আচ্ছা, আমাদের মদের আড্ডার কিছু কিস্সা না হয় বলা যাক। দেখুন, দেখুন, মির্জাসাব, সবার চোখ কেমন চক চক করে উঠেছে। লাভ কী ভাই? এই কবরে দারু কোথায় মিলবে? গোরু যেমন জাবর কাটে, নেশ-ভাঙের দিনগুলো নিয়েই জাবর কাটুন, তাতে একটু নেশাও হতে পারে। বারিসাব বলতেন, আব্বাস আর আমার মতো মাতাল নাকি হয় না। সত্যি বলতে কী, খারাপ কথার জন্য মাফ করবেন, যাকে বলে পোঁদ উল্টে খাওয়া, আমি আর আব্বাস সে ভাবেই মদ খেতাম। মদের ছিপি সবসময় খুলত আবু সয়ীদ কোরেশি। তারপর আর দেখে কে? আর বারিসাব? এমনিতেই তো সবসময় কথা বলেন, একগ্লাস পেটে পড়লেই যেন ফোয়ারা ছুটত কথার। আমি আর আব্বাস তো হারামি, মনে মনে বলতাম, বলুন যত খুশি কথা বলুন হুজুর, কিন্তু আমরা তো মাল মেরে ফাঁক করে দিই। বারিসাবের তো বক্তৃতা দিতে পারলেই নেশা হত। কিন্তু সভাসমিতিতে বক্তৃতা করার সাহস তার ছিল না। সব আমাদের সামনে, মাল টানতে টানতে।
তবে মজার মানুষ তো, বারিসাব না থাকলে ঠেক যেন জমত না। একদিন সন্ধ্যায় আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। আমি জানলার পাশে বসে আছি। বারিসাব হেসে বললেন, কী, মিঞা, হাল কেমন?
-পানি কোথায়, যে হাল কেমন বুঝব?
তিনি দুচোখে দুষ্টু হাসি ছড়িয়ে বললেন। দাঁড়াও, দাঁড়াও এখুনি আসছি। কিছুক্ষণ পরেই ফিরে এলেন। কাপড়ে জড়ানো মদের বোতল। আমি কিছু বলার আগেই ছিপি খোলা হয়ে গেছে। ততক্ষণে আব্বাসও হাজির। সব জানলা-দরজা বন্ধ করে দেওয়া হল। আব্বাস বাইরের কুয়ো থেকে লোটায় জল নিয়ে এল। তারপর আসর জমজমাট। একসময় বারিসাবকে খেপানোর জন্য আব্বাস বলল, এ-বাড়িতে সবাই আপনাকে সম্মান করে। আপনি নামাজি মানুষ বলে বিবিজানও আপনাকে শ্রদ্ধা করেন। তিনি হঠাৎ এসে পড়লে কী হবে?
বারিসাব চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি তা হলে জানলা দিয়ে পালিয়ে যাব, আর কোনও দিন তাঁকে মুখ দেখাব না।
বারিসাবের যে ভীরুতার কথা বলছিলাম, তা এইরকম। আর এই ভীরুতার জন্যই বারিসাবের মতো মানুষ যা করতে পারতেন, তার কিছুই তিনি করেননি। ব্রিটিশ হাই কমিশনারের অফিসে চাকরি নেবার পর তো আমাদের থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিলেন। মাঝে মধ্যে রাস্তায় দেখা হয়ে যেত। তিনি আমাদের চিনতেই পারতেন না। তার মৃত্যুর দুদিন আগে জোহরাচকে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সমঝোতা করতে করতে একটা মানুষ কতটা ভেঙে পড়তে পারে, তাঁকে দেখে বুঝেছিলাম। আমার সত্যিই দুঃখ হয়েছিল। এই সে-ই বারিসাব, যাঁর হাত ধরে মান্টোর নতুন জন্ম হয়েছিল?
ভাইজানেরা একটু ধৈর্য ধরে শুনুন। বারিসাব সম্পর্কে গঞ্জে ফেরেশ্তে-তে আমি স্পষ্টই লিখেছিলাম, সমাজসংস্কারক হওয়ার খুবই সাধ ছিল বারিসাবের। ইচ্ছে ছিল গোটা দেশ এক ডাকে তাঁকে চিনবে। তিনি হবেন জাতির বরেণ্য পথিকৃৎ। সব সময় ভাবতেন, এমন কিছু। করবেন, যাতে আগামী প্রজন্ম তাঁকে মনে রাখবে। কিন্তু সেজন্য যে তাকৎ-এর প্রয়োজন হয় তা ছিল না বারিসাবের। তিনি শুধু দুচার পেগ খেয়ে হিরামান্ডির মেয়েদের সঙ্গে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে যেতেন। তারপর ফিরে এসে অজু করে নামাজ পড়তেন। আমার সত্যিই দুঃখ হয় মির্জাসাব, মানুষ নিজের পিঠের চামড়া বাঁচাতে এতটাই নীচে নামতে পারে? কবরের কোথাও তো বারিসাবও শুয়ে আছেন, হয়তো আমার কথাও শুনছেনও। কিন্তু এখানে তো পালিয়ে যাবার জন্য জানলা নেই। পালিয়ে যাওয়ার জন্য কোনও জানলা খোলা থাকে না, তাই না, মির্জাসাব? এই জীবনের দাম সুদে আসলে মিটিয়ে যেতে হবে এখানেই। মাফ করবেন ভাইজানেরা, আবার কয়েকটা বড় বড় কথা বলে ফেললাম। কথা কী জানেন, বারিসাবকে যে আমি মনে প্রাণে ঘৃণাও করতে পারলাম না, শুধু অনুকম্পা ছাড়া আর কিছু নেই। আমার কী মনে হয় জানেন, যে অনুকম্পা পায়, তার চেয়েও খারাপ মানুষ যে অনুকম্পা করে।
না, আর এই সব নৌটঙ্কিবাজি নয়, তার চেয়ে হিরামান্ডি নিয়ে কথা বলা ভাল। দেশভাগের আগে লাহোরকে কী বলা হত জানেন তো? প্রাচ্যের প্যারিস। আর হিরামান্ডি হচ্ছে তার জান। অনেকে বলত টিব্বি।
টিব্বি মে চল কে জলবা-ই-পরওয়ার দিগর দেখ
আরে য়ে দেখনে্ কি চিজ হ্যয় ইসে বার বার দেখ
দেওয়ালে ঘেরা পুরনো লাহোরের রোশনির আর এক নাম হিরামান্ডি। এখানেই তো আমি সুলতানা, সৌগন্ধী, কান্তাদের খুঁজে পেয়েছিলাম ভাইজানেরা। হিরামান্ডি মানে যদি ভাবেন, শধু কতগুলো মেয়ের মাংসের স্তৃপ তা হলে ভুল করবেন। একসময় হিরামান্ডি বায়েফদের কাছে। আদাব আর তহজিব শিখতে আসত নবাব-বাদশা, রাজা-মহারাজাদের ছেলেরা। তাবায়েফরাই তো শেখাতে জানত আদব কায়দা। নাচে-গানে-কটাক্ষে গুগু-তে। মির্জা রুশোয়ার উমরাও জান যারা পড়েছেন, তাঁদের কাছে আর নতুন করে কিছু বলার নেই। আর আমাদের মির্জাসাব তো সবই জানেন। কত মশহুর তবায়েফের সঙ্গে মোলাকাত হয়েছে মির্জাসাবের। তবায়েফদের কোঠা তো শুধু মস্তি লোটার জায়গা নয়, সেই মহফিলে যেতে হলে তার তরিকাও শিখতে হবে। যার তার গায়ে কেউ হাত দিতে পারত নাকি? আশনাই-এর ব্যাপার ছিল। দিল এ রং ধরাতে পারলে, তবেই না তার সঙ্গে বিছানায় যাওয়ার কথা ওঠে। না হলে ঠুংরি, দাদরা, গজল শোনো, কখক দেখো, তারপর টাকা ফেলে ঘরে ফিরে যাও।
