কিন্তু দিল্লিতে আসার পর প্রথম দশ-বারো বছর এসব কিছুই ভাবিনি, একটু আগে আপনি বলেছিলেন না যে দিবানখানায় বসে আমি কাঁদতুম, ওটা একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন। না, মান্টোভাই, আমি তখনও কাঁদতে শিখিনি। হতাশ হয়েছি বিরক্ত হতুম, একাও লাগত খুব মাঝে মাঝে, কিন্তু তখনও আমার চোখে মেঘ দেখা দেয়নি। মাটি ভিজবে, বাস্প তৈরী হবে, আকাশে উঠবে, তারপর তো মেঘের দেখা; সেজন্য তো সময় লাগে। আর তখন তো আমি তরতাজা যুবক। আমার দিকে সবাই চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকত। কেন জানেন? আমার গায়ের রং ছিল জুইফুলের মতো সাদা। এই যে ঝুঁকে পড়া, চামড়া কুঁকড়ে যাওয়া গালিবকে দেখছেন, একে দেখে সেই গালিবের আন্দাজ পাবেন না আপনারা। লম্বা, পেটানো চেহারা, মাথাভর্তি কোঁকড়া কালো চুল, নিজেই চুলে আঙুল চালিয়ে মখমলের স্পর্শ টের পেতুম। পর্দার আড়াল থেকে কত যে বেগম আমার দিকে তাকিয়ে থাকত, তা আমি বুঝতে পারতুম, মান্টোভাই। আর তাকাবেই না কেন? দিল্লিতে কটা লোক ছিল আমার মতো? সবাই তো একইরকম। পোশাক পরত, তাদের বড় বড় চুল আর মুখ ভরা দাড়ি। সব ভেড়ার পাল, বুঝলেন তো! তাই মির্জা গালিব যখন রাস্তা দিয়ে পালকি চেপে যেত, তার দিকে লোকজন তাকিয়ে থাকবে না, তা কি হতে পারে? পাজামার ওপর মিহি কাপড়ের কুর্তা, আর সেই কুর্তার বুকের ওপর জামদানি কাজ, কত ফুলের বাহার, কত নকশা, মাথায় লম্বা কলাহ্ পপাখ টুপি। আমি অন্যদের চেয়ে আলাদা, সব কিছুতেই তা ফুটিয়ে তুলতুম। এসব শিখেছিলুম মির্জানামা থেকে। সে এক কিতাব ছিল ভাইজানেরা, ঠিকঠাক মির্জা হওয়ার আদব-কায়দা সেখানে লেখা ছিল। মির্জা কি যে কেউ হতে পারে? তার তরিকা আছে না? পোশাকে-ব্যবহারেই বোঝা যাবে, কে মির্জা, আর কে নয়। নিজের সমান মানুষ ছাড়া মির্জা কখনও যার-তার সঙ্গে কথাই বলবে না। আম। আদমির চেয়ে সে আলাদা, তা বোঝানোর জন্য মির্জা হেঁটে কোথাও যাবে না, সবসময় যেতে হবে পালকিতে চড়ে। বাজারে গিয়ে কিছু পছন্দ হলে, দাম যা-ই হোক মির্জা কিনে নেবে; অন্যদের মতো দরাদরি করবে না। আর কী করতে হবে? হাভেলিতে রইস আদমিদের ডেকে মেহফিল বসাতে হবে। একটা কথা শুনে রাখুন। সবাই যে তামাক খাবে, তা হতে হবে সুগন্ধি আর হাশিস মেশানো। শরাবে মেশাতে হবে মুক্তাচূর্ণ। মির্জা হতে হলে আপনাকে সাদির গুলিস্থান আর বুস্থান স্মৃতি থেকে বলে জানতে হবে। তার চেয়েও বড় কথা, আপনি যখন। কথা বলবেন, তাতে যেন ব্যাকরণের ভুল না থাকে। মাঝে মাঝে গজলের বয়েৎ বলতে হবে। ফুলের মধ্যে তার প্রিয় হবে নার্সিসাস। আর ফলের মধ্যে নারঙ্গ। তার কাছে আগ্রার কেল্লাই দুনিয়ার সবচেয়ে সেরা; আর পারস্যের সবচেয়ে ভাল শহর ইস্পাহান। মাথায় যারা বড় পাগড়ি বাঁধে, মির্জা তাদের সবসময় ঘৃণা করবে।
বুড়ো হবার পর সেই মির্জা গালিবের দিকে তাকিয়ে আমার হাসি পেত খুব। আসলে কী। জানেন, মানুষ যখন কোনও স্বপ্নে বুদ হয়ে থাকে, তখন সে এভাবেই সবার থেকে নিজেকে অন্যরকম মনে করে, তারপর স্বপনভঙ্গের সময় শুরু হলে সে আস্তে আস্তে মাটিতে পা রাখতে শেখে, বুঝতে পারে, অন্যরকম হতে চাওয়াটা আসলে যৌবনের ঔদ্ধত্য; সত্যি তো এই যে, প্রত্যেকটা মানুষই আলাদা আলাদা, কেউ কারোর সঙ্গে মেলে না, সবাই অন্যরকম। এই সত্য বোঝবার জন্য, জীবনের পথে অনেক কারবালা পেরিয়ে আসতে হয়, মান্টোভাই।
না, না, বিরক্ত হবেন না ভাইজানেরা, উঁইফুলের মত সাদা যে-গালিবের কিস্সা আপনারা শুনতে চাইছেন, তা আমি আপনাদের শোনাব। কিন্তু মনে রাখবেন, জীবনের বাইরে দাঁড়িয়ে যখন নিজের জীবনটাকে দেখা হয়, তখন সেই গল্পটা তো সোজা পথে চলে না, নানা কথার ডালপালা এসে তাকে ঘিরে ধরে; একটা শেষ হওয়া জীবনকে আমি ফিরে দেখছি, সেই জীবনের সামনে। নতুন আর কোনও পথ খুলে যাবে না, তাই আমার অনেক কথা মনে হবে, যদি এমনটা না হয়ে অমন হত, তা হলে কেমন হত, আমি কোনও কথাকেই এখন আর ফেলে দিতে পারব না।
মান্টোভাই, আপনি ঠিকই বলেছেন, মারুফসাবের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে আমি ডানা মেলার সুযোগ পেলুম। ওখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। একটা লোক গজল লিখতে চায়, আবার জ্ঞানও দিতে চায়, এসব মানুষকে বেশীক্ষণ সহ্য করা যায় না। এদের জীবনটা ফিতের মতো, আর সেই ফিতের মাপে অন্যের জীবনকেও হেঁটেকেটে নিতে চায় তারা। কিন্তু আমি। একটা এতিম, ওয়ালিদকে কখনও দেখিনি, আমার কাছে তো জীবনের কোনও মাপজোক ছিল না। সব্বান খানের হাভেলি ভাড়া নিয়ে আমি নিজের মত করে বাঁচার স্বাদ পেলুম। মদ। খাওয়া, জুয়া খেলা, কোঠায় যাওয়া থেকে এখানে কে বাধা দেবে আমায়? এক একদিন রাতে বেগমের সঙ্গে শুয়েছি, যন্ত্রের মত যা করার করে গেছি, তার বেশী বেগমও কিছু চাইত না, তার কাছে দুটো শরীরের মিলনের অর্থ, বাচ্চা পয়দা হোক। তো পয়দা হয়েছে তারপর এক-দেড় বছরের মধ্যে তারা মরেও গেছে। কী করে বাচবে বলুন? এসব তো ভালবাসার পয়দা নয়। তবে এও ঠিক, আমিও তো ওদের বাঁচা-মরার দিকে নজর দিইনি। ওরা কেউ কেউ বেঁচে থাকলে বেগমের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা হয়তো এমন ঠাণ্ডা হয়ে যেত না। আর আমি তো তখন অন্যরকম হওয়ার নেশায় বুদ হয়ে আছি। এ এমন এক নেশা মান্টোভাই, যখন আপনি মানুষকে মানুষ বলেই মনে করবেন না, হাসিঠাট্টায় সব কথা বরবাদ করে দিতে চাইবেন। আমার সে ক্ষমতাও ছিল। তা হলে একটা গপ্পো বলি শুনুন। এক মোল্লা একদিন আমার সামনে শরাব খাওয়া নিয়ে যাচ্ছেতাই সব কথা বলে যাচ্ছিল। মদ হারাম, তাই তোমাকে দোজখে যেতেই হবে। অনেকক্ষণ শোনার পর আমি আর চুপ করে থাকতে পারলুম না, বললুম, শরাবে এত কী খারাপ আছে মিঞা?
