হ্যাঁ, তারপর কী হল, বলি। সেদিনই বদর-ই-মুনিরের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হল বেনজিরের। মীরসাবের সেই শেরটা মনে পড়ছে,
গরমিয়াঁ মুত্তসিল রহেঁ বাহম
নে তসাহিল হো, নে তগাফিল হো।।
(এসো আমরা পরস্পরে আসক্ত থাকি চিরদিন
না যেন আগ্রহ হারাই, না আসে উদাসীনতা।)
বদর-ই-মুনির তো বেনজিরের রূপ দেখে মূছা গেল। তখন উজিরের মেয়ে, তার বন্ধুনি, নাজোম-উন-নিসা সে-ও অসামাণ্য সুন্দরী, গোলাপ জল ছিটিয়ে নবাবজাদির জ্ঞান ফিরিয়ে আনল। কিন্তু জ্ঞান ফিরে পেয়ে নবাবজাদি কপট রাগ দেখিয়ে বলল, কে আমার বাগানে এসে এই ভাবে ঢুকল? আসলে ওই কথার ভেতরে তো তখন অন্য এক আগুন জ্বলছে। প্রথম প্রেমে তো এরকমই হয়, না কি? চলল মান-অভিমানের পালা। পরস্পরের দিকে নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকা। তারপর বেনজির তার সব কথা- পরি মাহরুখের কাছে বন্দি হওয়ার কথাও বলল নবাবজাদিকে। তখন বদর-ই-মুনির কী বলল জানেন? বলল, আমি তোমাকে কারও সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারব না। তুমি পরির কাছেই থাকো গিয়ে,এখানে আর এসো না। বেনজির নবাবজাদির পা জড়িয়ে ধরে বলল, মাহরুখ আমাকে ভালবাসে কি না, তা আমি জানতেও চাই না। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না। কিন্তু এবার আমাকে ফিরে যেতেই হবে। যদি ছাড়া পাই তবে কাল আবার এই সময় আসব। আমার দিল আমি তোমার কাছেই রেখে যাচ্ছি, শুধু এই শরীরটা ফিরে যাবে মাহরুখের বন্দিশালায়।
পরদিন বেনজিরের আসার জন্য সব কিছু ঠিকমতো প্রস্তুত হল। বদর-ই-মুনির এমনভাবে সাজল, যেন সেদিনই তার নিকাহ্। ফুলে-ফুলে,আতরের গন্ধে ভরে উঠল ঘর। পানপাত্র, সুরা,খাবার-সব প্রস্তুত। বিছানায় মাথার কাছে রাখা হল ফারসি কবি জুহুরি আর নাজিরির কবিতার কিতাব। বেনজিরও যথাসময়ে এল। খানিক কথাবার্তার পর দুজনে বিছানায় গেল পান করতে করতে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরল। এ সব কথা তো বলে শেষ করা যায় না। ঘর থেকে ওরা যখন বেরিয়ে এল,বেনজির তখন আরও ঝকঝক করছে,আর বদর-ই-মুনির লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠেছে। কিন্তু সময় এগিয়ে এল, বেনজিরকেও ফিরে যেতে হল। এভাবেই চলতে লাগল দিনের পর দিন।
কিন্তু সুখের দিন তো বেশিদিন সয় না মানুষের জীবনে। পরি মাহরুখ সব কথা গেল জেনে গেল, একদিন নিজের চোখে সব দেখেও এল। সেদিন বেনজির ফিরতেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল মাহরুখ। তার মুখ থেকে আগুন বের হতে লাগল, শাস্তির জন্য প্রস্তুত হও বিশ্বাসঘাতক। এক জিনকে ডেকে মাহরুখ বলল, মরুভূমিতে নিয়ে গিয়ে একে শুকনো কুয়োর মধ্যে ফেলে দাও, কুয়োর মুখ ঢেকে দিও পাথর দিয়ে। দিনে একবার জিন তাকে সামান্য খাবার দিয়ে। আসত। অন্ধকার, শুকনো কুয়োয় বেনজিরের আর এক বন্দিজীবন শুরু হল। আর এদিকে বদর-ই-মুনির দিনের পর দিন বেনজিরের জন্য অপেক্ষা করতে করতে যেন পাপড়ি-ঝরা ফুল এক। সে ফুলের দিকে কি তাকানো যায়? দিনের পর দিন তার কেটে যায় না ঘুমিয়ে। তারপর একদিন ঘুম এল আর সেই ঘুমের ভেতরে স্বপ্নে সে দেখতে পেল মরুভূমির মধ্যের কুয়োটাকে। কুয়োর ভিতর থেকে ভেসে আসছে বেনজিরের ডাক। ঘুম ভেঙে গেল তার। বন্ধুনী নাজম-উন-নিসা স্বপ্নের কথা শুনে বলল, আর কেঁদো না তুমি। আমি মরুভূমিতে গিয়ে বেনজিরকে নিয়ে আসব। আমি বেঁচে থাকলে বেনজিরকে তুমি পাবেই। সাধুর বেশে হাতে বীণা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল নাজম-উন-নিসা।
একদিন পূর্ণিমার রাতে মরুভূমিতে বসে বীণা বাজাচ্ছিল সে। তার বীণা শুনে পশু-পাখিরা ঘুম ভুলে গেল, গাছের মাথায় হাওয়া খেলতে লাগল, আর চাঁদ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। ঠিক তখনই সেই পথ দিয়ে উড়ন্ত সিংহাসনে চড়ে যাচ্ছিল জিন রাজপুত্র ফিরোজ শাহ। সে নীচে নেমে এসে নাজমকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল, বুঝতে পারল সাধুর বেশে এ আসলে এক রূপসী। ফিরোজ শাহ তার পরিচয় জানতে চাইল। নাজম ফিরোজের মুগ্ধতা বুঝতে পেরে। বলল, আল্লার দিকে মন ফেরান, না হলে ফিরে যান। ফিরজ বলল, হ্যাঁ, ফিরে যাব, শুধু। একবার আপনার বাজনা শুনতে চাই। নাজমের বীণা শুনতে শুনতে ভোর হয়ে গেল আর ফিরোজ শাহ, অমন এক মরদ, হাউ হাউ করে কাঁদছে। মেয়েরা কী না পারে, মান্টোভাই! এরপরে কী হল জানেন? উড়ন্ত সিংহাসনে চড়িয়ে ফিরোজ শাহ নাজাম কে তার বাবার দরবারে নিয়ে গেল। জিনরাজার অনুরোধে বীণাও বাজাতে হল নাজমকে। তার বাজনা শুনে কেউ। চোখের জল ধরে রাখতে পারেনা। আর ফিরোজ শাহ? সে বুঝল, এ নারীকে ছাড়া আমার জীবন বাতিল হয়ে যাবে। নাজম জিনরাজার প্রাসাদেই থেকে গেল আর ফিরোজ কে নিয়ে বেশ খেলতে লাগল। এই ফিরোজের প্রতি সে গদগদ, পরক্ষণেই ঠান্ডা। একদিন ফিরোজ তার। পায়ে পড়ে গেল, কেন আমাকে এত কষ্ট দিচ্ছ? তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না। নাজম দেখল, এই তো সুযোগ সে হেসে বলল, আমি যা বলছি, মন দিয়ে শোনো, কাজটা করতে পারলে তোমারও লাভ হতে পারে। নাজম তখন সব কথা খুলে বলল।
-আমি কী করব বলল।
-তুমি তো জিন। মাহরুখ কোথায় বেনজিরকে বন্দি করে রেখেছে, তা তুমি ইচ্ছে করলেই জানতে পারো। তুমি সাহায্য করলে বেনজিরও বাঁচবে, তুমিও যা চাও, তাই পাবে।
ফিরোজ শাহের নির্দেশে জিনেরা দিকে দিকে দিকে বেরিয়া পড়ল বেনজিরের খোঁজে। কিছুদিন পর এক জিন খোঁজ নিয়ে ফিরল। ফিরোজ শাহ কড়া ভাষায় মাহরুখকে খৎ লিখে পাঠাল, বেনজিরকে মুক্তি না দিলে কঠিন শাস্তি পেতে হবে তাকে। আর শপথ করতে হবে, কখনও কোনও মানুষের সঙ্গে সম্পর্কে তৈরি করবে না সে। মাহরুখ তার দোষ স্বীকার করে অনুরোধ জানাল, তার বাবাকে যেন কিছু না জানানো হয়। এভাবেই শেষ পর্যন্ত মুক্তি পেল বেনজির।
