-ওরা আপনার তো কোনও ক্ষতি করেনি।
-এত নোংরা জানোয়ার আর আছে নাকি! ছায়া মারালেও গোসল করতে হয়। তুমি তা করো?
-না।
-তওবা,তওবা,কোরানের একটা কথাও তুমি মানো না?
-মানি তো।
-তা হলে কুকুরদের সঙ্গে এত মাখামাখি কিসের?
আমি হেসে ফেললুম-আমিও তো এক কুকুর, মারুফসাব।
-মানে?
-আমার ওয়ালিদের কোনও হাভেলি নেই। দাদার বাড়িতে আমি বড় হয়েছি, তারপর আপনার মেয়েকে নিকে করে আপনার বাড়িতে এসেই উঠেছি। তা হলে আমাকে কুকুর বলবেন না কেন? আমার তো পথেই থাকার কথা ছিল।
-মিঞা, তোমার জুবান বড় বেশি। যার খাও তারই মাথায় হাগতে চাও। মারুফসাব রাগে গরগর করতে লাগলেন।
-কুত্তার জুবানের মতোই জি।
-মিঞা, মুখ সামলাও।
-ভাঁদোর কুকুর দেখেছেন মারুফসাব? রাস্তায় কী করে? এইরকম ভাঁদোর কুকুর মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। যার ভেতরে লুকিয়ে থাকে, হাজারবার গোসল করলেও সে সাফসুরত হয় না।
-কী বলতে চাও তুমি?
-আগে তো নিজেকে সাফসুরত করুন।
কোরান হাদিশের এত এত বয়াৎ যার মুখে মুখে ফেরে,সে তা হলে ঘরে বিবি থাকতেও কোঠায় যায় কেন, মান্টোভাই? তার কী কোনও অধিকার আছে অন্যের সাফসুরতি নিয়ে কথা বলার?
আমি খুব সাচ্চা আদমি,এই দাবি কখনও করিনি। সত্যি বলতে কী, আমি দিল্লি এসেছিলুম লোভে পড়েই। মারুফসাবের খানদান পরিবার, দরবারের সঙ্গেও যোগাযোগ আছে, ভেবেছিলুম শায়র হিসেবে দরবারে জায়গা পেয়ে যাব আমি, নিজের মর্জিমাফিক জীবন চলবে, সুরা আর নারীর প্রতি তখনও তো আমার খুব টান ছিল। বেগমের সঙ্গে তো কোনও সম্পর্ক ছিল না আমার। সে থাকে জায়নামাজ-কোরান-হাদিশ নিয়ে; দিনে দিনে তা আরও বেড়েছে আর এক সময় তো নিজের খাওয়ার বাসনকোসনও আলাদা করে নিয়েছিল। কেন? আমি দারু খাই, গজল লিখি;তার কোরানে তো এ সব হারাম ছিল। দায়িত্ব তার খুবই ছিল, আমার কোথায় সুবিধে অসুবিধে সব দিকে নজর রাখত, কিন্তু তাঁকে তো আর মহব্বত বলে না। জানি না, হয়তো সেটাই ছিল উমরাও বেগমের ভালবাসা। তবে কী জানেন,বয়স যত বেড়েছে ভালবাসা শব্দটাকে আমি ততই অবিশ্বাস করেছি। সত্যি কী অবিশ্বাস করেছি? কিন্তু এটুকু জানি দিনে দিনে আমার ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেছে। কেন? হয়তো আমার ভেতরেই ভালবাসা ছিল না, আমি কাউকে ভালবাসতে পারিনি। আজ কবরে শুয়ে মনে হয়, আমি ভালবাসার কাঙাল ছিলুম, নিজে কাউকে ভালবাসিনি। আমি তো মীরসাব নই, শুধু ভালবাসার জন্য কী অত্যাচারই না সহ্য করেছিলেন তিনি। লায়লা-মজনুর গল্প তো আপনারা সবাই জানেন, কিন্তু মীরসাবের সেই দিনগুলোর কথা কজনই বা জানে? ইস্কে দিবানা কাকে বলে, মীরসাব তা জীবন দিয়ে দেখিয়ে গেছেন।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, মীরসাবের কথাই বলছি; জানি, একজনের জীবনের ঘ্যানঘ্যানানি বেশিক্ষণ শোনা যায় না। নিজের কথা এত যে ফলাও করে বলে চলেছি, আমি জানি, এক কথায় আমার জীবনের। গল্পটা যদি বলতে হয়,তবে শুধু একটা জিজ্ঞাসা চিহ্নই কাগজের ওপর বসিয়ে দিতে হবে। তার চেয়ে মীরসাবের সেই দিনগুলোতে ফিরে যাই চলুন।
ক্ষত বিক্ষত এক শহর, তাঁর হৃদয়, মীরসাবের। সেই শহরের কথা তিনি মুআমলাত-এ ই মসনবিতে লিখে গেছেন। আমার তো মনে হয়, ভালবাসা নিয়ে যে-সব মসনবি মীরসাব লিখে গেছেন, মুআমলাত -ই সেরা; এ যেন শিষমহলে একটা আর্তনাদ পাক খেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ কীসের আর্তনাদ জানেন? চাঁদ দেখার জন্য। সেই যে ছোটবেলায় নানি সন্ধেবেলা তার মুখ ধুইয়ে দেওয়ার সময় বলতেন, উপর মে তাকাও বেটা, দেখো, চাঁদকো দেখো, তখন থেকেই চাঁদ তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল,আর তারপর তো চন্দ্রাহতই হতে হয়েছিল। চাঁদের শরীরে তিনি তা আশিক্কে দেখতে পেতেন, এভাবে দেখতে দেখতেই একদিন পাগল হয়ে গেলেন। কে তার আশিক্?
তাঁর নাম আমি জানি না, মান্টোভাই। আমরা যে সমাজে বেঁচেছিলুম, সেখানে তো মসনবি দস্তান ছাড়া মেয়েদের নাম খুঁজে পাওয়া যায় না। কী দরকার তাদের নামের? মোল্লারা তো তাদের বোরখা দিয়ে ঢেকে দিয়েছে, সে যে একা একজন মানুষ। সেই পরিচয়টাই মুছে দিয়েছে। কিন্তু আজ আমরা তাঁর একটা নাম দিতেই পারি। কী নাম দিই বলুন তো? মেহর নিগার, কেমন হয়? ভারি সুন্দর নয় নামটা? তো এই মেহর নিগারের প্রেমে পড়েছিলেন মীরসাব, তখন তাঁর আঠারোর মতো বয়স। বিবাহিত মেহর বেগম মীরসাবের চেয়ে বয়েসে কিছুটা বড়ই ছিলেন, তবে পারিবারিক সম্পর্ক থাকার দরুণ পর্দা প্রথা মেনে চলতে হত না, মীরসাবের সঙ্গে তিনি সহজভাবেই মেলামেশা করতেন। এই বেগমের চলাফেলা, আদবকায়দা নিয়ে পরিবারের সবাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল। মীরসাব সেই সব কথা শুনতে শুনতেই একদিন প্রেমে পড়ে গেলেন মেহর বেগমের। মীরসাব তাঁকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতেন, কিন্তু কথা বলতে পারতেন না। কী বলবেন? যখন অনেক কথা নিজের ভেতরে জমে যায়, তখন আর কথা বলা যায়, মান্টোভাই? ধীরে ধীরে একদিন আড়াল ভেঙে গেল, মীরসাব তাঁকে স্পর্শও করলেন।মুআমলাত-এ মীরসাব নিজেই লিখে গেছেন, আমি তার সৌন্দর্যের কথা বলতে পারব না, যেন আমার কামনার ছাঁচেই তিনি জন্ম নিয়েছিলেন। তাঁ হাঁটাচলায়, চোখ তুলে। তাকানোয়, গ্রীবার ভঙ্গিতে গজলের ছন্দকে আবীস্কার করতেন মীরসাব। একদিন কী হল জানেন? মেহর বেগম তখন পান খাচ্ছিলেন, ঠোঁট দুটি সূর্যোদয়ের আকাশের মত রাঙা, আর সেই ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে মীরসাব নিজেকে সামলাতে পারলেন না, বেগমের অধরের সুরা চাইলেন তিনি। প্রথমে হেসে নারাজ ভাব দেখালেও, বেগমও শেষ পর্যন্ত মীরসাবার অধরের সুরা পান করলেন। তার পরে কী হতে পারে, ভাবুন। বেগমের সঙ্গে নিভৃতে দেখা করার ইচ্ছে, আর বেগমও তা চাইছিলেন। এভাবে বেশ কিছুদিন চলার পর মেহর বেগম একদিন বললেন, এই ভালবাসার কোন পরিণতি নেই মীর। এভাবে বেশীদিন চলা যায় না।
