কিন্তু মির্জাসাব, যতই এই সব টিকরমবাজি করি না কেন, আমার আর ভালো লাগছিল না। জুয়া খেলতে খেলতে যেমন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম আজিজের হোটেলের সকাল-সন্ধেগুলোও আমাকে আর কিছু দিতে পারছিল না। কী মনে হত জানেন? আমার তো আসলে অন্য কিছু করার কথা। কিন্তু কী করব? আমি বুঝতে পারতাম না মির্জাসাব। একদিন হঠাৎই ঘড়ির পেন্ডুলামটা উল্টোদিকে ঘুড়ে গেল। জীবন হয়ত এভাবে না চাইতেই আমাদের অনেক কিছু দেয়, যদি অবশ্য নেওয়ার মতো ক্ষনতা থাকে।
আজিজের হোটেলেই আমার নসিব অন্য দিকে মোড় নিল, ভাইজানেরা। আলাপ হল বারি আলিগ ও আতা মহম্মদ চিহাতির সঙ্গে। আমার চেয়ে বয়েসে বড় ছিলেন এঁরা। মাঝে মাঝে আজিজের ওখানে চা খেতে আসতেন। আবদুল রহমান সাহেব তখন মাসাওয়াৎ নামে একটা কাগজ শুরু করেছেন, বারিসাহেব সেই কাগজেই কাজ করেন। একদিন আজিজের হোটেলে। বারি আলিগ সাবের সঙ্গে এক টেবিলে বসে ছিলাম। আরও অনেকেই ছিল। হঠাৎ কী প্রসঙ্গে যেন মৃত্যুদণ্ড নিয়ে কথা উঠল। মৃত্যুদণ্ড ঠিক, না ভুল? একজন অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার অধিকার কী কারও আছে? আমি বারিসাবকে অনুরোধ করলাম, স্যর, আপনি এ-ব্যাপারে। আমাদের একটু বুঝিয়ে বলুন। আমি যদি আপনাকে খুন করি, তা হলে কেন আমাকে হত্যা করা যাবে না? অনেক যুক্তি তর্ক দিয়ে তিনি বোঝালেন, হত্যার বদলে হত্যা কোনও পথ হতে পারে না। শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদণ্ডের কোনও নৈতিক ভিত্তি নেই। আর এই সব কথার মধ্যেই এসে পড়ল ভিক্টর উগোর দ্য লাস্ট ডেজ অফ দ্য কনডেমড বইয়ের কথা। ভিক্টর উগোর নাম আপনার শোনার কথা নয়, মির্জাসাব। ফ্রান্সের একজন সেরা কবি, ঔপন্যাসিক ছিলেন ভিক্টর উগো। আমি তো চমকে উঠলাম। আরে, বইটাতো আমার বাড়িতে আছে। সঙ্গে সঙ্গে বারিসাবকে বললাম, বইটা আমার কাছে আছে। আপনি কি আর একবার পড়তে চান?
বারিসাব অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। কী দেখছিলেন, কে জানে! তারপর বললেন, কাল বইটা নিয়ে আমার অফিসে এসো।
সেদিন সারা রাত আমি ঘুমাতে পারিনি, মির্জাসাব। কেমন গর্ব হচ্ছিল। উগোর যে-বইয়ের কথা বারিসাব বলেছেন, বইটা আমার কাছেই আছে আর কাল আমি আমি বইটা ওনাকে দিতে পারব। আচ্ছা, বই তো না হয় দেব, কিন্তু তারপর কী কথা বলব অমন মানুষের সঙ্গে? তিনি কি আমার সঙ্গে কথা বলবেন? ভাবতে ভাবতে আমাদের দুজনের কত সংলাপই যে তৈরি করে ফেললাম। গল্পও তো এভাবেই আমার ভেতরে জন্ম নিত, মির্জাসাব। এক একটা মুখ ভেসে উঠত, আর তাদের কথাগুলো আমি বুনে যেতাম। কথা বলতেই চরিত্রগুলো আমার সামনে ফুটে উঠত।
বারিসাব আমাকে একেবারে আপন করে নিলেন। আমি রোজ পত্রিকার অফিসে যাতায়াত শুরু করলাম। তাঁর কথায়, পাণ্ডিত্যে, রসবোধে আমি একেবারে মজে গেলাম। বারিসাবের কথা পরে আমি গঞ্জে ফেরেস্তে বইতে লিখেছিলাম। অমন একটা মানুষকে তো সারা জীবনেও ভোলা যায় না। একই সঙ্গে বড় ভীরুও ছিলেন মানুষটা। কিন্তু তাঁর কথা আর হাসির সামনে একবার পড়লে, জমে যেতে হত। আমার ভেতরের অস্থিরতা বুঝতে পারতেন বারিসাব। আমাকে উর্দু সাহিত্য পড়তে বললেন। তাঁরই কথায় আমি গোর্কি, গোগোল, পুশকিন, চেখভ, অস্কার ওয়াইল্ডের লেখা পড়তে শুরু করলাম। এঁরা সব দুনিয়ার বড় বড় লেখক। মির্জাসাব, এঁদের লেখা পড়তে পড়তেই আমি যেন আমার সামনের পথটাকে দেখতে পেলাম-আমিও লিখব, লেখাই আমার একমাত্র কাজ হতে পারে। একবার বারিসাব কী করলেন জানেন? আমাকে দিয়ে উগোর দ্য লাস্ট ডেজ অফ দ্য কনডেমড উর্দুতে অনুবাদ করালেন। দুসপ্তাহ টানা লেগে থাকলাম, এক ফোঁটা মদ ছুঁইনি। তারপর লাহোরের উর্দু বুকস্টল থেকে অনুবাদের বইও বেরিয়ে গেল-আসির কিয়ে শরগুজস্ত। আমায় দেখে কে? শালা, ফালতু নাকি? এই দ্যাখ, দ্যাখ শালারা, সাদাত হাসান মান্টোর নামে ছাপা বই।
মাসাওয়াৎ-এ আমি নিয়মিত সিনেমার রিভিও লিখতে শুরু করলাম। বারিসাবের মতে, ওই রিভিউ লেখার মধ্যে দিয়েই নাকি গল্পলেখক মান্টোর জন্ম। মির্জাসাব, আমি তখন একসঙ্গে অনেক কাজ করতে চাইছিলাম। হাসান আব্বাসের সঙ্গে মিলে অস্কার ওয়াইল্ডের নাটক ভেরা অনুবাদ করে ফেললাম। এক বোতল মদ নিয়ে গেলাম আখতার শেরানির কাছে। সারা রাত ধরে শেরানিসাব মদ খেলেন আর আমার পাণ্ডুলিপি সংশোধন করলেন। সেই সময় অনেক রাশীয়ান গল্পও অনুবাদ করেছিলাম। হুমায়ুন আর আলমগীর পত্রিকায়।
একদিন হঠাৎই বন্ধ হয়ে গেল মাসাওয়াৎ। বারিসাব লাহোরের একটা কাগজে কাজ নিয়ে চলে গেলেন। এর মধ্যে আরও কত কিছুই না ঘটেছিল। আমি, আবু সইদ কোরেশী, আব্বাস, আশিক বারিসাবকে নিয়ে অমৃতসরের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াতাম। আমাদের দলটার নাম দিয়েছিলাম ফ্রি থিংকার গ্রুপ। আমরা যা খুশি তা-ই করতে পারি, ভাবতেও পারি। বিপ্লব করার কথাও ভেবেছিলাম। আমি আর আব্বাস ম্যাপ দেখে সড়ক পথে রাশিয়াতে যাবার প্ল্যানও করেছিলাম। আমি বারিসাব লাহোর চলে যাওয়ার পর, আমি তো আবার বেকার।
লেখাতেও আর মন বসাতে পারি না। এক এক সময় মনে হয়, দূর শালা, জুয়ার ঠেকেই চলে যাই, সময়টাতো কেটে যাবে। কিন্তু জুয়া খেলার আগ্রহ আর তখন আমার ছিল না মির্জাসাব।
খবর এল, বারিসাব খুল নামে নতুন সাপ্তাহিক পত্রিকা শুরু করেছেন। আমি আর হাসান আব্বাস গিয়ে তাঁর সঙ্গে কাজে জুতে গেলাম। পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতেই বেরোল বারিসাবের প্রবন্ধ ফ্রম হেগেল টু মার্ক্স।…কী হল? আপনার সবাই এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? চোখ দেখে মনে হচ্ছে ঘুম পেয়েছে আপনাদের সকলের? মির্জাসাব, আপনারও? মাফ কিজিয়ে ভাইজানেরা, আমার বলার কথা কিস্মা, আর আমি কখন যে ইতিহাসের খপ্পরে পড়ে গেছি, বুঝতেও পারিনি। এখন আমারই হাসি পাচ্ছে। শালা, এ যেন আত্মজীবনী লিখতে বসেছি আমি। এই জন্য মাঝে মাঝে নিজেকে গালাগালি দিতে ইচ্ছে হয়, শালা শুয়ার কাঁহি কা, কবরে এসেছ তুমি আত্নজীবনী মারাতে! কিন্তু একটা কথা বলে নিতে দিন।খুলক-এর ওই সংখ্যাতেই কিন্তু আমার প্রথম গল্প তামাশা বেরিয়েছিল। গল্পতা নেহাতই কাঁচা ভেবে নিজের নাম দিইনি। সেই গল্পের বিষয় ছিল একটা সাত বছররে ছেলের চোখে দেখা ১৯১৯-এর মার্শাল আইনের দিনগুলো। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, ১৯১৯-এ আমার বয়সও ছিল সাত। আমার আফসানার ভেতরে এভাবেই আমি বারবার মিলেমিশে গেছি।
