মান্টোভাই, আমার মতই এই শহরটা, দিল্লি, কতবার ভেঙে পড়েছে, আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার ও দিল্লির নিয়তি যেন একটা একই কলম দিয়ে লিখেছিলেন খোদা। তবে আমি যখন এসে দিল্লি পৌঁছলুম, তখন কিছুটা শান্তি ফিরে এসেছে, কিন্তু তা সে শ্মশানের শান্তি, দিল্লির রওনক তো কবেই হারিয়ে গেছে। সেসব কথা আপনারা ইতিহাস বইতে পড়েছেন, কীভাবে ফারসি, আফগান, মারাঠাদের একের পর এক আক্রমণ আর দরবারের ভেতরকার খেয়াখেয়িতেই দিল্লি একটা খণ্ডহর হয়ে গেছে। মীর, সওদার মতো কবিরা এক সময় দিল্লি ছেড়ে লখনউ চলে গিয়েছিলেন জানেনই তো। কেন চলে যেতে হয়েছিল তাঁদের? তবে মীরসাবের একটা শের বলি:
অব খরাবহ হুয়া জহান্-এ আবাদ
বরনহ্ হরেক কদমপে যাঁ ঘর-থা।।
(আজ উজাড় হয়ে গেল যেখানে জমজমাট নগর ছিল,
নইলে এখানে তো প্রতি পদেই বাড়ি ছিল।)।
আমার সামনেও দিল্লি আবার এভাবে উজাড় হয়ে গেছে, মনে হত যেন কারবালায় দাঁড়িয়ে আছি, তবু এই শহরটা ছেড়ে যেতে পারিনি আমি; কিন্তু অনেকবার তো ভেবেছি, কে পৌঁছে আমাকে এই শহরে, এ তো এক কারাগারের মতোই এসেছে আমার জীবনে, তবু আলবিদা বলতে পারিনি। কেন জানেন? ওই যে বলেছি, খোদা আমার আর দিল্লির নিয়তি একই কলমে লিখেছিলেন। তাকে ফেলে যাব কোথায়? জীবনে যা পেয়েছি আর পাইনি, তার হিসেবনিকেশ তো শহরটার আত্মায় খোদাই হয়ে গিয়েছিল। লোকে বলবে, পাগলামি, কিন্তু ওই জুনুন ছাড়া আমি বাঁচতাম কী করে বলুন তো? দেয়ালে আমার পিঠ ঠেকে গিয়েছিল, তো কী? আমি মনে। মনে বলেছি, চালাও, আরও গোলি চালাও, দেখি কত রক্ত তোমরা দেখতে চাও, কতখানি ঘিলু বের করে আনতে চাও, কত অপমানিত করতে চাও করো, কিন্তু তোমরা তো আমার ভেতরের খুশবুটাকে ছুঁতে পারবে না, সেই ভাষাকে তো ছুঁতে পারবে না, যা সাজিয়ে সাজিয়ে আমি গজল লিখি। একদিন আমার পাপের কথাও থাকবে না, তোমাদের গোলি চালানোর কথাও একদিন ভুলে যাবে সবাই, বেঁচে থাকবে কিছু শব্দ আর ছন্দ, যার নাম মির্জা গালিব। যাকগে, এ সব বাদ দিন, লোকে হাসবে, বলবে, নিজের পক্ষে সাফাই গাইতে কবিদের জুড়ি নেই। যখন কলকাতায় গিয়েছিলুম, তখন কার মুখে যেন শুনেছিলুম একই সঙ্গে সরস্বতী আর লক্ষীর সঙ্গে ঘর করা যায় না। আমিও লক্ষীর সঙ্গে ঘর করতে পারিনি। সরস্বতীর প্রেমে পড়েছিলাম যে। ইয়া আল্লা! কী যে বলি আমি! গোস্তাকি মাফ করবেন, আসলে হিন্দুদের আর কোনও দেবীর। হাতে তো বীণা দেখিনি আমি। মুনিরাবাইয়ের প্রেমে পড়েছিলুম গানের জন্যই। উমরাও বেগম তো আমার কানের কাছে সবসময় কোরান আর হাদিসের বাণী শুনিয়ে যেত। পবিত্র ফুল। আপনি কল্পনা করতে পারেন মান্টোভাই, যার ওপর একটাও মৌমাছি এসে বসেনি? ফুল যে সুধা তার ভেতর জমিয়ে রেখেছে, মৌমাছি এসে সেই সুধা যদি না পান করে, তবে সেই সুধার সার্থকতা কোথায়? আমার শ্বশুর, নবাব ইলাহি বখশ খানও এ সব কথা শুনলে রেগে যেতেন। তিনিও শের লিখতেন, তার তখঙ্কুশ ছিল মারুফ, জানেনই তো। হাসি পায় কি জন্য জানেন? মারুফের একটা শের আপনি এখন খুঁজে দেখুন তো, পান নাকি কোথাও? কিন্তু ইতিহাসে লেখা আছে, তিনি ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন। কুর্নিশ জানাই এমন ধর্মপ্রাণকে। কবি মারুফের কথা আল্লা তাঁর কোনও কিতাবেই লেখেননি। কেন জানেন? আল্লা তো কবিতা বোঝেন। তাঁর পয়গম্বর হজরতের কটা বিবি? আর কোরান?সে তো কবিতার ছন্দেই আল্লার কাছ থেকে। পেয়েছিলেন হজরত মান্টোভাই, কোরান আমার কাছে এক আশ্চর্য কবিতা,সেই কবিতায় জন্ম মৃত্যু-প্রেম-নিয়তি, গোটা বিশ্বসংসার এক খেলায় মেতে উঠেছে, যেমন আপনি বেদ উপনিষদ,গীতা, জেন্দ আবেস্তায় পাবেন; আমার গজলে সেই খেলার ভেতরে ঢুকতে গিয়েই তো ফৌত হয়ে গেলুম। জওকসাব,মোমিনসাবের মততা কি লিখতে পারতুম না আমি? কিন্তু আমি জীবনটাকে বাজি ধরেছিলুম; আমার শাগির্দ হরগোপাল তাকে একবার লিখেওছিলুম,শোনো, গজল মানে সুন্দর সুন্দর শব্দ নয়,ছন্দ নয়, হৃদয় থেকে রক্ত না ঝরলে গজল লেখা যায় না। এক একটা শব্দ কত রক্তে ভেজা,আমি একা একা বসে অনুভব করেছি,মান্টোভাই।
কথায় কথায় অনেক দূর চলে এসেছি। কবরের বন্ধুরা,যাঁরা আমার কথা শুনছেন, মাফ করবেন। আসলে কী জানেন, আমার জীবনের ব্যর্থতা খেই হারানো এইসব কথার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে।আমাকে যারা অভিযুক্ত করেছে, তাদেরও ঠিকঠাক উত্তর আমি দিতে পারিনি;আসলে আমি তো সব ভুলে যেতুম। আমার কাছে প্রত্যেকটা দিন ছিল নতুন একটাই দিনের জীবন-পরের দিনের কথা আমি তো জানি না। আমি আপনাদের কাছে সর্বান্তঃকরণে স্বীকার করছি, আমি অনেক পাপ করেছি-শরিয়তে যেহেতু তাঁকে পাপ বলা হয়, তবে কি না পাপ-পুণ্যের বিচার তো এই দুনিয়ায় হওয়ার নয়, সে হবে কেয়ামতের দিনে, আল্লার দরবারে-কিন্তু কারুর জন্য আমার মনে প্রতিহিংসা আসেনি। কেন জানেন? আপনারা হাসবেন হয়তো,তবু বলি,ভাগ্যিস কবিতার সঙ্গে বিছানায় শুয়েছিলুম আমি, ভাগ্যিস আমি দিল্লিতে আমার নিজের হাভেলি বানানোর কথা ভাবিনি,ভাগ্যিস আমাকে একের পর এক মুশায়েরায় অপমান করা হয়েছে,ভাগ্যিস আমি পেনশনের টাকা আদায়ের জন্য ছুটে ছুটেও তা পাইনি, ভাগ্যিস আমাকে নির্ভর করতে হয়েছে নবাব-মহারাজাদের দান-খয়রাতের ওপর,ভাগ্যিস আমাকে মনে করানো হয়েছে, গালিব, তোর বাবার কোনও বাড়ি ছিল না, তোরও কোনও বাড়ি নেই,ভাগ্যিস আমি এতিমের মতো জন্মেছি, এতিমের মতো জীবন কাটিয়েছি,এতিমের মতো মরেছি, ভাগ্যিস আমি জুয়াখেলার জন্য জেলখানায় জীবন কাটিয়েছি-আর ততই চিনেছি মানুষদের-আসলে তো তারা সব ছায়াপুতুল জানেই না জীবন তাদের কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে। আমিও জানতুম না। কিন্তু তারা অজ্ঞানের মতোই বিশ্বাস করেছে, তারা মক্কার পথে চলেছে। আমি সে-পথে কোনওদিন যেতে চাইনি, মান্টোভাই। সেই শেরটা আপনার মনে আছে?
