একদিন খবর পেলুম, মুনিরাবাই মরে গেছে। ওর মৃত্যুর সঙ্গে বেখুদি মহব্বতও আমাকে ছেড়ে চলে গেল। কিন্তু ওর চোখ দুটো তো আমাকে ছেড়ে গেল না। ময়ূরের পেখমে আঁকা সেই চোখ বার বার আমার কাছে ফিরে এসেছে, মৃত্যুশয্যায় শুয়েও দেখেছি, ও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মওত যখন এসে আমার হাত ধরেছে, সেই মুহূর্তে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, মুনিরাকে আমি মজনুর মতোই ভালবাসতে চেয়েছি, নইলে এন্তেকালের সময় সে এসে আমাকে দেখা দিত না।
মুদ্দত হুই হ্যায় ইয়ার কো মেহমান কিয়ে হুয়ে
জোশ-এ-কাদা সে বজম্ চিরাঘন কিয়ে হুয়ে
করতা হুঁ জমা ফির জিগর-এ লখ লখত্ কো
আরসা হুয়ে হ্যায় দাওয়াত-এ-মিজগান কিয়ে হুয়ে
ফির ভাজ-এ ইহতিয়াৎ সে রুকনে লগা হ্যায় দম্
বরষে হুয়ে হ্যাঁয় ঢাক গরেবন কিয়ে হুয়ে
মাঙ্গে হ্যায় ফির কিসি কো লব -এ-বাম পর হাবাস
জুলফ-এ-শিয়ারুখ পে পড়েশন কিয়ে হুয়ে
এক নওবাহার-এ-নাজ কো তাকে হ্যায় ফির নিগাহ্
চেরা ফারোগ-এ ম্যায় সে গিলিস্থান কিয়ে হুয়ে
জী ঢুণ্ডতা হ্যায়ফির ওহি ফুরসৎ কে রাত দিন
বয়েঠে রহেঁ তসভুর-এ জানা কিয়ে হুয়ে
মুনিরাবাই চলে গেল। মলিন দিনগুলি, আরও মলিনতর হল, মান্টোভাই। বেগম ফলক আরা ছিলেন আমার জীবনের আশমানে একটা বিদ্যুৎরেখা, আর মুনিরাবাই সেই নক্ষত্র, যে-নক্ষত্রের মৃত্যুর পরেও কোটি বছর ধরে তার আলো আমাদের আঙিনাকে ছুঁয়ে যায়।
রাতের পর রাত আমি তার মৃত্যুর অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মীরসাবের শেষ বলে গেছি :
সরসরী তুম জহানসে গুজরে
বরনহ্ হর জা জহন-এ দীগর থা।
মুনিরাভাই, মেরি জান, হেলাফেলা করে তুমি জগৎ থেকে চলে গেছে, তুমি দেখলে না, এখানে। প্রত্যেক জায়গায় নতুন এক জগৎ ছিল।
১৬. চলে যাচ্ছে বসন্তের দিন
আগোশ-এ গুল কুশাহ্ বরায়ে বিদা হৈ;
অয় অলীব চল্ কেহ চলে দিন বহার-কে।।
(গোলাপের কলিগুলি পাপড়ি মেলেছে বিদায় জানাবার জন্য;
হে বুলবুল, চলো এবার, চলে যাচ্ছে বসন্তের দিন।)
আচ্ছা মির্জাসাব, কখনও ভেবে দেখেছেন, কটা গালিব একসঙ্গে আপনার ভেতরে লুকিয়ে ছিল? আপনি তাদের কতজনকে চিনতেন? হয়তো কাউকে সারা জীবনে চিনতেও পারেননি, তাই না? আপনার মতো মানুষকে নিয়ে এই সমাজ বিপদে পড়ে যায়। সে বুঝে উঠতেই পারে না, কে আসল মির্জা গালিব। এই যেমন ধরুন, মির্জা হাতিম আলি সাব মিহ্রকে লেখা আপনার চিঠিটা। মনে পড়ে, ১৮৬০-এ লেখা সেই চিঠির কথা? মির্জা মিহ্র-এর প্রেমিকা মারা গেছেন, চিঠিতে আপনাকে বিচ্ছেদের দুঃখ জানিয়েছিলেন। আপনি তার উত্তরে লিখলেন, আমার বয়স এখন পঁয়ষট্টি, দুনিয়াটাকে আমি পঞ্চাশ বছর বেশ ভালই জরিপ করেছি। কম বয়েসে একজন দরবেশ আমাকে বলেছিলেন, নিজেকে কখনও কষ্ট দিও না। খাও,পিও,মজা করো, তবে একটা কথা মনে রেখো, তুমি চিনির বাটির চারপাশে উড়তে থাকে মাছি, কখনও মৌমাছির মতো একই ফুলে আটকে থেকো না। আর কী লিখেছিলেন মনে আছে, মির্জাসাব? লিখেছিলেন মৃতের জন্য সে-ই শোক করতে পারে, যে নিজে মরবে না। আপনি কাঁদবেন কেন? বরং আজাদি উপভোগ করুন,শোক ভুলে যান। আর সম্পর্কের বন্ধনকেই যদি ভালবাসেন, তা হলে মুন্নাজানও যা, চুন্নাজানও তা-ই। মাঝে মাঝে আমি কল্পনা করি, আমাকে বেহস্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেখানে এক হুরিকেও আমার সঙ্গে দেওয়া হয়েছে, আর তার সঙ্গে অনন্তকাল আমাকে। থাকতে হবে। ভাবলেই আমি ভয়ে কেঁপে উঠি। জীবন তো তা হলে এক বোঝা হয়ে উঠবে মিঞা। বেহস্তের সেই এক ঘর, এক গাছপালা, আর আমি অনন্তকাল ধরে একজনের মুখের। দিকের তাকিয়ে বসে আছি, তাঁকে প্রেমের কথা বলে যাচ্ছি। মনটাকে অন্য কোথাও জুতে দিন মিঞা। নতুন নতুন বাহার-এ আপনার জীবনে নতুন নতুন পরি আসুক। সারা জীবন একটা কিছুতে আটকে থাকার মতো বালখিল্য আর কিছু হয় না। একজনের বেদনা নিয়ে আপনি কেন মজা করতেন মির্জাসাব? না, না, এভাবে আমার দিকে তাকাবেন না, কী ভেবেছিলেন নিজেকে, সবাই আপনার খেলার পুতুল? মির্জা মিহ্রকে লেখা আর একটা চিঠির কথাও আপনি বলতে চাইছেন তো? হ্যাঁ, সে-চিঠিও আমি পড়েছি। আপনি সেখানে স্বীকার করেছিলেন, পরোক্ষভাবে মুনিরাবাইয়ের মৃত্যুর কারণ আপনিই। আপনার সেই চিঠি থেকে একটা ছবি আমার সামনে ফুটে ওঠে, ভাঙাচোরা একটা মানুষ, আপনি, মির্জা মিত্বের হাত ধরে বলছেন :
-মিঞা আমাদের হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকাদের আল্লা মুক্তি দিন। আর আমরা যারা বিচ্ছেদ সহ্য করেছি, আমাদের যেন করুণা করেন। চল্লিশ-বেয়াল্লিশ বছর আগে মুনিরাবাই আমার জীবনে এসেছিল। তারপর আমি আর ও-পথে যাইনি, কিন্তু তার চাউনি, তার লাবণ্য আমি আজও ভুলতে পারি না। সেই শোক আমি সারা জীবনেও কাটিয়ে উঠতে পারব না। মিঞা, যৌবনের ভালবাসার আগুন যদি এখনও আপনার মধ্যে বেঁচে থাকে, সেই ভালবাসা এখন আল্লার পায়ে। রাখুন। খোদাই শেষ কথা, আর সবই মরীচিকা।
এই যে দুটো চিঠি, যা একই সময়ে আপনি লিখেছিলেন, এর মধ্যে কে আসল মির্জা গালিব? কোনটা মুখ আর কোনটা মুখোশ, মির্জাসাব? আপনাকে আমি ভালবাসি, আপনার ছন্নছাড়া জীবনের দিকে তাকিয়ে আমার দুচোখে জলের পর্দা দুলে ওঠে, কিন্তু মুখ আর মুখোশের এই দ্বন্দ্বকে আমি মানতে পারি না। আমি সত্যিই খুব সোজাসাপটা মানুষ, আপনার গোলকধাঁধায় আমি হারিয়ে যাই। আপনাকে শয়তান বলেও খারিজ করতে পারি না, অথচ এক এক সময় আপনি শয়তানেরও অধম। আপনি এই মুহূর্তে যাকে ভালবাসেন, পরের মুহূর্তেই তাকে নিয়ে মজা করতে পারেন। একেই বোধহয় বাদশাহি চাল বলে। এ কী, এ কী, আপনি শুয়ে পড়ছেন কেন আবার? আমার কথাগুলো সহ্য হচ্ছে না, তাই না? আমি জানি মির্জাসাব, নিজের বিরুদ্ধে একটা কথাও আপনি সহ্য করতে পারতেন না, আমির খসরুর পরেই আপনি, মাঝখানে আর কেউ নেই, এ কথাটা কখনও ভুলতে পারেন না, না? আমিও বিশ্বাস করি মির্জাসাব, আমির খসরুর পরে একমাত্র আপনিই লিখতে পারেন এমন শের :
