হু মৈ-ভী তমাশাই-এ নৈর-এ-তমান্না,
মৎলব নহীঁ কুছ ইস-সে কেহ্ মলব-হী বর আয়ে।।
(বাসনার নিত্য নব রঙের দর্শক আমি,
আমার বাসনা কোনওদিন পূর্ণ হবে কিনা,অবান্তর সে-কথা।)
মনে করবেন, সেই একই নিজের ভেতরের অন্ধকারের কথা বলে চলেছি আমি। না, এবার একটু রংদার কথায় আসা যাক। গভীর নির্জন পথের কথা বেশিক্ষণ কেউই শুনতে পারে না। আমিও পারতুম না; মশকরা না করলে এই এক জন্মেরই হাল্কা জীবনটাকে কেউ বইতে পারে? এত হাল্কা-দুদিন পর কেউ কারুর থাকবে না-তাই বইতে পারা যায় না। কেউ কি বিশ্বাস করবে মান্টোভাই, মৃত গোলাপের সামান্য একটি পাপড়ির ভার আমি বইতে পারতুম না। এসব শুনে কী বলবে লোকে? ওই বজ্জাতটা সাজিয়ে-গুছিয়ে কথা বলতে পারত খুব, কী দিয়েছে নিজের বিবিকে,এতগুলো বাচ্চা পয়দা হওয়ার পরেও পনেরো মাসের বেশি বাঁচেনি কেন তারা, কী করেছে ওই বুরবাকটা তার বাচ্চাদের জন্য? আমি তাদের জন্য একটা গল্প বলি। আপনারা রাবেয়ার নাম জানেন?বার সুফি সাধিকা রাবেয়ার কথাই বলছি,একেবারে ভিখারির ঘরে জন্ম হয়েছিল তাঁর বাপ-মায়ের মৃত্যুর পর ক্রীতদাসী হিসাবে তাঁকে বাঁচতে হয়েছিল অনেকটা জীবন। তাঁর একটা কিস্সা লিখেছিলেন আতরসাব তখিরাৎ-আল-আওলিয়া-তে। সে এক মজার কিস্সা।
রাবেয়াকে একজন জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি কোথা থেকে এসেছেন?
-অন্য দুনিয়া থেকে রাবেয়া হেসে বললেন।
-আর কোথায় যাচ্ছেন?
-আর এক দুনিয়ায়।
-তা হলে এই দুনিয়ায় কী করছিলেন?
-একটু খেলতে এসেছিলাম, ভাইজান।
এই কিস্পটা বললুম বলে ভাববেন না যে আমিও একজন সুফি সাধক ছিলুম। সে ক্ষমতা। আমার ছিল না। আমি তো সারা জীবন আয়নার সামনে বসে থাকা এক মানুষ, সে শুধু প্রতিবিম্বই দেখে চলেছে। আমি কী করে সাধক হব বলুন? আমি তা দাবীও করিনি কখনও। কিন্তু যারা জীবনে সব কিছু ঠিক ঠিক ভাবে করে গেছে, যাতে এতটুকুও দাগ না লাগে, তারা যখন বলেছে, আমরাই তো দীনের পথে চলেছি,তখন আমাকে একটু মুচকি হাসতে হয়েছে। তাহলে আল্লা কেন ধুলো দিয়ে আদমকে বানালেন? কেন তাকে পাপের পথে ঠেলে দিলেন?আল্লা যদি নিজের ভেতরেই থাকতেন তা হলে নিজেকে দেখতেন কীভাবে? আদমের মধ্য নিজেকে দেখলেন তিনি।পাপের পথে হাঁটতে হাঁটতে তিনি দেখলেন কোথায় তার পুণ্য। না,না, আমি আমার সাফাই গাইছি না। মহাভারতের অনেক কিস্সা তো আমি শুনেছি। সেখানে সবচেয়ে পুণ্যের অধিকার কার? একমাত্র যুধিষ্ঠিরের। তাঁর সারা জীবন তো শুধু নানা পাপেরই গল্প। পঞ্চপাণ্ডবদের মধ্যে আর কেউ এত পাপ করেননি, তবু ধর্মরাজ কুকুর হয়ে তাঁরই সঙ্গী হলেন। কেন? এর উত্তর আমিও জানি না, মান্টোভাই। আরেকজনের কথা বলি। বেশ্যা পিঙ্গলার নাম শুনেছেন? উদ্ভব গীতা-য় পিঙ্গলার কথা আছে। আমি জামা মসজিদের এক দস্তানগোরের কাছেই কিস্যাটা শুনেছিলুম।উদ্ভব গীতা-য় দত্তাত্রেয় অবধূত রাজর্ষী যদুকে তাঁর চব্বিশজন গুরুর কথা বলেছেন। পিঙ্গলা তাদেরই একজন। অবধূত এক সন্ধ্যায় পিঙ্গলাকে দেখেছিলেন,নিজের বাড়ির সামনে প্রেমিকের সন্ধানে দাঁড়িয়ে থাকতে। সন্ধ্যা থেকে রাত গড়িয়ে গেল,কেউ এল না। পিঙ্গলা ভাবছিল,আজ কেউই এল না? ভগবানকে না ডেকেই আমার এই অবস্থা। নিরাশ হতে হতে সে নিরুদ্বেগ হয়ে ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়ল। পিঙ্গলা অবধূতকে কী শেখাল? আশা ত্যাগ করলেই শান্তি। ভেবে দেখুন, একজন বেশ্যাও গুরু হতে পারে।
কিন্তু আমার শ্বশুড় মারুফসাব দুনিয়ার সব কিছুর উত্তর জানতেন। দিল্লিতে এসে আমি আর উমরাও বেগম তো তাঁর হাভেলিতেই উঠেছিলুম,ছিলুমও বেশ কিছুদিন,কিন্তু লোকটাকে সহ্য করা যেত না। সব কিছু নিক্তি দিয়ে, পাই পাই করে মাপতেন। ওভাবে মানুষকে মাপা যায় নাকি? আমিও তাই তাঁর সঙ্গে মজা করতুম। এইসব মানুষ, যারা নিজেদের পবিত্র মনে করে, যারা কথায় কথায় বলে দেবে, কোন্ পথ আপনার জীবনের জন্য ঠিক, তাদের নিয়ে মজা করা ছাড়া আর কী করা যায়? যত মজা করবেন,দেখবেন, ততই তাদের তসবির ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছে। এইসব পবিত্র মানুষরা, আমি দেখেছি, একটা জিনিসই জানে, কীভাবে,কতভাবে অন্যদের অপমান করা যায়। আমার ওয়ালিদের ঘরবাড়ি না থাকতে পারে, তুর্কি রক্ত তো আমার শরীরে,আমি সেই অপমান সহ্য করব? তাই আমার হাতের তাস ছিল মজা, ওই শালা মারুফসাবকে নিয়ে এমন মজা করো যাতে তাঁর মূর্তিটা ভেঙে চুরচুর হয়ে যায়।
আমি ছোটবেলা থেকে রাস্তার কুত্তাদের খুব ভালবাসতুম,মান্টোভাই। আকবরাবাদের পথের কুকুররা আমার পায়ে পায়ে ঘুরত,আমি ওদের আদর করতুম,তাদের সঙ্গে কথা বলতুম রাস্তার কুকুররা যেমন বন্ধু হয়, তেমন আর কেউ হতে পারে না,এ আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। তারাও আমার গা ঘেঁষে বসত, আমার শরীরের গন্ধ শুকত, আর এমনভাবে তাকিয়ে থাকত,ওরা সত্যিই অনেক কথা বলতে চাইত,আমি বুঝতে পারতুম। কিন্তু কুকুরদের ভাষা তো আমি জানি, আল্লা দয়া করে যদি সেই ক্ষমতাটুকু দিতেন তা হলে জীবনটা দিনে দিনে পাথর হয়ে উঠত না। আর মারুফসাব কুকুরদের একেবারে পছন্দ করতেন না। একদিন বললেন, মিঞা হাভেলিতে থাকো, রাস্তার কুকুরের সঙ্গে তোমার এত ভাব-ভালবাসা কেন? আমার বলতে ইচ্ছে হয়েছিল, শালা কুত্তা কাহিকা। বলতে তো পারিনি। যাঁর বাড়িতে থাকি–খাই তাঁকে তো এ-কথা বলা যায় না। কিন্তু সেজন্য তো আমি তাঁর ক্রীতদাসও হয়ে যাইনি। আমি তাই মজা করতে শুরু করলুম।
