এই হিকায়ৎ-এর নাম শির-উল-বয়ান। হ্যাঁ, একেবারে মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো গপ্পো। দেখলেন মান্টোভাই, সবাই আবার উঠে বসতে শুরু করেছেন। মসনবিটা লিখেছিলেন মীর হাসান। সওদা যাঁকে নিয়ে মজা করতেন, সেই মীর জাহিকের ছেলে মীর হাসান। আমার জন্মেরও সত্তর বছর আগে পয়দা হয়েছিলেন। তবে দিল্লি ছেড়ে ফৈজাবাদে চলে গিয়েছিলেন; যাবার অবশ্য ইচ্ছে ছিলনা তাঁর, আশিক ছিল কিনা দিল্লিতে; কিন্তু কী আর করবেন, পেটের ধান্দা আর প্রেম, ও-দুটো তো আবার হাত ধরাধরি করে চলে না। শুনেছি, ফৈজাবাদেও খুব একটা ভাল জীবন কাটেনি হাসানসাবের, কষ্টেসৃষ্টে দিন চলত। তবে কিনা মসনবি লেখায়। একেবারে মাস্তান লোক ছিলেন। শির-উল-বয়ান এতোটাই বিখ্যাত হয়েছিল যে ওটার নাম হয়ে গিয়েছিল মীর হাসানের মসনবি। এই মসনবি কিন্তু আসলে একটা হিকায়ৎ,আকাশে বাতাসে-লোকের মুখে মুখে ভেসে বেড়াত বলে শুনেছি। ভাবুন, সেই হিকায়ৎ-ই হয়ে গেল মীর হাসানের মসনবি।
মালিক শাহ নামে এক নবাব ছিলেন। কোথায়? তা বলতে পারব না। ধরে নিন না কেন, হয়তো আয়নার মধ্যে ছিল তাঁর এক অপরূপ নগরী। কেমন দেখতে ছিল সেই নগরী? ভাষা দিয়ে নাকি তা প্রকাশ করা যায় না। ভোরের আজানের কথা ভাবুন, সেইরকম সুন্দর।
ঝকঝকে সব রাস্তা, দুধের মতো সাদা সব বাড়ি, আর মাঝে মাঝে নানা রকম ফুলের বাগিচা, আর বাগিচা মানেই তো কতরকম পাখি আর তাদের গান। সেই নগরীতে নাকি এমন সব বাজার ছিল,যেখানে ঢুকলে আপনার আর বেরোতেই ইচ্ছে করবে না, যেন বাজার নয়,কোনও শিসমহলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আপনি।এমন যে-নগরী, সেখানে নবাবের দুর্গটি কেমন হবে কল্পনা। করে নিন। হ্যাঁ,ভাইসব, একটু কল্পনা করে নিতে হবে, হিকায়ৎ-এর এমনটাই দস্তুর।
নবাবের মনে বড় দুঃখ, তাঁর কোনও ছেলে নেই।এন্তেকাল এলে কাকে সিংহাসনে বসিয়ে। যাবেন?একদিন সব উজিরদের ডেকে বললেন, এইবার আমাকে দুনিয়া ছেড়ে যেতে হবে।
-কেন,জাঁহাপনা? সবাই হাঁ-হাঁ করে ওঠে।
-এত ধনসম্পদ নিয়ে আমি কী করব বলুন? কার জন্য রেখে যাব? এত দিন মন দিয়ে রাজত্ব করেছি, খোদার পথের দিকে তাকানোর ফুরসৎ ছিল না আমার। আর নয়। নবাবি ছেড়ে দিয়ে আমি এখন তাঁর পথেই যেতে চাই।
উজির-এ-আজম বললেন, এ আপনি ভুল ভাবছেন নবাব খোদা তো আপনাকে রাজত্ব চালানোরই দায়িত্ব দিয়েছেন। আপনার জন্য এটাই তো খোদার পথ। এই দায়িত্ব আপনি না সামলালে কেয়ামতের দিনে কী জবাব দেবেন, হুজুর?
-কিন্তু আমার পর কে এই রাজ্যপাঠ দেখবে?
-কে বলেছে আপনার ছেলে হবে না? ব্রাহ্মণ-জ্যোতিষীদের ডেকে পাঠাচ্ছি। ওনারা এসে গণনা করে দেখুন।পরের কথা পরে ভাবা যাবে।
উজির-এ আজমের কথা মেনে নিলেন নবাব। এলেন ব্রাহ্মণেরা,জ্যোতিষীরা, শুরু হল নবাবের ভাগ্য গণনার কাজ। শেষে সবাই একবাক্যে রায় দিলেন, নবাবের বেগম ছেলে পয়দা করবেনই করবেন।বিধির এই লিখন কেউ খণ্ডাতে পারবেনা। সওদা সেখানে থাকলে হয়তো মজা করে বলতেন,বিধির লিখন কোথায় লুকোনো আছে, একবার দেখাতে পারেন? পাজামার তলায়? ব্রাহ্মণেরা জানালেন, চাঁদের মতোই সুন্দর ছেলে আসবে বেগমের কোলে। কিন্তু একটা কথা আছে। কী? না, বারো বছর পর্যন্ত ছেলেকে একবারে আগলে রাখতে হবে। বারো বছরের মধ্যে এমন কোনও ফাঁড়া আছে,যাতে নবাব ছেলেকে হারাতে পারেন।
-কী বলছেন আপনারা? নবাবের মুখ তো কালো হয়ে গেল।
-না, না, আমরা নবাবজাদার মৃত্যুর কথা বলছি না।তবে কিনা, কোনও ভাবে হারিয়েও যেতে পারেন।
তাই সব সময় চোখে চোখে রাখতে হবে হুজুর।
-আপনাদের কথা মতোই ব্যবস্থা হবে।কিন্তু কী করতে হবে?
-বারো বছর প্রাসাদের বাইরে যাওয়া চলবে না। এমনকী ছাদেও নেই।
-কেন?
-মনে হচ্ছে, কোনও পরি নবাবজাদার প্রেমে পড়বেন।
-আর?
-নবাবজাদা প্রেমে পড়বেন অন্য এক সুন্দরীর।
ভাবুন একবার মান্টোভাই, ছেলের জন্মই হল না, তার আগেই শুরু হয়ে গেল আশনাই নিয়ে কথাবার্তা। কী ভাইজানেরা, মজা জমেছে? এবার দেখুন না, মাথা ঘুড়িয়ে দেওয়ার মতো আরও কত কান্ড ঘটবে। আশনাই-এর কথা দিয়ে যার শুরু,সেই খেলা কি সহজে থামবার? তো বছর ঘোরবার আগেই নবাবের এক বেগম ছেলে পয়দা করলেন। আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠলো সারা নগরী। হাফিজসাবের সেই শেরটা শুনুন:
শিগুফতা শুদ গুলে হম্রা
ব গশং বুলবুল মস্ত
সদা এ শর খুশি ঐ
আশিকানে বাদা পরস্ত।
(বাগানে ফুটেছে রক্ত গোলাপ,
মাতোয়ারা হল বুলবুল সব;
হে সুরাপ্রেমিক কোথায় তোমরা
তোলো চারিদিকে আনন্দরব।)
আর ছেলের নাম কী রাখা হল জানেন? বেনজির। প্রজাদের অকাতরে ধনসম্পদ বিলোলেন নবাব। ছদিন ধরে সারা নগরী জুড়ে চলল নাচা-গানা-খানা-পিনা-মৌজ-মস্তি।এমনকী, নবাব আনন্দে অনেক ক্রীতদাসকে মুক্ত করেও দিলেন। এই-ই হচ্ছে নবাবী। জাঁহাপনা জাফরের সময় আর নবাবি কোথায়? ও তো ভিখিরির একবেলার পোলাও খাওয়া।
নবাবজাদার জন্য বাগান-ঘেরা নতুন প্রাসাদ তৈরি হল। অতুলনীয় সে প্রাসাদ, বাগানে সাইপ্রেস ও অন্যান্য গাছ, পাখিদের গানে গানে মশগুল। কত যে দাসদাসী ঘিরে থাকত বেনজিরকে। কেন না নবাবজাদাকে চোখের আড়াল করা চলবে না। কয়েক বছরের মধ্যে লেখাপড়া, ঘোড়ায় চড়া, তীর-ধনুক চালানো, গান-বাজনা, ছবি আঁকা, বন্দুকবাজিও শিখে ফেলল বেনজির। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হল, তার মনটি ছিল বড় ভাল, দাসদাসীরা যেন তার ভাই বোন,আত্মীয়স্বজন নবাবজাদার নামটি সার্থক কি না বলুন, ভাইসব? সে যেন সত্যিই হাফিজসাবের বলা সেই রক্তগোলাপ, যে সৌরভ ছড়াতেই এই দুনিয়াতে এসেছে।
