-কেন?
-আপনি চৌসর খেলছেন, তা হলে আর হাদিসের কথা মানি কী করে বলুন?
-হাদিসে কত বড় সত্য লেখা আছে, আপনি দেখতে পাচ্ছেন না? মির্জাসাব মিটিমিটি হাসেন।
-মানে?
-হাদিসের কথাই তো ঠিক। এই যে কুঠুরিটা, এখানেই তো শয়তান বন্দি হয়ে আছে, আপনি দেখতে পাচ্ছেন না? কী, মিঞা কী বলেন? খেলার সঙ্গীকে শেষ একটা প্রশ্নটা করে হা হা করে হেসে উঠলেন মির্জাসাব।
-আপনি নিজেকে শয়তান বলছেন?
-তা ছাড়া কী? আমার মতো একটা শয়তান না থাকলে আপনি মুফতি হতেন কী করে?
-মানে?
-সহজ কথাটা বোঝেন না? শয়তান আছে বলেই না শরিয়াতের এত নিয়মকানুনের দরকার হয়ে। আজুদাসাব আমি তো কতবার বলেছি, আমি অর্ধেক মুসলমান। মদ খাই, কিন্তু শুয়োর খাই না।
মির্জাসাব যেমন বলেছেন, আমিও কতকটা সেইরকম বলতে পারেন। আমি কতখানি মুসলমান, তা নিয়ে এক বন্ধু একবার প্রশ্ন করেছিল। আমি বলেছিলাম, ইসলামিয়া কলেজ আর ডিএভি কলেজের মধ্যে ম্যাচে ইসলামিয়া গোল দিলে আমি লাফিয়ে উঠব। আমি এতদূর পর্যন্ত মুসলমান। তার বেশী নয়।
আর একটা কিস্স বলি, শুনুন ভাইজানেরা। এ তাঁর বুড়ো বয়েসের কথা। তখন দিল্লিতে মহামারী লেগেছে, মানে কলেরা আর কী। মীর মেহদি হুসেন মজরুহ একদিন চিঠি লিখলেন, হজরত, শহর থেকে মহামারী পালিয়েছে নাকি এখনও মজুদ?? মির্জাসাব উত্তরে লিখেছিলেন, এ কেমন মহামারী, আমি তো বুঝতে পারি না। যে মহামারী দুটো সত্তর বছরের বুড়ো-বুড়িকে মারতে পারে না, তার আসার কী দরকার ছিল বলুন তো?
এই মির্জাসাবকে বোঝা আমার আপনার কম্মো নয়। কিন্তু একটা মানুষ আর একটা মানুষকে পুরোপুরি বুঝতে চায়। গলদটা সেখানেই। যেখানে একজন মানুষ নিজেকেই নিজে চিনে উঠতে পারে না-হিমশৈলের চূড়াটুকুই সে মাত্র দেখতে পায়-সেখানে অন্য মানুষের তাঁকে পুরোপুরি বুঝতে চাওয়াটা হাস্যকর নয়, বলুন? আমাদের কথা বাদ দিন, ফরিদউদ্দিন আতরের মতো সুফি সাধকও বুঝতে পারেননি ওমর খৈয়ামকে। কেন জানেন? খৈয়ামসাব বিশ্বাস করতেন, মৃত্যুর পরে আর পুনরুত্থান নেই। দার্শনিক ইবন সিনার মতো খৈয়ামসাবের মনে হয়েছিল, আল্লা হয়তো সুরভিকে বুঝতে পারেন, কিন্তু প্রতিটি ফুলের আলাদা আলাদা সৌরভ তাঁর কাছে পৌঁছায় না। ইবন সিনা বলতেন, এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা কেউ নেই, আল্লার মতোই অনাদি অনন্তকাল ধরে সে আছে। আর খৈয়ামসাব একটা রুবাইতে লিখেছিলেন, এই বিশ্বে যখন আমার থাকার মতো জায়গা নেই, তখন মদ আর আশিককে ছেড়ে থাকা ভুল; এ-পৃথিবী তৈরী হয়েছে, না অনন্তকাল ধরে আছে, এই ভাবনা আর কতদিন? আমার চলে যাওয়ার পর তো এ সব প্রশ্নেরই কোনও মানে নেই। আতরসাব তাই কেয়ামতের দিনে খৈয়ামসাবকে যেভাবে কল্পনা করেছেন, সেখানে আল্লার দরবারে তার মতো শয়তানের কোনও জায়গা নেই। কেন নেই? খৈয়ামসাবের এক রেন্ডি একজন শেখকে প্রশ্ন করেছিল। কী সাহস ভাবুন। শেখ ওই রেন্ডিকে বলেছিল, তুমি মাতাল, সব সময় ছলাকলায় মেতে আছো। সেই রেন্ডি উত্তরে বলেছিল, আপনি যা বললেন, আমি তা-ই, কিন্তু আপনি নিজেকে যা মনে করেন, আপনি কী তাই?
তাঁর মৃত্যুর পরের কথা খৈয়ামসাবই বলে গিয়েছিলেন। নিজামিসাব শিষ্য হয়েছিলেন খৈয়ামসাবের। খৈয়ামসাবকে শেষ তিনি দেখেন বলখের ক্রীতদাস বাজারের রাস্তায় এক দোস্তের বাড়িতে। অনেকে সেখানে হাজির ছিল খৈয়ামসাবের কথা শোনার জন্য। খৈয়ামসাব নাকি বলেছিলেন, আমার কবর এমন জায়গায় হবে, যেখানে বছরে দুবার গাছ থেকে ফুল ঝরবে। নিজামিসাব কথাটা বিশ্বাস করতে পারেন নি। খৈয়ামসাবের মৃত্যুর চার বছর পর নিশাপুরে গিয়ে নিজামিসাব তাঁর গুরুর কবর দেখতে গেলেন। ফুলে-ফুলে ঢাকা সেই কবর দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন নিজামিসাব।
মাফ করবেন ভাইজানরা, কথায়-কথায় অনেক দূর চলে এসেছি। আসলে কী জানেন, মির্জাসাবের যে কিস্সাটা আপনাদের বলছি, তা তো শুধুই ওনার কিস্সা নয়। খোদা তো ধুলো থেকেই আমাদের তৈরি করছেন। তাহলে ভাবুন, কত পুরনো, কত দূর দেশের ধুলো আর তাদের স্মৃতি রয়ে গেছে আমাদের ভেতরে। ভাবলে খুব মজা লাগে আমার, অনন্তকাল ধরে আমরা কোথাও না কোথাও আছি, ধুলোর ভেতরে লুকিয়ে।
[অনুবাদকের কথাঃ এখানে এসে মান্টোসাব হঠাৎই থেমে গেছেন। কিস্সা আবার শুরু হবার আগে মান্টোসাব একটা পৃষ্ঠায় যা লিখেছেন, তা তুলে ধরছি। এই অংশটা বাদ দিলেও অসুবিধা ছিল না। তবে আমরা যত দূর সম্ভব মূলানুগ থাকতে চাই। ফলে মান্টোসাবের এই বয়ানকেও উপন্যাসের অংশ মনে না করার কোন কারণ দেখছি না। এই কিস্সার বাইরে ভেতরে মান্টোসাব যেটুকু লিখেছেন, তা হুবহু লিখছি:]
মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগছে, লেখাটা কি সত্যিই গালিবের জীবন নিয়ে উপন্যাস হচ্ছে? আগে আমার এত ধন্দ ছিল না। কিন্তু লাহোরে আসার পর থেকে মদ খাওয়ার মাত্রা এত বেড়ে গেছে-সংসার চালানোর জন্যও এত ইতরামি করতে হচ্ছে-সংসারের দিকে কতটুকুই বা নজর আমার নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্যই ইতরামি বলা যায়-আমি অনেকদিন হল খেই হারিয়ে ফেলেছি। মির্জা গালিবকে নিয়ে সিনেমার জন্য যে গল্পটা লিখেছিলাম, ওটা একটা ফ্রড, গোটা সিনেমার জগত্তাই ফ্রড, ওরা চেয়েছিল মির্জার অবৈধ সম্পর্ক নিয়ে একটা গল্প। লিখে দিয়েছিলাম। সিনেমার গল্প, স্ক্রিপ্ট তো আমি লিখতাম শুধু টাকার জন্য। কিন্তু আমার উপন্যাসের গালিব তো গোগোলের ওভারকোট গল্পের সেই লোকটার মতো, আমি যেন তাঁকে ধরতে পারছি না। তাই বেগমকে ডেকে এ-পর্যন্ত শোনালাম। লাহোরে আসার পর থেকে আমারা লেখা শোনানোর লোক নেই। শাফিয়া বেগমকেই শাস্তিটুকু পেতে হল।
