চারপাশে টিটি পড়ে গিয়েছিল, মান্টোভাই। তুমি মির্জা গালিব, ঠিক হ্যায়, কোঠায় তুমি যেতে পারো, তবায়েফের সঙ্গেও রাত কাটাতে পারো, কিন্তু একটা ডোমনির ঘরে গিয়ে তুমি থাকবে? নিজের জমিন ভুলে যাচ্ছো তুমি? মান্টোভাই কাকে বলে নিজের জমিন? একের পর এক মুশায়েরায় অপমানিত হয়ে আমি তো তার কাছে গিয়েই দাঁড়াতে পারতুম। সে কিছু বলত না, শুধু আমার গজল গাইত :
দিল-এ নাদাঁ তুঝে হুয়া কেয়া হ্যায়?
আখির ইস দর্দ কী দাওয়া কেয়া হ্যায়?
যেখানে আশ্রয়, সেখানেই তো মুক্তি। তাই আমাকে নিয়ে যতই নোংরা কথার ফোয়ারা উঠুক, আমি পাত্তা দিই নি। আম আদমি আমার দিকে ঢিল ছুঁড়বে বলে আমি লেজ গুটিয়ে পালাব? তেমন বান্দা আমি কোনওদিনই ছিলাম না। পূর্বপুরুষদের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে যাইনি ঠিকই, কিন্তু আমার জীবনটা তো একটা যুদ্ধক্ষেত্রই হয়ে উঠেছিল আর সেই লড়াইটা আমাকে একা একা লড়তে হয়েছে। গুলি মারো লোকের কথায়। বিছানায় মুনিরাকে পেলে তো আমি সব অপমান ভুলে যেতে পারতুম, মুনিরা ভুলিয়ে দিতে পারত, আর আমিও ওকে দিনে দিনে আঁকড়ে ধরেছি, ওর গলায় আমার একটার পর একটা গজল শুনতে শুনতে মনে হয়েছে, মুশায়েরায় আমাকে যতই অপমান করা হোক, একজন মানুষ তো তার কণ্ঠস্বরে আমার গজলকে বাচিয়ে রেখেছে। মুনিরাকে আমি একবার একার মতো করে পেতে চেয়েছি, ওকে বাইরে গান গাইতে যেতে দিতুম না, ওর ঘরে কাউকে আসতেও দিতুম না। ওর ভরণপোষণের দায়িত্ব আমিই নিয়েছিলুম। সঙ্গতি তো আমার তেমন ছিল না। মাসে ৬২ টাকা ৫০ পয়সা ব্রিটীশের দেওয়া পেনশন। এই টাকাতেই সংসার চালাও, তারপর মদ-জুয়া আছে, তার ওপর ওর দায়িত্ব। তবে কিনা আমার মাসি মাঝে মাঝে কিছু টাকা দিতেন, লোহারু থেকে আহমদ খান বক্স খানও টাকা পাঠাতেন অবরেসবরে, আম্মিজানও কখনও কখনও টাকা পাঠাতেন আগ্রা থেকে। কিন্তু নবাবি মেজাজ আমার, ওই টাকাতে কুলিয়ে উঠতে পারতুম না। তাই ধার করো। তখন অবশ্য মথুরা দাস, দরবারি মল, খুবচাঁদের মতো মানুষরা ছিল, ধার চাইলে কখনও না বলেনি। সব মিলিয়ে দিনগুলি মৌজ-মস্তিতেই কেটে যাচ্ছিল, আর মুনিরাকে ঘিরে জন্ম নিচ্ছিল কত যে গজল।
জান তুম পর নিসার করতা হুঁ
ম্যায় নহীঁ জানতা দুয়া কেয়া হ্যায়।
কিন্তু একদিন মুনিরার বাড়িতে কিছু লোক হামলা চালাল, ওকে মারধোর করল, জিনিসপত্র ভাঙচুর করল। কেন জানেন? আমাকে যেন ওর ঘরে ঢুকতে না দেয়। তবু আমি গেলুম, আমার রোখ চেপে গিয়েছিল। মুনিরা আমার দুহাত চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে শুধু বলেছিল, মির্জাসাব আপ চলে যাইয়ে। উও লোগ দেখেঙ্গে তো-
-কী করবে? আমাকে মারবে?
-আপনার বদনাম হোক, আমি চাই না, জি।
-তুমিও চাও না, আমি আর আসি?
সে আমার মুখ তার বুকের নিরালায় টেনে নিয়ে কাঁদতে থাকে আর বলতে থাকে, আপনাকে ছাড়া আমি বাঁচব না, আপ মেরি জান, মির্জাসাব। ফির ভি-
মান্টোভাই, ওকে ছাড়া আমিও তো বেঁচে থাকার কথা ভাবতে পারতুম না। পতঙ্গ যেমন আগুনের দিকে উড়ে যায়,আমিও সেভাবেই মুনিরার কাছে গিয়েছিলুম। ওই সৌন্দর্যকে বাদ দিয়ে তো আমার জীবন অসম্পূর্ণ। আমার মনের ভাবটা কেমন ছিল জানেন? এই বুঝি ওকে কেউ আমার কাছ থেকে চুরি করে নেবে। ওকে নিয়ে বাগানেও বেড়াতে যেতুম না আমি, মনে হত, নার্সিসাসও ওকে দেখলে নিজের রুপ ভুলে ওর কাছেই ছুটে আসবে। মুনিরাবাইয়ের যত গভীরে আমি ঢুকেছি, ততই মনে হয়েছে, ওকে সম্পূর্ণ করে পাইনি।
ইয়ে না থি হামারি কিসমত কে বিশাল-ই-ইয়ার হোতা
অগর আউর জিতে রহতে য়েহি ইন্তেজার হোতা।
এরকমই মনে হত আমার। ওর সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলন আমার কিসমতে নেই। যদি আরও বাঁচি, তা হলে ওকে পাব না, অপেক্ষাতেই কেটে যাবে সারা জীবন। মান্টোভাই, জীবনে একবারই, এমনভাবে ভালবাসতে পেরেছিলুম আমি। কবিদের মধ্যে ফিরদৌসি, পীরদের মধ্যে হাসান বাসরি আর প্রেমিকদের মধ্যে মজনু-জগতের তিন নূর। মজনুর মতো ভালবাসতে না পারলে তাঁকে আমি মহব্বত বলি না। আমি ভেবেছি, কিন্তু মজনুর মতো ভালবাসতে পারিনি, মান্টোভাই। সে বড় কঠিন পথ। নিজেকে ভুলে যাওয়ার সাধনা কজন করতে পারে? আমিও পারিনি।
প্রথমে খুবই অভিমান হয়েছিল, তাই মুনিরাবাইয়ের কাছে যাওয়া-আসা কমিয়ে দিলুম। আস্তে আস্তে একদিন অভিমান মুছে গেল। আর তার সঙ্গে সঙ্গে সেও মুছে যেতে থাকল। মোঘল রক্ত বড় নিষ্ঠুর, মান্টোভাই, আমার শরীরেও তো সেই রক্ত ছিল। এই রক্ত কী করে জানেন? যাকে ভালবাসে, তাকেই হত্যা করে। মুনিরাকে আমিই হত্যা করেছিলাম। ওকে ভুলে আমি তো আবার জীবনের নতুন পথে মেতে গিয়েছিলুম। কিন্তু মুনিরা তো নিজেকে বন্দি করে রেখেছিল আমার ভেতরে, তার সামনে তো নতুন কোনও পথ খুলে যায় নি। আওরত এরকমই, একবার যাকে ভালবাসে, সেই ভালবাসার পিঞ্জর থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না, শুকিয়ে মরে গেলেও খাঁচাতেই নিজেকে আটকে রাখে। একসময় ভাবতুম, ওদের জগৎটা বড় ছোট, কিন্তু কাউকে ভালবেসে সে মরে যেতেও পারে, সে তো আসলে এক সাধনার পথে চলেছে, নিজেকে পেরিয়ে গিয়ে অন্যের ভেতরে হারিয়ে যাওয়ার সাধনা। মান্টোভাই, পুরুষকে এই সাধনার জীবন আল্লা দেননি। আমরা পতঙ্গের মতো, আর ওরা দীপশিখা, নিজেকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে আলোর জন্ম দেয়। মীরাবাইয়ের পদে আপনি এই মহব্বতকেই দেখতে পাবেন মান্টোভাই। গিরিধারী বিনা মীরার জগৎ অন্ধকার। ক্যায়সে জিউ রে মা, হরি বিন ক্যায়সে জিজঁ রে।
