-কী মনে হয় তোমার শাফিয়া? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
-আমি লেখার কী বুঝি বলুন? শাফিয়া হাসে, ইসমত থাকলে বুঝতে পারত।
-ইসমত তো নেই। তুমিই বল।
-গুনাহ মাফ করবেন মান্টোসাব।
-বলো।
-মির্জাসাবের ওপর আপনি নিজেকে চাপিয়ে দিচ্ছেন।
-তাই মনে হয় তোমার?
-জি।
বেগমকে আমি আরও কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে শুধু বারবার বলেছে, আমি লেখার কী বুঝি বলুন? ইসমত থাকলে-। ইসমত, ইসমত,ইসমত। বারবার একই নাম। আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু, সবচেয়ে বড় শত্রু। আমি মরতে বসেছি জানে তবু চিঠি লিখলেও উত্তর দেয় না। পাকিস্থানে আসার জন্য ও আমাকে ঘেন্না করতে শুরু করেছিল, আমি বুঝি। কিন্তু ইসমত তো ইসমতই।লিহাফ -এর মতো গল্প আর কে লিখতে পারবে? আকেবারে হইহই পড়ে গেছিল। মোল্লা থেকে শুরু করে প্রগতিশীল সবাই ইসমতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সমকাম নিয়ে গল্প? তাও আবার মেয়েদের মধ্যে। ইসমত সত্যিই একটা কাণ্ড করেছিল।
শেষ পর্যন্ত আমি মির্জাসাবকে ডেকে এনে সামনে বসালাম।
-কেয়া মিঞা? আপ কেয়া মাঙতে হ্যায়? মির্জাসাব হাসতে শুরু করলেন।
-আপনাকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখছি। একটু শুনবেন? যদি বলেন, কিছু হচ্ছে না, আমি সালাম জানিয়ে সরে যাব।
-পড়ো শুনি। নিজের কিস্সা কে আর না শুনতে চায়?
পড়া শেষ হবার পর মির্জাসাব ঘরের ভেতর পায়চারি করতে লাগলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী মনে হল আপনার?
মির্জাসাব পায়চারি করতে করতেই একটা শের বলতে লাগলেন,
গরদিশ-এ সাগব্-এ জল্বহ্-এ রঙ্গীন তুঝ সে।
আইনহদরী-এ এক দীদহ -এ হৈরাঁ মুঝ সে।।
(সুরাপাত্রের গায়ে নানা বর্ণের চিত্র ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাও তুমি;
বিস্ময়ে উদ্ৰান্ত চোখের আয়নায় আমি তা ধরে রাখি।)
তারপর বললেন, লেখো, মান্টোভাই। জীবনে কেউ কাউকে ছুঁতে পারে না, লেখায় তুমি আমাকে ছোঁবে সে আশা বৃথা। তবু লেখো। লেখাই তো দীন্-এর পথ।
আমার জন্যও তবে দীনের পথ আছে? এত পাপের পরেও?
মান্টোসাবের লেখা এই অংশটা পড়ে আমার বেশ মজাই লাগে। তবসুমকে জানাই, মির্জা গালিবকে নিয়ে উপন্যাস লেখা হল না আমার, তবে মান্টোসাবকে নিয়ে একটা উপন্যাস লেখার ইচ্ছে হচ্ছে। -কেন জনাব? তবসুম হেসে জিজ্ঞেস করে।
-এত বড় শয়তান আমি দেখিনি। শয়তানকে এক্সপ্লোর করার আনন্দই আলাদা।
-আপনি নিজেকে কী ভাবেন?
-কী?
-বলুন না।
-জানলে কোনও সমস্যা ছিল না। মান্টোসাব যেমন কথায় কথায় বলতেন, ফ্রড, ফ্রড, আমিও একটা ফ্রড। লেখা আমার ফ্রড-এর বিজনেস বলতে পারেন।]
মির্জাসাবের কথাতেই ফিরে আসা যাক। শ্বশুর মারুফসাবের বাড়িতে বেশীদিন থাকলেন না মির্জাসাব। একে তো শ্বশুরকে সহ্য করতে পারতেন না, তার ওপর দিল্লিতে এসে নিজেকে কেউকেটা ভাবতে শুরু করেছেন। হ্যাঁ, এই স্বভাবটা ওনার পুরো মাত্রায় ছিল, ওই যে বলেছি, কখনও ভুলতে পারতেন না, তিনি তুর্কি সৈনিকদের বংশধর। আমিরি মেজাজ দেখানোটা ওনার রক্তের মধ্যেই ছিল। তাই শ্বশুরবাড়িতে থাকা সহ্য হল না। চাঁদনি চকের কাছে হাবাশ খান কা ফটক। তার পাসে সব্বান খানের হাভেলি ভাড়া নিলেন। এবার নিজের মর্জিমতো স্বাধীন জীবনযাপন। উমরাও বেগম পড়ে রইলেন জেনানামহলে, তাঁর কোরান-হাদিস-তসবি নিয়ে।
একটা কথা বলতেই হবে ভাইজানেরা, বেগমের দিকে কোনওদিন ফিরে তাকাননি মির্জাসাব। গজল-সুরা-মুশায়েরা-তবায়েফ-রঙ্গরসিকতা নিয়েই সবসময় মশগুল থাকতেন। এমনকী হয়নি যে উমরাও বেগম শৌহরের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন, তাঁর কাছাকাছি আসতে চেয়েছেন? নিশ্চয়ই চেয়েছিলেন। কিন্তু মির্জাসাবের অবহেলা, নিষ্ঠুরতার সীমা-পরিসীমা ছিল না। বেগমের সঙ্গে তিনি শুয়েছেন, সাত-সাতটা সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, যারা কেউ এক-দেড় বছরের বেশী বাঁচেনি, কিন্তু নিজের রইসি জীবনে তিনি পুঁদ হয়ে থেকেছেন। আমি বুঝতে পারি, উমরাও বেগম কেন দিনে দিনে কোরানের ভেতরেই নিজের জীবনকে আটকে ফেলেছিলেন। কেন শেষ পর্যন্ত নিজের খাওয়ার বর্তন পর্যন্ত আলাদা করে নিয়েছিলেন। এক একটা সন্তানের জন্ম ও মৃত্যু তাঁকে ঠেলে দিচ্ছিল নিজের ভেতরের অন্ধকার থেকে আরও গভীর অন্ধকারে। মির্জাসাব বেগমের দিকে তাকাতে চাননি। বরং বেগমকে নিয়ে মজা করেছেন। কেমন জানেন? একবার বাড়ি বদল করার জন্য মির্জাসাব উঠে পড়ে লাগলেন, নিজে নতুন বাড়ি দেখেও এলেন। উমরাও বেগম জিজ্ঞেস করলেন, হাভেলি কেমন লাগল মির্জাসাব?
-দিবানখানা তো বেশ ভালোই। জেনানামহল আমি দেখিনি।
-কেন?
-আমি দেখে কী করব? সে তো তোমার মসজিদ, তুমিই একবার দেখে এসো।
মির্জাসাব হাসতে হাসতে বললেন।
-মসজিদ?
-তা ছাড়া কী? জেনানামহলকে তো তুমি মসজিদ বানিয়েই ছেড়েছ। যাও, আর কথা বাড়িও না, একবার দেখে এসো।
স্বামীর কথা মেনে নিয়ে উমরাও বেগম বাড়ি দেখে এলেন। মির্জাসাব জিজ্ঞেস করলেন, কেমন দেখলে? পছন্দ হয়েছে তোমার?
-জি। ফির-
-ফির কেয়া?
-সবাই বলে, ওই হাভেলিতে জিন আছে।
-জিন? কারা বলে?
-হাভেলির আশেপাশে যারা থাকে।
-তাঁরা তো তোমাকে দেখেছেন?
-জি।
মির্জাসাব হা-হা হাসিতে ফেটে পড়লেন।-আরে বেগম, দুনিয়াতে তোমার চেয়ে জবরদস্ত জিন আছে নাকি?
এ-কথা নিজের স্বামীর মুখে শোনার পর কোনও মেয়ের আর কিছু বলার থাকে? উমরাও বেগম কান্না চাপতে চাপতে জেনানামহলে ফিরে গেলেন। ভাইজানরা, এই মির্জাসাবকে আমি ক্ষমা করতে পারি না। শাফিয়া বেগমকে আমি স্বামী হিসাবে যা-যা দেবার দিতে পারিনি, নিজের খেয়াল খুশি মত চলেছি, কিন্তু ওভাবে কখনও তাকে অপমান করিনি। মির্জাসাব খুব সহজে যে কাউকে অপমান করতে পারতেন, অন্তত তাঁর যৌবনের দিনগুলোতে। অপমান করলে। তোমাকেও তো অপমান পেতে হবে। কিন্তু অপমান তিনি হজম করতে পারতেন না। আমি। এত সব কথা বলছি বলে মির্জাসাবকে আপনারা কিচরে নামিয়ে আনবেন না। সাদা-কালো ছবি হয়, জীবনটা তো সেরকম নয়, সেখানে নানারকম ছায়া থাকে। আর মির্জাসাবের জীবন ছিল। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের চেয়ে অনেক বড়, ইংরেজিতে বলে না, লার্জার দ্যান লাইফ? আপনার তাঁর জীবন নিয়ে সমালোচনা করতে পারেন, প্রশ্ন তুলতে পারেন, কিন্তু হাঙরের ঢেউয়ে লুটোপুটি খাওয়া অস্তিত্বটাকে অস্বীকার করতে পারেন না।
