বেতলব দে তো মজা উস-মে সিবা মিলতা হৈ;
বোহ্ গদা জিস-কো নহ্। হো খু-এ সবাল, আচ্ছা হৈ।।
(না-চাইতেই যদি দেন তিনি তো তার স্বাদই আলাদা;
সেই ভিখারি -শ্ৰেষ্ট, হাত পাতার অভ্যেস হয় নি যার।)
কিন্তু বার বার কেন এত নানারকম মুখোশ পরেন আপনি? কার ভয়ে? কার আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে?
-মান্টোভাই
-জি, মির্জাসাব।
-আপনি আমাকে নিয়ে কিস্সা লিখছেন বলে আমাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে ফর্দাফাই করতে পারেন না।
-কিন্তু আমি আপনাকে বুঝতে চাই।
-সে চেষ্টা করবেন না। মারুফসাবের বাড়ি থেকে আমি কেন বেরিয়ে এসেছিলুম জানেন। সেখানে তো সুখেই ছিলুম। কিন্তু প্রতি পদে তিনি আমাকে বুঝতে চাইতেন, মাপতে চাইতেন। কী অধিকার আছে আপনার আমাকে পুরোপুরি বুঝতে চাওয়ার?
-মানুষ তো মানুষকেই বুঝতে চেয়েছে, মির্জাসাব।
-বাখোয়াস বন্ধ করুন। মানুষ, মানুষ করে আপনাদের এত বড় বড় বুলি আমার সহ্য হয় না। বোঝার নাম করে আপনারা আসলে একজনকে সতরঞ্জের একটা-খোপে আটকে রাখতে চান। কী বুঝবেন আমাকে? আপনি কোনওদিন আমার স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নের ভেতরে ঢুকতে পারবেন? আপনি বুঝতে পারবেন, কেন আমি সারা রাত ঘুমের ভেতরে নিজের সঙ্গে কথা বলে যেতুম? আমি আমার কষ্টের কথা বলছি না। অপমানিত হতে হতে আমি আর অপমান গায়ে মাখতুম। না। মানুষ সবচেয়ে আনন্দ পায় তার পাশের মানুষকে অপমান করতে পারলে। কী ঢং-এ করে জানেন? তোমাকে আমি খুব ভালবাসি, এই কথা বলতে বলতে। লিখে নিন, আমি কাউকে ভালবাসতুম না। তাই অপমান করে গেছি, ঠাট্টা মশকরা করেছি। কিন্তু আমি তোমাকে ভালবাসি বলে কাউকে নর্দমায় ছুঁড়ে ফেলিনি। এই দুনিয়াদারিটা আপনার চেয়ে অনেক বেশীদিন আমি দেখেছি। শুনুন মান্টোভাই, একজন মানুষ নিজেই বলি, নিজেই জহ্লাদ ভাবতে পারেন? সে আমি-মির্জা গালিব। লিখতে গিয়ে কালি যেমন কাগজ ছেপে ছলকে যেতে পারে, তেমনি আমার নিয়তি পুঁথি, নির্বাসিতের রাতের চিত্রলিপি।
-মির্জাসাব
-বলুন।
-আপনাকে আমি কাটাছেঁড়া করছি না।
-মান্টোভাই, কেউ বেশীক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেই অস্বস্তি হত। কেন জানেন? সবাই একটা আসল মির্জা গালিবকে খুঁজে পেতে চায়। কিন্তু আমই তো একটা ছায়া ছাড়া আর কিছুই ছিলুম না।
-কার ছায়া মির্জাসাব?
-আমি তাঁকে সারা জীবনেও দেখতে পাইনি। ভোরের আজান শুনতে শুনতে মনে হত, তিনি আছেন, কোথাও আছেন, শুধু তাঁর ছায়া হয়ে আমি এই দুনিয়াতে পড়ে আছি।
-আমিও তারই ছায়া মির্জাসাব।
-বহুৎ খুব। এবার তা হলে আপনার ইকের কিস্সা শোনান। তেমন কিছু ঝুলিতে আছে তো? কোন এক ইসমতের কথা বারবার বলেন। আমি একটু শুয়ে শুয়ে শুনি।
.
কুয়াশার পর্দা দুলছে, তার ওপারে যেন আমার একটা জীবন।
ইসমতের কথা পরে বলা যাবে, ভাইজানেরা। আজ যদি কবরে শুয়ে আমি স্বীকার করি করি, ইসমতকে আমি ভালবাসতাম, সেও কি বাসত না আমাকে, ওপরের দুনিয়ার ব্যাপারটাকে এড়িয়ে গিয়েছিলাম, চাপা দিতে চেয়েছিলাম, নইলে বন্ধুত্বটুকু বেঁচে থাকত না। ভালবাসা নিয়ে অনেক কথা বলেছি আমরা, কিন্তু আমি সবসময়েই এমন একটা ভাব করেছি যে মহব্বৎ আসলে একটা কথার কথা, ও শব্দটার কোনও মানেই নেই। একবার আমি ওকে বললাম, কী মহব্বৎ বলতে তুমি কী বোঝ বলো তো?
-আমি তো তোমার কাছে শুনতে চাই মান্টোভাই।
-আমি-আমি কেন-আর আমি তো কতবার বলেছি, ওসব ভালবাসা-টাসা আমি বুঝি না।
-সবসময় একগুঁয়েমি করো না।
ইসমতের ধমকে আমি হেসে ফেলি।-তা হলে বলি শোন। আমি আমার সোনালি জরির এমব্রয়ডারি করা জুতো ভালবাসি, রফিক ওর পাঁচ নম্বর বিবিকে ভালবাসে। এই হচ্ছে মহব্বৎ
-মান্টোভাই তুমি নিজেকে কী মনে করো?
-কিছু না বহিনজি। আমি তো কতবার বলেছি, আমি একটা ফ্রড।
-আবার সেই কথা।
-এবার তুমি বলো, প্রেম কী?
-একজন যুবক আর যুবতীর মধ্যে যা জন্মায়।
-ওঃ তাই বলো। তা হলে আমিও প্রেমে পড়েছিলাম, বলা যায়।
-কীরকম? ইসমত বড় বড় চোখে তাকায়, যেন আমার কথা সে বিশ্বাস করতে পারছে না।
সেই কিস্সাটা আপনাদের পড়ে শোনাচ্ছি, মির্জাসাব। আমার জীবনে প্রথম রামধনু দেখা। তখন আমার বয়স হবে বাইশ-তেইশ। তিনবারের চেষ্টায় ম্যাট্রিক পাশ করার পর আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি-তে। আমার ফেল মারা দোস্ত সয়ীদ কুরেশীও সঙ্গে ছিল। কিন্তু ইউনিভার্সিটির কঠোর নিয়মকানুনের সঙ্গে আমি মানিয়ে চলতে পারতাম না। তবে ওখানকার শিক্ষক-ছাত্ররা অনেকেই আমাকে ভালবেসে ফেলেছিল। মানিয়ে নিতে না পারার জন্য শরীরটাও খারাপ হতে লাগল। বেশ কয়েক বছর ধরেই বুকে ব্যাথা হত, তার সঙ্গে জ্বর। অসুখটা এত বেড়ে গেল, এত ব্যথা হত যে দুহাটু বুকের কাছে এনে আমি বসে থাকতাম। এইভাবে বসে থাকার অভ্যেস আমার সারা জীবনের সঙ্গী হয়ে গেল। ব্যাথা ভুলতে দেশী মদ খেতে শুরু করলাম। কিন্তু নেশার সময়টুকু ছাড়া তো ব্যথা থেকে নিস্তার নেই। দিল্লিতে এলাম চিকিৎসা করাতে। এক্স-রে করে ধরে পড়ল, আমার টিবি মানে রুহ্ আফ হয়েছে। ইউনিভার্সিটি ছাড়তে হল। চিকিৎসা চালানোর মতো টাকাও নেই। দিদি ইকবাল বেগম এসে বাঁচাল। সব খরচ দিয়ে দিদি আমাকে পাঠাল বাতোত-এর এক হাসপাতালে। বানিয়ালের দিকে জম্মু-শ্রীনগর হাইওয়েতে পাহাড়ের ওপর বাতোত এক আশ্চর্য দ্বীপ যেন। জীবনে সেই প্রথম ও শেষবার আমি দুনিয়ার সেরা সৌন্দর্য দেখেছি, ভাইজানেরা। চারদিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়, পাইন চিনার-মজনুর অরণ্য কিছু দূরেই যেন হাত বাড়ালে ছোঁয়া যায়, হিমালয়ের তুষারঢাকা কত যে শৃঙ্গ। সারা জীবন ওইরকম একটা জায়গায় যদি থেকে যেতে পারতাম আমি।
