দিল্লিতে শায়র হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য কম অপমান তো মির্জাসাবকেও হজম করতে হয়নি। একের পর এক মুশায়েরায় তাঁর গজলকে, তাঁকে অপমান করা হয়েছে। কেন? তাঁর লেখার সমদ্দার তখনও জন্মায়নি; বেঁটেখাটো কবিরা তখন কী করে? প্রতিভার গায়ে কাদা ছিটোয়, ঠাট্টা-মশকরা করে, তাঁর কবিতার গায়ে দুর্বোধ্যতার লেবেল সেঁটে দেয়। একটা। মুশায়েরার কিস্যা বলি আপনাদের। দিল্লির বিখ্যাত কবিরা, রইস আদমিরা এসেছেন। একের পর এক কবিরা তাঁদের গজল পড়ছেন।কেয়া বাত, কেয়া বাত আওয়াজ উঠছে, হাততালি পড়ছে, মির্জাসাব বুঝতে পারছেন, সব লেখা অন্তঃসারহীন, শুধু অলঙ্কারে ঠাসা, অনেক গয়না-পরা মেয়ের সৌন্দর্য যেমন হারিয়ে যায়। মির্জাসাবের যখন গজল পড়ার পালা এল, হাকিম আগা জান আইশ উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, এত বড় শায়ের গজল পড়ার আগে আমি কিছু বলতে চাই। আমাকে আপনার অনুমতি দিন। মুশায়েরায় হুল্লোড় উঠল, ববালিয়ে জি, বোলিয়ে জি
-আপ লোগ আরজ কিয়া হ্যায়?
-এরশাদ, এরশাদ।
হাকিম আগা জান পড়তে শুরু করলেন,
সে কাব্য অর্থহীন, যা বোঝেন শুধু কবি
আনন্দ তো হবেই যদি অন্যে পায় সে ছবি। মী
রকে বুঝি, মির্জাকেও, কিন্তু গালিব যা লেখেন
ঈশ্বর তাঁকে রক্ষা করুন, তিনিই জানেন কে বোঝেন!
হাসির হুল্লোড় উঠল মুশায়েরায়। এরপরে একজন কবি কি তাঁর কবিতা পড়তে পারেন, ভাইজানেরা?
আর একবার কী হয়েছিল, বলি। রামপুরের মৌলবি আব্দুল কাদির এসে বললেন। মির্জাসাব, আপনার একটা উর্দু শের কিছুতেই বুঝতে পারছি না। যদি বুঝিয়ে বলেন।
-কোন শেরটা জানাব?
-ওই যে আপনি লিখেছেন:
গোলাপের গন্ধ তুমি
নিয়ে নাও মহিষের ডিম থেকে
আরও কিছু খুশবু আছে তাতে,
নিয়ে নাও মহিষের ডিম থেকে।
-কাদিরসাব এ তো আমার লেখা শের নয়।
-কিন্তু আপনার দিবান-এই তো পড়ছি। আপনি একবার খুলে দেখবেন নাকি?
মির্জাসাব বুঝতে পারলেন, এ আসলে তার লেখা নিয়ে হাসিঠাট্টা করার নখরা। কিন্তু বন্ধু ফজল-ই-হকের সমালোচনা তো তিনি মেনে নিয়েছিলেন। একজন শিল্পীকে আক্রমণ করে তো আমরা তাঁকে বদলাতে পারি না। বন্ধুর মতো পাশে এসে যদি বলি, বিষয়টা নিয়ে কথা বলার ক্ষমতা যদি আপনার থাকে, তবে শিল্পী তা মেনে নেন। ফজল-ই-হকের সমালোচনা থেকে। নিজের কাব্যভাষাকে বদলে নিচ্ছিলেন মির্জাসাব। কেননা বন্ধুর সমালোচনা তো মশকরা নয়, তা আসলে পিঠে হাত রাখা। আর ফজল-ই-হকও বুঝতেন কাব্যভাষার অন্ধিসন্ধির কথা। কিন্তু এমন কেউ, যে তা বোঝে না, তার কি মির্জাসাবের লেখার সমালোচনা করার অধিকার আছে? পদার্থবিদ্যা-রসায়নবিদ্যা নিয়ে কথা বলার জন্য তো আপনাকে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। কবিতার বেলায় আপনি যা খুশি বলে পার পেয়ে যাবেন, তা তো হতে পারে না। কাব্যভাষা কীভাবে জন্মায়, তার ইতিহাস তার বিবর্তন না জেনেই কথা বলার অধিকার জন্মায় আপনার? যেহেতু কবিরা হাতে শুধু একটা কলম থাকে, আর বৈজ্ঞানিককে ঘিরে আছে যন্ত্রের পর যন্ত্র, সেজন্য কি কবির সম্বন্ধে এত সহজে কথা বলা যায়? এত অপমান সহ্য করার পর মির্জাসাব তাই একটা শের -এ লিখেছিলেন :
থী খবর গর্ম কে গালিব মে উড়েঙ্গে মুর্জে
দেখনে হম্ ভি গয়ে পেহ্ তামাশা না হুয়া।
(ছিল জোর খবর যে গালিবকে ছিন্নভিন্ন করা হবে
দেখতে আমিও গিয়েছিলাম কিন্তু তামাশাই হল না।)
অনেক আশা নিয়ে দিল্লিতে এসেছিলেন মির্জাসাব। কিছুদিন পরেই বুঝতে পেরেছিলেন, আশা করে কোনও ফল ফলবে না। দিল্লি দরবারেও তাঁর জায়গা হয়নি। দিবানখানায় বসে তিনি একা নেশাগ্রস্থ, কাঁদতে কাঁদতে বিড়বিড় করেন,
নহীঁ গর সর ও ব-এ অদ্ৰাক-এ মানে,
তমাশা-এ নৈরঈ-এ সুরৎ সলামাৎ।।
(অর্থ বুঝবার যোগ্যতা যদি নাও হয় কোনদিন
তবু রুপের বর্ণবৈচিত্র দেখার শক্তিটুকু বেঁচে থাক।)
১৫. চোখ বুজে শুয়েছিলুম
মুহব্বৎনে জুলুমৎসে কাঢ়া হ্যায় নূর
মুহব্বৎ নহ্ হোতী নহ্ হোতা জুহুর।
(প্রেমই তমসার মধ্যে রচনা করেছে জ্যোতি,
প্রেম না থাকলে প্রকাশ সম্ভব হত না।)
মান্টোভাই, আপনি ঠিকই ধরেছিলেন, আমি ঘুমাইনি, চোখ বুজে শুয়েছিলুম, আসলে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। ১৮৫৭-র পর থেকে আমার আর জেগে থাকতে ইচ্ছে করত না, সত্যি বলতে কী, খোদার কাছে তখন আমার শুধু একটাই প্রার্থনা ছিল, আর-রশিদ, আমাকে এবার। কবরের পথটা দেখিয়ে দিন। আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু বান্ধব হারিয়ে আমাকে তবু আরও বারোটা বছর বেঁচে থাকতে হল। তা তো হবেই। আমার জীবনে কীই বা আর ঠিকমতো হয়েছে! তাই আস্তে আস্তে নিজেকে আমি বাইরে থেকে দেখতে শিখেছি, নিজের দুর্দশা দেখেই আনন্দ পেয়েছি। হয়তো হাসবেন, তবু বলি, আমি একসময় নিজেকে শত্রুর চোখ দিয়ে দেখতে শুরু করেছিলুম। কিসমতের এক-একটা চাবুকের ঘা আমার গায়ে এসে পড়েছে, আর আমি চিৎকার করে নিজেকেই বলেছি, দ্যাখ, দ্যাখ, কুত্তা গালিবটা আবার মার খেয়েছে। কত গর্ব ছিল না তোমার। গালিব? তোমার মতো শায়র আর নেই, ফারসিতে তোমার সমকক্ষ কে আছে? এখন দ্যাখো, তোমার নামের পাশে কী লেখা আছে! কী? তুমি শালা দোজখের বাসিন্দা। নিজেকে গালাগালি করতে করতে কেঁদে ফেলতুম। তারপর একসময় চোখ থেকে আর জলও বেরোত না, চোখের ভেতরটা মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করত। আমি তার কাছে প্রার্থনা জানাতুম, আল্লা, আর পানি নয়, এবার আমার দুচোখ থেকে রক্ত ঝরে পড়ুক, আমি দুহাতে রক্ত মেখে, সারা মুখে রক্ত লেপে এতিমের মতো মরে যেতে চাই। কিন্তু আল্লা আমাকে পৃথিবীতেই দোজখ দেখিয়ে কবরে পাঠাবেন। কেন জানেন? আমার একটাই গুনাহ্। এই নশ্বর জীবনটাকে তো খোদা একেবারে মুছে দিতে চান, আমি সেই জীবনের কয়েকটা মুহূর্তকে অনন্তের স্বাদ দিতে চেয়েছিলুম-আমার গজলে। খোদা তার জন্য শাস্তি দেবেন না? দেবেনই তো। কে হে তুমি মির্জা গালিব, খোদার দুনিয়ার পাশে শধু শব্দ দিয়ে আরেকটা দুনিয়া তৈরি করতে চাও? বেওকুফ! তুমি কবিতা লেখো, কিস্সা বানাও, তসবির আঁকো, সুর বাঁধো-তুমি বেওকুফ ছাড়া কী! কিন্তু আপনি কী করবেন, মান্টোভাই? শব্দকে যে আমি ভালবাসি, শব্দ ছেনে ছেনে রং বার করি, শব্দের গভীরে ঢুকে সুর শুনতে পাই, অন্ধকারকেও দেখতে পাই-এসব যে আমি পারি, তা তো আল্লারই দান। তবু তিনি আমাকে শাস্তি দেবেন? আমি অনেক পরে এই শাস্তির অর্থ বুঝেছিলুম। যাকে দেখা। যায় না, তাকে তুমি দেখেছ; যা শোনা যায় না, তা তুমি শুনেছ; যাকে অনুভব করা যায় না, তাকে তুমি অনুভব করেছ; এজন্য তো তোমাকে শাস্তি পেতেই হবে। অনন্তের স্বাদ পাওয়ার জন্যই নরক-জীবন দেখতে হবে তোমাকে। আল হাল্লাজকে যেমন শাস্তি পেতে হয়েছিল। একটা নতুন দুনিয়া গড়তে চাও তুমি, আর তার ভার বহন করবে না, তা কখনও হয়?
