এরপর একদিন উড়ন্ত সিংহাসনে চড়ে ফিরোজ শাহ, বেনজির আর নাজম-উন-নিসা চলল বদর-ই-মুনিরের কাছে। বেনজির ফিরে এসেছে শুনে তো নবাবজাদি অজ্ঞানই হয়ে গেল। জ্ঞান ফিরলে নাজম-উন-নিসা তাকে বলল, বেনজিরকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেবার জন্য অন্য একজনকে বন্দি করে নিয়ে এলাম আমি। দেখি, এবার কীভাবে তাকে ফেরত পাঠানো যায়। এরপর? সারা রাত ধরে চলল দুজোড়া কপত-কপতীর বকবকম। কথা যেন শেষই হতে চায় না। কথা যে কত বড় ফাঁদ, তা যদি মানুষ বুঝত, মান্টোভাই!
বদর-ই-মুনিরের ওয়ালিদ মাসুদ শাহকে এরপর চিঠি লিখে নিজের পরিচয় জানাল বেনজির, নিকাহর প্রস্তাবও পেশ করল। নবাব তা সানন্দে মেনে নিলেন। মাসুদ শাহর নগরী আনন্দে মেতে উঠল। একদিন ধুমধাম করে বেনজির ও বদর-ই-মুনিরের বিয়েও হয়ে গেল। কেমন হয়েছিল সে বিয়ে? ভাইজানেরা, কতদিন কবরে শুয়ে আছি, সে – ভাষা ভুলিয়া গেছি। এরপর বেনজিরের অনুরোধে নাজম-উন-নিসার বাবাও ফিরোজ শাহর সঙ্গে বিয়েতে মত দিলেন। উড়ন্ত সিংহাসনে চড়ে ফিরোজ শাহ তার বিবিকে নিয়ে নিজের দেশে ফিরে গেল। বেনজিরও তার বিবিকে নিয়ে নিজের শহরে ফেরার প্রস্তুতি শুরু করল।
কেমন লাগল ভাইজানেরা, আমাদের দুজনের বদনসিবি কিস্সার মাঝখানে মধুর মিলনে এই গল্পটা? কিন্তু মসনবিটা লিখে মীর হাসান কী পেলেন? কিছু না। শুধু এতদিন পর, এই কবরের অন্ধকারে, আমি আপনাদের এই হিকায়ৎটা শোনাতে পারলুম। কবির নসিবে এ ছাড়া আর কী জোটে, বলুন?
১২. একেবারে নরক গুলজার করে দিলেন
হর কদম দূরী-এ মঞ্জিল হৈ নুমায়াঁ মুঝসে,
মেরী রফ্তার-সে ভাগে হই বয়াবাঁ মুঝ সে।।
(প্রতি পদক্ষেপে গন্তব্যে সুদূরতা আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে,
আমার চলাকে পিছনে ফেলে জনশূন্য বনভূমি এগিয়ে চলে আরও জোরে।)।
কেয়া বাত মির্জাসাব, একেবারে নরক গুলজার করে দিলেন। কিন্তু বেনজির ও বদর-ই মুনিরদের গল্পরা সব কোথায় হারিয়ে গেল বলুন তো? দেখছেন, আমাদের ভাইজানেরা একসাথে কেমন সব চনমনে হয়ে উঠেছেন, যেন আজিজের হোটেলে আমাদের টেবিলে প্লেটে প্লেটে শাহি কাবাব এল, এবারই তো জমবে মজা, কাবাবে-গাঁজায়, রঙ্গরসিকতায়। সেই সময় আমাদের ক্যাপ্টেন ওয়াহিদ যেন কোন একটা মেয়ের পেছনে পড়ে গিয়েছিল, ভাল কথা, কিন্তু একটা মেয়ের জন্য সব সময় দিবানা ভাব করে বসে থাকার কোনও মানে আছে, মির্জাসাব?। ক্যাপ্টেনের সব সময় ভয়, মেয়েটা যদি অন্য কারও সঙ্গে ভেগে যায়। আরে যায় তো যাবে, দুনিয়ায় মাগী কি কম আছে? মাফ করবেন মির্জাসাব, কখন যে মুখ ফসকে কোন শব্দ বেরিয়ে যায়। এই রকম বেফাঁস শব্দ বেরিয়ে পড়লেই, ইসমত সামনে থাকলে চোখ বড় বড় করে তাকাত, ইসমতই ছিল সেই মেয়ে, যে আমার পাঞ্জাবি ঝাঁকিয়ে বলতে পারত, আরে শালা, মাগী কাকে বলছিস রে? তুই কোন মাগীর পেট থেকে পড়েছিস? এ সব অবশ্য কখনও বলেনি। ইসমতের আখলাকির তো তুলনা ছিল না, শুধু ওই চোখ বড় বড় করে তাকানো, তাতেই যা বোঝার বুঝে নাও। যাকগে, ইসমতের কথা বাদ দিন, এরা আবার সবাই আজিজের জাহান্নামের কিস্স শোনার জন্য চুলবুল করছে দেখতে পাচ্ছেন তো?
তো, একদিন আমাদের ক্যাপ্টেন ঝড়ে ভাঙা লতার মতো টেবিলে এলিয়ে পড়ে আছে, কয়েক দিন ধরে নাকি মেয়েটার সাথে দেখা হচ্ছে না। কত চাঙ্গা করার চেষ্টা করি, তবু সে শালা কেন্নোর মত গুটিয়ে পড়ে থাকে, হাসি-মস্করা-খিস্তি কিছুই তাকে ছুঁতে পারে না। এ কোন মজনু রে বাবা, অথচ নাম দেখো, ক্যাপ্টেন ওয়াহিদ। অনেক চেষ্টার পর কাঁদো কাঁদো মুখে জিজ্ঞাসা করল, সাদাতভাই, মেয়েরা কেমন হয় গো?
-মানে?
-ওরা কি ভালবাসতে জানে?
-তার আমি কী জানি? আমার মেজাজ চরে গেল।
-আরে ইয়ার বলই না। আশিক আমার পিঠে চাপড় মেরে বলল, তোমার সেই বেড়ালের গপ্পোটা ক্যাপ্টেন কে বলে দাও। তাহলে আর সারা জীবন একটা মেয়ের পিছনেই ল্যাং ল্যাং করবে না।
আশিকের কথায় আমাদের টেবিলে হাসির হল্লা উঠল। ক্যাপ্টেন ছলোছলো চোখে বলল, আমি তো মেয়েদের কথা জিজ্ঞেস করেছি। বেড়ালের কথা আসছে কোথা থেকে?
-মান্টোর কাছেই শোনা। আশিক আমার দিকে তাকিয়ে চোখ মারে। মানে, বলো, তাড়াতাড়ি বলো। শালা ক্যাপ্টেনের আশনাই-এর ঝাড়ে বাঁশ যাক। আশিক ছিল সবার পেছনে লাগতে ওস্তাদ।
ক্যাপ্টেনের পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বললাম, দ্যাখো ক্যাপ্টেন, আল্লার কসম খেয়ে বলছি বেড়াল আর মেয়েদের আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না।
-কেন? বেড়াল তো বেড়াল আর মেয়েতো মেয়েই। না-বোঝার কী আছে এতে?
-আমাদের বাড়িতে একটা বেড়াল ছিল, বুঝলে। বছরে একবার করে সে যে কী কান্না জুড়ে দিত, কী বলব ভাই। বেড়ালের কান্না শুনেছ তো? মনে হয় যেন পৃথিবীটাই কারবালা হয়ে গেছে। তার কান্না শুনে কোথা থেকে হাজির হত এক হুলো। তার পর দুজনের ঝগড়া, মারামারি, রক্তারক্তি পর্যন্ত হয়ে যেত।
-তারপর?
-তারপর আবার কী? বেড়াল এরপর চারটে বাচ্চার মা হয়ে যেত। এত কান্না, মারামারির নিট ফল ওই চারটে বাচ্চা।
-তুমি শালা একটা হারামির বাচ্চা। বলতে বলতে ক্যাপ্টেন আবার টেবিলের ওপর এলিয়ে পড়ল। আজিজের হোটেল তখন হাসি-সিটিতে ফেটে পড়ছে।
