হ্যাঁ, আপনি হিরামান্ডির কোনও কোঠার সিঁড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন। সেখানে দালাল আছে, ফুলওয়ালা আছে। দালালের সঙ্গে কথা বলে তবেই না আপনি কোঠায় পৌঁছাতে পারবেন। কিন্তু কোঠায় যাওয়ার আগে ফুলওয়ালার কাছ থেকে মালা কিনে কবজিতে জড়িয়ে নিতে হবে। তারপর সিঁড়ি বেয়ে আপনি রংমহলে এসে পৌঁছালেন। ঝাড়বাতির আলো, দেওয়ালে দেওয়ালে আয়না, খান্দানি সব ছবি, ফুল আর আতরের সুবাসে আপনার মন এক নিমেষে যেন একটা বাগান হয়ে গেল, আর গাছে গাছে ডেকে উঠল কোকিলেরা। মেঝেতে কার্পেটের ওপর পাতলা সাদা চাদর পাতা আছে, তাকিয়াও মজুত, আপনি ঠেস দিয়ে বসুন। বাইজি এসে বসবেন একেবারে মাঝখানে। তাঁর পিছনে সারেঙ্গি, বীণা, তবলার শিল্পীরা। ওই যে, বয়স্ক মহিলাটি একটু দূরে বসে আছে দেখছেন, তিনি এই কোঠির মালকিন। একসময় নিজেও তবায়েফ ছিলেন, এখন সব দেখভাল করেন। নতুন নতুন তাবায়েফদের রেওয়াজ করিয়ে খুবসুরত করে তোলেন। মালকিনের পাশেই রাখা আছে সোনালি ও রুপালি তবক দেওয়া পানের খিলি-ভরা রুপোর খাসদান। শ্বেতপাথরের জলচৌকির ওপর সোনার কাজ করা গোলাপপাশ। একটা পাত্রে দেখবেন জাফরানমেশানো কুচো সুপুরি, মশলা, জর্দা। মালকিনের প্রথমে সবার সঙ্গে বাতচিত করবেন, বুঝে নেবেন কোন মেহমানের তারিকা কেমন। এরপর এক তরুনী সারা ঘর ঘুরে ঘুরে সবার হাতে পানের খিলি তুলে দেবে। তখন কী করতে হবে আপনাকে? অন্তত একটা রুপোর মুদ্রা তার হাতে দিতেই হবে। এবার বাইজি এলেন সিল্কের সালোয়ার-কুর্তা পরে, কুর্তার বুকে সোনা বা রুপার জরির কাজ করা বাহারি নকশা। মুখ ঢাকা আছে হালকা ওড়নায়, যেন একখণ্ড কুয়াশা ছড়িয়ে রেখেছেন মুখের ওপর। গয়নাগুলো ঝলসাচ্ছে আলোয়।
বাইজি এবার গান ধরবেন, প্রত্যেক মেহমানের জন্য আলাদা আলাদা গান, গাইতে গাইতে আপনার দিকে তাকিয়ে চোখ ঠারবেন, মৃদু হাসবেন। গান শেষ হলে আপনি তাকে কাছে ডাকুন, টাকার তোড়া তুলে দিন হাতে। এবার অন্য মেহমানদের দিকে তিনি নজর ফেরাবেন। গানের সঙ্গে নাচও দেখার ইচ্ছে হতে পারে আপনার। তখন ঘুঙুরের মুখে বোল ফুটবে, গান বাজনা নাচের ছন্দের সঙ্গে মিলেমিশে আওয়াজ উঠচে, ওয়া-ওয়া, বহুৎ খুব, মারহাব্বা, মারহাব্বা। ব্রিটিশরা আসার পর হিরামান্ডির পুরনো জৌলুস চলে গেলেও সূর্যাস্তের আভাটুকু লেগেছিল। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে হিরামান্ডি যেন মাংসের কারাগার হয়ে উঠল। কারা আসত তখন? নতুন গজিয়ে-ওঠা ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, যুদ্ধের বাজারে ফোকটে পয়সা করা। লোচ্চারা, যারা তরিকা শব্দটার মানেই জানে না। এই দুই হিরামান্ডিই আমি দেখেছি। ভাইজানেরা। কোঠার বাইজিদের কল-গার্ল হয়ে যেতে দেখেছি, যারা টাকা হাতে পেলেই যে কোনও হোটেলের বিছানায় আপনার সঙ্গে গিয়ে শুয়ে পড়বে। কিন্তু আমার কাছে তো হিরামান্ডি মানে সোনার জলে করা মিনে করা একটা ছবি।
মাংস নয়, মহব্বত-এর জন্যই এখানে আমি মানুষকে ফতুর হয়ে যেতে দেখেছি। তার নাম আমি বলব না; সে ছিল পাঞ্জাবের এক জমিদার। হিরামান্ডির জোহরাজানের প্রেমে পড়েছিল সে। প্রায়ই সে হিরামান্ডিতে এসে জোহরাজানের সঙ্গে থাকত। লোকে বলত, জোহরাজানের যৌবন নাকি তার হাতেই তৈরি। মানেটা বুঝতে পারছেন তো ভাইজানেরা? হঠাৎ একদিন জমিদারের শখ হল, সে গাড়ি কিনবে, আর গাড়িতে চড়িয়ে জোহরাকে নিয়ে লাহোরের পথে পথে ঘুরে বেড়াবে। জমিদার হলে কী হবে, টাকাপয়সা বেশী জমাতে পারেনি; জোহরার পরিবারের পিছনেও দেদার টাকা খরচ করেছিল সে। কিন্তু গাড়ি যে কিনতেই হবে। শেষে। একটা গাড়ির কোম্পানির কাছ থেকে ধারে গাড়ি কিনে ফেলল সে। খেতির ফসল বিক্রি করে ছমাস অন্তর টাকা দিয়ে ধার শোধের কড়ার করেছিল, তাতে তিন বছরেই সব টাকা শোধ হয়ে যাওয়ার কথা। গাড়ির কোম্পানী দুবার সময় মত টাকা পেল। কিন্তু তারপর থেকে আর জমিদারের পাত্তা নেই। সে যে কোথায় গেছে, কেউ জানে না। শুধু জানা গেল, জমিজিরেত বেছে জোহরাজানকে সঙ্গে নিয়ে সে কলকাতায় চলে গেছে। গাড়িটা দেশের বাড়িতেই রাখা ছিল, তাই কোম্পানি গাড়িটা অন্তত ফেরত পেল।
এরপর বছর দশেক কেটে গেছে, সেই গাড়ির কোম্পানির ম্যানেজার তাঁর কয়েকজন বন্ধুবান্ধব নিয়ে হিরামান্ডিতে এসেছেন রঙিন সন্ধ্যা কাটাবেন বলে। একটা কোঠার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি সেই পালিয়ে যাওয়া জমিদারকে দেখতে পেলেন; তার চেহারা তখন একেবারে ভেঙে গেছে, চোখে ঘোলাটে দৃষ্টি।
-জোহরাজানের গান শুনবেন হুজুর? জমিদার এগিয়ে এসে ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করল।
-আপনার এ কী অবস্থা হয়েছে? কোথায় ছিলেন এতদিন?
-সব নসিবের লিখন হুজুর। জোহরাকে নিয়ে আমি কলকাতায় গিয়েছিলাম। কত চেষ্টা করলাম, যাতে ওকে ফিল্মে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়।
-তারপর?
-কিছু হল না। আমার যেটুকু টাকা পয়সা ছিল, তাও উড়ে গেল। ফিলিমে ওরা কিছুতেই জোহরাকে জায়গা দিল না।
-তাই আবার ফিরে এলেন?
-কী করব বলুন? জোহরার জীবনটা তো চালাতে হবে। আমিই বা ওকে ছেড়ে যাব কী করে? তাই এখন ওর জন্য খদ্দের ধরে আনার কাজটা আমাকেই করতে হয় হুজুর।
হিরামান্ডিতে যেমন অনেক রোশনাই, তেমনি এভাবে অন্ধকারও আসে মানুষের জীবনে। ভাইজানেরা, এই অন্ধকারের ভিতরেও আমি একটা জোনাকি জ্বলতে দেখেছি। মহব্বতের জোনাকি। ফতুর হয়ে গিয়েও লোকটা জোহরাজানকে ছেড়ে যায়নি। আশিক থেকে দালাল হয়ে গেছে। কিন্তু তার প্রেম মরে নি। বারিসাবের মতো মানুষেরা হিরামান্ডিতে ওসব দেখতে পান নি। আর আমি হিরামান্ডিতে যেতাম মাংসের ভেতরে লুকানো রত্নের খুঁজতে, এইরকম জোনাকির আলো দেখতে। আল্লার কসম, মান্টো কখনও ওদের সঙ্গে শোয়ার কথা ভাবেনি। সত্যিই কি? নাকি এটাও মিথ্যে বললাম?
১৩. আমার মতই এই শহরটা
দিলকী বিরানীকা কেয়া মজকুর হ্যয়
অহ নগর সও মর্তবা লুট গয়া।।
(আমার উজাড় হৃদয়ের কথা কী আর বলব,
এই নগরীটি বার বার লুন্ঠিত হয়েছে।)
