শরাবি তা বোঝে না।
-কে বোঝে!
-খোদা এসবের হিসাব রাখেন।
-কী হিসাব রাখেন?
-শরাবির প্রার্থনা কখনও কবুল হয় না।
আমার ভিতর জমা হওয়া হাসি এবার ফেটে পড়ল। বললুম, মিঞা, আমার কাছে শরাব আছে, সে সব ভুলিয়ে দিতে পারে, কীসের জন্য আর প্রার্থনা করব তা হলে?
শরাবির প্রার্থনা সত্যিই কবুল হয় না, আজ আমি বুঝি, মান্টোভাই। শরাবির মাথাটা এমন একটা জায়গায় আটকে থাকে, সে অন্য কিছু আর দেখতে পায় না, তবু আমি মদ ছাড়তে পারিনি; নেশা এমন একটা বদ্ধ জায়গা তৈরি করে দেয়, যা ছেড়ে আর বেরিয়ে আসা যায় না, সেখানেই শুধু ঘুরপাক খেতে হয়, আর ওই ঘূর্ণির মধ্যে আপনি দিনের পর দিন আরও একা হয়ে যেতে থাকেন।
সত্যি বলতে কী, শাহজাহানাবাদে তো আমি অনেক আশা নিয়ে এসেছিলুম, শায়ের হিসাবে আমার নামও ছড়াচ্ছিল, তবু মুশায়েরা পর মুশায়েরায় আমাকে অপমান করার লোকের কমতি ছিল না। জওক, মোমিনদের মতো ধরাবাঁধা বুলির গজল আমি লিখতে চাইনি। এক একটা শব্দ ছিল আমার কাছে স্ফটিকের মতো, হৃদয়ের আলো পড়লে শব্দ থেকে রামধনুর জন্ম হয়। কালে মহলের ভেতরে ঘুড়তে… আকবরাবাদের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমি শব্দদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অঞনিৰ্বর শুনতে পেতাম, মান্টোভাই। শব্দদের ভেতরে কারা কাঁদত জানেন? আকাশ-বাতাস-অন্তরীক্ষে হারিয়ে যাওয়া আত্মারা। গজল লিখতে লিখতে আমি তাদের হতাশ্বাস শুনতে পেতুম। রোজ যারা মুশায়েরা মাতায়, তারা কেন বুঝতে চাইবে আমাকে? তাদের কাজ তো একটাই, ওই শালা গালিবকে হঠাও, ওকে অপমান করো, ও যেন কিছুতেই দরবারে জায়গা না পায়। শালা, কাউকে মানে না, কাউকে বুজুর্গ মনে করে না। হ্যাঁ, করি না তো, আমি জানি, আমির খসরুর পর একমাত্র আমিই, আমিই ফারসিতে গজল মান রাখতে পারি। ফারসিতে যার গজল লেখার দম নেই, তাকে আমি কবি বলি না, মান্টোভাই। এসব কথা বলার মতো কোন মানুষ ছিল না আমার জীবনে। আমি একা একা, নিজেকে শুনিয়ে বলে যেতুম আমার কথাগুলো।
এইরকম সময়েই সে এসেছিল আমার জীবনে, ভাইজানেরা। প্রথমে আমি শুধু তার চোখ দুটো দেখেছিলুম। আর দেখামাত্রই মীরসাবের সেই শেরটা মাথার ভেতর গুনগুন করে উঠেছিলঃ
জীমেঁ কেয়া কেয়া হ্যায় অপনে অয় হম্দম।
পর সুখন তা বলব নহীঁ আতা।
(মনের মধ্যে কত কী আছে, হে দরদী বন্ধু,
কিন্তু কোন কথা ঠোঁট পর্যন্ত এসে পৌঁছয় না।)
সেদিন প্রচুর শরাব খেয়েছিলুম। কোঠা থেকে বেরিয়ে আর হাভেলিতে ফিরতে পারিনি। কোঠার বারান্দাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কে যেন একসময় আমাকে ঘুমের অন্ধকার থেকে টেনে তুলেছিল। আমি দেখেছিলাম শুধু দুটো চোখ, সুরমার রেখা আর চিকন জাল।
-মির্জাসাব।
শীতের রাতের হাওয়ার মতো এক কণ্ঠস্বর আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল। আমি শুধু চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে ছিলুম আর সেই চোখের ভেতরে কত যে পাখিরা উড়ছিল, যেন ভোর হয়ে গেছে, আমার জীবনে দেখা প্রথম ভোর, দুটো চোখের ভেতরে। যেন শিল্পী বিজাদের তুলি হাওয়ার
শরীরে চোখ দুটো এঁকে দিয়ে গেছে।
-মির্জাসাব
-কওন হো তুম?
-ঘর কিউ নেহি লওটা?
-ঘর? আমি হেসে ফেললুম।
-কাহাঁ হ্যায়?
-হাবাস খান ফটক মে।
-ওখানে তো আমার ঘর নেই।
সে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে, তারপর বলে, চলুন, আপনাকে হাভেলিতে পৌঁছে দিয়ে আসি।
-কিউঁ
-আপনি এভাবে রাস্তায় পড়ে থাকবেন না, মির্জাসাব।
-কেন মিঞা?
-আপ বেনজির শায়র হ্যায় জি।
-বেনজির?
-সচ্।
-বেনজির?
-জি মির্জাসাব।
-ফির বোলো–
-বেনজির হ্যায় আপ।
আমি তার হাত চেপে ধরলুম। কী উত্তাপ, কী উত্তাপ। আমি তার হাতে মুখ রাখলাম। তার হাতের মাংস চুষতে লাগলুম। গভীর কৃষ্ণবর্ণ সে। আর এত কালো বলেই অন্ধকারে এমন উজ্জ্বল।
-ছোড় দিজিয়ে জনাব।
কিন্তু আমি তার অন্ধকারের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিলাম। তাকে বুকে আঁকড়ে ধরতে না পারলে স্বস্তি হচ্ছিল না। সে-ও ধরা দিয়েছিল, কোনোরকম বাধা না দিয়ে। মান্টোভাই, এই প্রথম একজন মেয়ের শরীরে আমি ভেজা মাটির গন্ধ পেলুম। বৃষ্টি হওয়ার পর গাছের গোড়া থেকে যেমন গন্ধ বেরোয়, ঠিক সেইরকম গন্ধ। এ তো কোঠার তবায়েফের শরীরের আতরের খুশবু নয়, এ সেই ভেজা আদিম পৃথিবীর অন্ধকার গন্ধ। মান্টোভাই, আমি ওই গন্ধেই মাতোয়ারা হয়ে গিয়েছিলুম। সে কোনও কোঠার মশহুর বায়েফ ছিল না। সামান্য এক ডোেমনি। ডোমনি কাকে বলে জানেন তো? ডোমনিরা লোকের বাড়িতে শাদিতে-উৎসবে নাচা-গানা করে টাকা রোজগার করে, তা বাদে, পুরুষদের সাথে বিছানাতেও যায়; তবে কোন রইস মির্জা ডোমনিকে ছুঁয়েও দেখবে না। ডোমনিদের ভাবসাব, কথাবার্তাও ছিল একেবারে নর্দমার মতো। কিন্তু মুনিরা-মুনিরাবাই সবার চেয়ে আলাদা ছিল।
সেইদিনের পর থেকে মুনিরাবাইয়ের ঘরেই আমার আশ্রয় মিলল। সে আমারই গজল শুধু গাইত। গাইতে গাইতে কৃষ্ণবর্ণ মুনিরাবাইয়ের মুখে লাল মেঘের আলো ছড়িয়ে পড়ত। -মুনিরা -জি। -আমার গজল তুমি কোথায় শুনলে? মুনিরাবাই হেসে বলত, জি আশমানসে আয়া।
-আশমানসে?
-জি।
-কোথায় সেই আকাশ, তারা?
-জি, ইধর। মুনিরা হাসত, নিজের বুকে হাত রেখে বলত, সিনা মে হ্যায় জনাব।
বুকের ভেতর আকাশ আর সেই আকাশ থেকে ভেসে আসছে আমার গজল, এভাবে কখনও তো কেউ বলেনি আমাকে। শুধু মুনিরাবাই বলতে পারত। আমার গজলের সঙ্গে তার দেনাপাওনার সম্পর্ক ছিল না। আমিও তাঁকে বুকের ভেতর টেনে নিয়েছি। সে আমার শরীরের আড়ালে নগ্ন হয়েছে। সজল, কালো একখণ্ড মেঘকে যেন আমি জড়িয়ে আছি। মান্টোভাই। বেগম ফলক আরা ছিলেন আমার জীবনের একটা রৌদ্রালোকিত দিন, আর মুনিরা যেন ঘনঘোর বর্ষা, একটানা বৃষ্টি পড়েই চলেছে, কত যে নতুন পাতা গজাচ্ছে আমার শরীরে; বিশ্বাস করুন, মুনিরার সামনে বসে থাকতে থাকতে একসময় শুধু তার চোখ দুটোই দেখতে পেতুম আমি, হরিণের মত দুরন্ত, আবার মাঝে মাঝেই কেমন স্থির হয়ে যেত। সেই স্থির দৃষ্টিতে আমি দেখতে পেতুম ভয়, হরিণ যেমন দৌড়তে দৌড়তে ভয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে।
