মেহর বেগম নিজেকে সরিয়ে নিলেন। আর মীরসাব যেন এক স্বপ্নের ঘোরের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। প্রতিটি রাত কল্পনায় মেহর বেগমের সঙ্গে কেটে যায়, কিন্তু দিনের বেলা অসহ্য হয়ে উঠল তাঁর কাছে। বছরের পর বছর আর কেউ কাউকে দেখেননি। এই অবস্থায় কী হয় মানুষের? চারপাশের জগৎটাই তো মিথ্যে হয়ে যায়, তার কোনও অস্তিত্বই থাকে না। ব্যাপারটা জানাজানিও হয়ে গেছিল। আত্মীয়-বন্ধুরা মীরসাবের থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে, তাঁকে পাগল বলতে শুরু করেছে। আপনি তো জানেনই, মান্টোভাই, হাতি গর্তে পড়লে পিঁপড়েও লাথি মারে, মীরসাবের দশা তখন সেইরকম। তারপর মেহর বেগম একদিন তাঁর কাছে এলেন গোপনে। বললেন, আমাদের দূরে সরে যেতেই হবে মীর। এমন ভালবাসায় সবাইকে। একদিন এই বিচ্ছেদের মুখোমুখি হতে হয়। আমি যতদিন বাঁচব, তুমিও আমার হৃদয়ে থেকে যাবে। বিচ্ছেদ এবার সম্পূর্ণ হল। রইল শুধু স্মৃতি, স্মৃতির ভার। মীরসাব পাগল হয়ে গেলেন। খোয়াব-এ -খেয়াল-এ মীর সেই পাগলামোর দিনগুলোর কথাই লিখে গেছেন। মীরসাব। চাঁদের দিকে তাকাতে তিনি ভয় পেতেন, তবু চোখ চলে যেত, আর চাঁদের শরীরে মেহর বেগমকেই দেখতে পেতেন। বিশ্বাস করুন, তাঁর চোখ থেকে ঘুম চলে গিয়েছিল, নাওয়া খাওয়া ভুলে গিয়েছিলেন, যেদিকেই তাকান, শুধু মেহর নিগার। ছবির পর ছবির চক্রের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া।
তাঁকে সারানোর জন্য কত হাকিম এলেন, কত ঝাড়ফুক চলল, কিন্তু কে বুঝবে বলুন মীরসাবের যখন চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে অবস্থা, সেই চাঁদই তখন হারিয়ে গেছে জীবন থেকে। অনেক চেষ্টা করেও যখন সারানো গেল না, তখন কী করা হল জানেন? মীরসাবকে একটা ছোট কুঠুরিতে আটকে রাখা হল, হ্যাঁ শুনুন বলছি, কবরের চেয়েও ছোট সেই কুঠুরি। দিনে একবার খেতে দেওয়া হত তাঁকে। সুস্থতা বলতে কী বোঝে আসলে মানুষ? খাও, হাগো, খাও, হাগো, আর তুমি যা বিশ্বাস করো না, সেই কথাগুলো বলে যাও। তারপর কী হল জানেন? সবাই ঠিক করল, লোকটার শরীর থেকে বদ রক্ত বের করে দিতে হবে। রক্ত বেরোতে বেরোতে মীরসাব অচৈতন্য হয়ে গেলেন। তাতে কী? বদ রক্ত তো বার করতে হবে। মীরসাব পরে একটা শের এ লিখেছিলেন, ক্রীতদাশ হও, জেলে পচে মরো, কিন্তু ভালবাসার খপ্পরে পড়ো না। প্রেমে একদিন আগুন জ্বলে উঠেছিল, তারপর তো পড়ে আছে শুধু ছাই।
মীরসাব সেই আগুনের ছোঁয়া পেয়েছিলেন, আর আমি শুধু সেই ছাইটুকু গায়ে মাখতে পেরেছিলুম। মীরসাবের মতো করে কাউকে ভালবাসতে পারিনি আমি। কেন জানেন? হয় খোদা আমার ভেতরে ভালবাসা দেননি, নইলে এতিমের মতো জীবন কাটাতে কাটাতে আমি ভালবাসার মানেই ভুলে গেছি; শুধু শব্দদের ভালবেসেছি, শব্দ কীভাবে মানুষকে ছোঁয় আমি বুঝতে পারিনি।
জীবন শুরুর দিনগুলোতে উমরাও বেগম একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি কথা বলেন না কেন, মির্জাসাব?
-কী কথা?
-আমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে না আপনার?
-করে তো, কিন্তু
-কী?
-তুমি আমার থেকে অনেক দূরে বেগম।
-কত দূরে?
আমি আঙুল তুলে আকাশের একটা নক্ষত্রকে দেখিয়েছিলুম।
১৪. মির্জাসাব, আরে ও মির্জাসাব
নগ্মহ্ হৈ, মহ্ব্-এ সাজ রহ; নশহ হৈ, বেনিয়াজ রহ্
রিন্দ-এ তমা-এ নাজ রহ; খল-কো পার্সা সমঝ।।
(সুর আছে, ভেসে যাও সুরের স্রোতে; সুধা আছে, ভুলে যাও সব কিছু।
রূপসীর প্রেমে পাগল হয়ে যাও, সাধুতা থাকে অন্যদের জন্য।)
মির্জাসাব, আরে ও মির্জাসাব, এই দ্যাখো, বুড়ো আবার ঘুমিয়া কাদা। এত বছর কবরে শুয়ে থেকেও ঘুমের কমতি নেই। নাকি মাঝে মাঝে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকেন? এ-বুড়োকে চেনা দায়, ভাইজানেরা। ওঁর গজলের মতোই বাইরের রূপে ভুললে ভেতরে কী মাল আছে বুঝতে পারবেন না। মোমিন, জওকরা যখন চাদ-ফুল-পাখি-নারী নিয়ে একই কথা লিখে যাচ্ছেন, নয়তো বাদশাহের প্রশস্তিগাথা লিখেছেন, তখন মির্জাসাব এসে গজলের মরাস্রোতে ঢেউ। খেলালেন। কীভাবে একজন শিল্পী এত বড় কাজ করতে পারে? যখন নিজের জীবনকে পুড়িয়ে পুড়িয়েই কেউ শিল্পের অগ্নিশিখা জ্বালিয়ে রাখে, তখনই এইরকম হতে পারে। এইসব মানুষ খুব আনপ্রেডিক্টেবল, জানেন তো, মানে ধরাছোঁয়ার বাইরে; আমাদের প্রত্যেকটা দিনের যে রুটিন, সেই গজ ফিতে দিয়ে মির্জাসাবের মতো মানুষকে মাপতে যাওয়া ভুল। এক এক সময় মনে হবে, লোকটা একটা শয়তান ছাড়া আর কিছু নয়, হয়তো তা-ই, শয়তানই, এমন এক শয়তান যে তার নিজের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পারে। মির্জাসাবের একটা মজার গল্প মনে পড়ল। রঙ্গরসিকতায় তো ওঁর জুড়ি কেউ ছিল না সে সময়ে, কিন্তু ব্যাঙ্গের চাবুকটা বেশীরভাগ সময় নিজের পিঠেই মারতেন। না, না, ভাইজানেরা, বিরক্ত হবেন না, গল্পটা বলছি। ভাববেন না যে আমি মির্জাসাবের হয়ে সাফাই গাইছি। আমি কে যে তার হয়ে সাফাই গাইব? আর মির্জাসাবের জীবনও তো এখন আর কিস্সা ছাড়া আর কিছুই না। শুধু বেঁচে আছে। তার গজল; আমরা ভুল করি ভাইজানেরা, জীবনে একজন শিল্পীকে হারিয়ে দেওয়া খুব সহজ, কিন্তু শিল্পীর সত্যিকারের জীবন শুরু হয় তো তার মৃত্যুর পরে, তখন ইব্রাহিম জওকের মতো মানুষ শত চেষ্টা করেও সেই জীবনকে মলিন করে দিতে পারে না।
এবার কিস্পটা শুনুন। মির্জাসাব যে -কামরায় সারাদিন থাকতেন, সেটা ছিল বাড়ির দরজার ছাদের ওপর। তার একদিকে ছোট একটা অন্ধকার কুঠুরি। দরজাটা ছিল খুবই ছোট, একেবারে কুঁজো হয়ে ঢুকতে হত। সেই ঘরে সতরঞ্চির ওপর মির্জাসাব গরমের সময় বেলা দশটা থেকে তিনটে-চারটে পর্যন্ত বসে থাকতেন। কোনওদিন একা, কোনওদিন সঙ্গী পেলে চৌসর খেলে দুপুরটা কাটিয়ে দিতেন। তখন রমজান মাস চলছিল। একদিন মৌলানা আজুদা এসে হাজির দুপুরে। মির্জাসাবের খুবই পেয়ারের মানুষ ছিলেন তিনি। তো সেদিন মির্জাসাব এক বন্ধুর সঙ্গে বসে চৌসর খেলছিলেন। রমজান মাসে চৌসর খেলা? মৌলানার চোখে এ তো গুনাহ্। তিনি বললেন হাদিসে পড়েছিলাম, রমজান মাসে শয়তান বন্দি থাকে। এরপর আর। হাদিসের কথা মানা যাবে না।
