বেনজিরের বারো বছরের জন্মদিনে নবাব মালিক শাহ ঘোষণা করলেন, আজ নবাবজাদা শহর পরিক্রমায় বেরোবেন। সুন্দরী দাসীরা সুগন্ধী তেল মাখিয়ে বেনজিরকে স্নান করাল,তারপর এমন ভাবে তাঁকে সাজিয়ে তুলল, যেন উস্তাদ বিঞ্জাদের তুলি দিয়ে আঁকা ছবি। বেনজির প্রাসাদ থেকে বেরোতেই তার মাথায় মুক্তা বৃষ্টি শুরু হল আর তারপর সেই মুক্তো কে কতটা হাতিয়ে নিতে পারে তাই নিয়ে চলল মারামারি,কাজিয়া। নগরীর সব হাভেলি, দোকান সাজানো হয়েছিল মসলিনের নকশাদার কাপড় দিয়ে। আর লাগানো হয়েছিল বড় বড় আয়না, সূর্যের আলো যার ওপর পড়ে সাত রং ছড়িয়ে দেবে চারদিকে। তেমনই শোভাযাত্রার ছবিও ফুটে উঠবে আয়নায়। সত্যিই, নবাবজাদার প্রথম শহর-পরিক্রমা সবার মনে সোনার জলে আঁকা ছবির মতোই রয়ে গেল।
কিন্তু হিসেবে একটা ভুল হয়েছিল, যা নবাব এবং কারোরই খেয়াল ছিল না। বিপদের বারো বছর শেষ হতে তখনও এক রাত বাকি। সেদিন ছিল পূর্ণিমার রাত, চাঁদের আলোর জোয়ার লেগেছে, আর এদিকে সারা দিনের হৈহল্লার পর বেনজিরেরও বেশ ঘুম পেয়ছে। এমন পূর্ণিমার রাতে প্রাসাদের ছাদে ঘুমোবার সাধ হল তার। ইনশাল্লাহ, এই হচ্ছে নিয়তির লিখন, মান্টোভাই। কখন যে আপনার কোন সাধ হবে, কিছুই জানেন না আপনি, আর তা যে আপনাকে কোন খুমারে নিয়ে যাবে কে জানে! তো ছাদেই নবাবজাদার বিছানা তৈরি হল, চাঁদের নরম আলো আর ফুলের খুশবুর আদরে ঘুমিয়ে পড়ল বেনজির। নজর রাখার জন্য নবাবজাদাকে ঘিরে বসেছিল অনেক দাসদাসী। কিন্তু হঠাৎ কোথা থেকে মিঠে গন্ধ ছড়িয়ে ভেসে এল ঠাণ্ডা হাওয়া আর সেই হাওয়ার ছোঁয়ায় ঘুমিয়ে পড়ল সবাই। শুধু চাঁদ আকাশ থেকে দেখছিল, বেনজির জীবনে কী ঘটতে চলেছে।
ওই ঠাণ্ডা হাওয়া কে নিয়ে এসেছিল জানেন, ভাইজানেরা? এক পরি। সে তখন রাতের আকাশে উড়ন্ত সিংহাসনে চড়ে ঘুরতে বেড়িয়েছিল। এই পরির কথাটা একটু বলে নিতে দিন, মান্টোভাই। এখানে অনেকেই আছেন, যাঁরা আমার আসার বহুদিন পরে কবরে এসেছেন, তাঁরা পরি বলতে বোঝেন ফিনফিনে ডানা লাগানো সুন্দরী। ওসব হচ্ছে গোরাদের কল্পনা। ফারসিতে আমরা পরি কাকে বলি জানেন? এক অনৈসর্গিক আত্মা, সুন্দরী নারী সেজে সে পুরুষের জীবনে হাজির হয়। কেন জানেন? প্রেমের ছলনায় ভুলিয়ে সেই পরি পুরুষকে আসলে বন্দি করে রাখতে চায়। নিজের মর্জি মতো চালায়, তার হুকুম অমান্য করা মানেই মৃত্যু। মাঝে মাঝে মনে হয়, প্রেম তো এভাবেই আসে আমাদের জীবনে,এক-একটা প্রেম মানে এক একটা মৃত্যু; মান্টোভাই, মনে হয় না,আমরা যেন অনাদি,অনন্তকাল ধরে এক-একজন পরির হাতেই বন্দি হয়েই আছি? যাক, এইসব বখোয়াস বাদ দিন।
পরির নাম ছিল মাহরুখ। আকাশ থেকে বেনজিরের রূপ দেখে তার চোখ তো কপালে উঠল। এমন সুন্দর পুরুষ দুনিয়ায় আছে নাকি? কিন্তু আছে তো, দেখাই যাচ্ছে। তাহলে? আরে, একে তো আমার চাই, একে না বন্দি করতে পারলে আমি কেমন পরি? মাহরুখ ছাদে এসে নামল; তার মনে হল, পূর্ণিমার চাঁদের আলো নয়, বেনজিরের রূপের আলোতেই এমন মায়াবি হয়ে আছে আজকের রাত। ঘুমন্ত বেনজিরের ঠোঁটে সে ঠোঁট ঠেকাল। তারপর? তারপর উড়িয়ে নিয়ে চলল তার পরিস্থানে।
ঘুম ভেঙ্গে দাসদাসীরা দেখল, নবাবজাদা উধাও। কোথায় সে? সারা প্রাসাদ,বাগান খুঁজেও পাওয়া গেল না। নবাব ও বেগমরা তো এসে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। শুধু কি তাই? গাছপালা ফুল-পাখি-ঝরনা, সবাই কাঁদতে লাগল। আহা এমন সাধের নবাবজাদা কোথায় হারিয়ে গেলেন? কে নিয়ে গেল তাকে? সারা দেশ খুঁজেও বেনজিরের হদিশ পাওয়া গেল না, বুঝতেই পারছেন।
পরি মাহরুখের দেশে বন্দি হয়ে রইল বেনজির। বছরের পর বছর কেটে গেল,তবু সে তার শহরের কথা ভুলতে পারল না। মাহরুখ সব কিছু দিয়ে তাকে ভোলানোর চেষ্টা করেও কিছু হল না। তখন একদিন সে বেনজিরকে এসে বলল, তুমি আমার কাছে বন্দি, তা তো জানো?
-জানি।
-তা হলে আমার কথা মেনে চলো।
-আমাকে আমার বাড়িতে নিয়ে চলো।
-তা হবে না। তবু তোমাকে সব সময় এমন মনমরা দেখলে আমারও খুব কষ্ট হয় গো বেনজির। আমি যে তোমাকে ভালবাসি।
– তা হলে আমার বাড়িতে নিয়ে চলো। বেনজির মাহরুখের চেপে ধরে।
মাহরুখ হেসে ওঠে। – বন্দির আর ফেরবার উপায় থাকেনা বেনজির। তবে কিনা একটা ব্যবস্থা হতে পারে। রোজ সন্ধেবেলা আমি যখন আব্বাজানের সঙ্গে দেখা করতে যাই তখন তুমিও একটু এদিক-ওদিক ঘুরে আসতে পারো। আমি তোমাকে একটা জাদুঘোড়া দিতে পারি। সেই ঘোড়ায় চেপে ঘন্টা তিনেক তুমি ঘুরে ফিরে এলে, তাতে মন ভাল থাকবে। যেখানে যেতে চাও, জাদুঘোড়া তোমাকে নিয়ে যাবে। কিন্তু তোমাকে লিখে দিতে হবে, যেখানেই যাও,তোমার দিল তুমি আর কাউকে দেবে না আর এমনটা যদি ঘটে তাঁর জন্য উপযুক্ত শাস্তি পাবে তুমি। মনে রেখো,আশ্নাই আমাদের যাই হোক,তুমি আমার বন্দি।
বেনজির মেনে নিল মাহরুখের কথা। না মেনে উপায়ই বা কী? পরির দেওয়া জানেন না তো ভাইজানেরা, সে দোজখের চেয়েও ভয়ঙ্কর। এক রাতে জাদুঘোড়ায় চেপে ঘুরতে ঘুরতে নীচে একটা সুন্দর বাগান দেখতে পেল বেনজির। আর সেই বাগানের ভেতরে চাঁদের আলোয় ঝকমক করছিল অপূর্ব এক প্রাসাদ। বেনজির বাগানে নেমে গাছের আড়ালে লুকিয়ে দেখতে থাকল, কেউ কোথাও আছে কি না। কিছুক্ষণ পরে একটা ঝরনার পাশে কয়েকজন সুন্দরীকে দেখতে পেল সে। আর কী দেখল জানেন? যেন নক্ষত্রদের একেবারে মাঝখানে ভরা আলোর চাঁদ। সে আর এক নবাব মাসুদ শাহর নবাবজাদি বদর-ই-মুনির। মসলিনের পোশাকের ভেতর থেকে তার রূপ ফুটে উঠছিল যেন বাতিদানে জ্বলা মোমবাতির মতো। বেনজির আর চোখ ফেরাতে পারে না। তখন মনে পড়ল, পরি মাহরুখের কথা। তোমার দিল কাউকে দেবে বেনজির। কিন্তু বেনজির কী করে? দিল্ তো সে দিয়েই ফেলেছে প্রথম দেখাতেই। আমাদের জীবনে এমনটাই ঘটত ভাইজানেরা। চোখে চোখ পড়ল তো আশনাই-এর আগুন জ্বলে উঠল। কেন জানেন? আসলে তো বন্দির মতোই জীবন কাটত আমাদের। সেই জীবনে মহব্বত আর নিকাহ্-এর মধ্যে কোনও সম্পর্ক ছিল না। মহব্বত মানেই তো গুনাহ্। মেয়েদের জায়গা জেনানামহলে, ভাই-বেরাদর ছাড়া কারও দিকে তাকানো যাবে না। আর পুরুষ তো কোনও নারীকে দেখতে পেত না। তাই একবার কোনও জোড়া চোখ পরস্পরের দিকে তাকালেই হয়ে গেল। মহব্বত,গুনাহ্।ও সব যেন না হয়। তাই যত তাড়াতাড়ি পারো বিয়ে দিয়ে দাও।কিন্তু তাতে কী হয়েছে? পুরুষকে যেতে হয়েছে কোঠাবাড়িতে, আর বেগমরা গোপনে গোপনে আশনাই চালিয়ে গেছে। প্রবৃত্তি, মান্টোভাই, প্রবৃত্তি-কে ঠেকাতে পারে? মীরসাবকে কেউ ঠেকাতে পেরেছিল? পারেনি বলেই তাঁকে পাগল বানিয়ে ছাড়া হয়েছিল। সমাজ তো এটাই পারে মান্টোভাই, যখনই তোমাকে মেনে নিতে পারবেনা, তোমার গায়ে পাগলের ছাপ্পা মেরে দেবে। তখন তুমি সব তমদুনের বাইরে। বোবা, কালা, ভাষাহীন।
