগম।
-জানো, সবাই যে কেমন করে আমার সঙ্গে। এসে বলবে, তোর চোখ দুটো কী সুন্দর, তোর ঠোঁট দেখলে চুমু না খেয়ে থাকা যায় না। আমি কী বলি বলো তো? আমার এসব শুনতে বাল লাগে না। তোমাকেও আমি ওদের মতো ভেবেছিলাম।
-তা হলে আমি কী করব?
বেগু গালে হাত দিয়ে আমার দিকে তাকিয়েছিল। হেসে বলেছিল, তুমি ওদের মতো না, তুমি শরিফ।
একদিন দেখি বেগুর কুর্তার পকেট ভর্তি কী সব জিনিস। আমি বললুম, পকেট ভরে কী এত নিয়ে চলেছ?
-বলব না। বেগু বেণী দুলিয়ে হাসল।
-বলবে না? দাঁড়াও। আমি ওর হাত চেপে ধরলাম।-দেখাও, কী আছে। দেখাতেই হবে।
-ছোড় দিজিয়ে না-
-না, দেখাতেই হবে।
বেগু অসহায় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে একের পর এক আশ্চর্য সব জিনিস বার করতে লাগল। চিনারের শুকনো পাতা, খালি দেশলাই বাক্স, কয়েকটা নুড়ি পাথর, খবরের কাগজ থেকে কাটা হলুদ হয়ে যাওয়া একটা ছবি, চুলের ফিতে। কিন্তু একটা জিনিস কিছুতেই দেখাবে না। হাতের মুঠোয় চেপে দাঁড়িয়ে রইল।
-ওটা কী?
-না দেখাব না।
