সে এক দিন গেছে ভাইজানেরা। পড়াশুনো তো ডকে উঠল; আমি ভিড়ে গেলাম জুয়াখেলার আড্ডায়। কর্তা জামাল সিং-এ ছিল দেনু আর ফজলুর জুয়ার ঠেক। সেখানে ফ্ল্যাশ খেলতাম আমি। প্রথমে নবিশ থাকলেও, ঘাঁতঘোঁত সহজেই বুঝে নিলাম, আমার দিন-রাত কেটে যেতে লাগল জুয়ার ঠেকে। কতদিন যে এভাবে চলেছিল, কে জানে। একদিন খুব বোর হয়ে গেলাম জানেন। নিজেকে নিয়ে সব সময় বাজি ধরা বিরক্তিকর লাগল। আমি তাহলে কেউ নই? শুধু এমন একটা মাল, যাকে নিয়ে বাজি ধরা যায়? ঠিক করলাম, বেশ, চলো মান্টো, এবার তা হলে অন্য পথে যাওয়া যাক। জীবনে পথ তো আর একটা নয়। এবার না হয় অন্য পথেই হেঁটে। দ্যাখো। কিন্তু কী করব? জুয়ার ঠেক ছেড়ে কোথায় যাব? রাস্তাই আমাকে জায়গা দিল, এ-পথ থেকে সে-পথ, এ-গলি থেকে ও-গলি, আমি খোয়বের ঘোরে ঘুরে বেড়াই, রাস্তার কুকুরদের সাথে ভাব হয়ে গেল, ওদের সঙ্গে বসে থাকতাম, আদর করতাম, ওরা আমার গা চেটে দিত। কবরস্থানগুলোতে ঘুরে বেরিয়েছি, ফকিরদের পাশে বসে কত গল্প শুনেছি, মির্জাসাব, সে-সব। গল্প হারিয়ে গেছে, আমি লিখতে পারি নি।
এর আগেই ১৯১৯-এ জালিয়ানওয়ালাবাগে সেই হত্যাকাণ্ড ঘটে গেছে। তখন আমার বয়স সবে সাত। কিন্তু আমি দেখেছিলাম, সারা পাঞ্জাব জেগে উঠেছে, অমৃতসরের পথে পথে মিছিল, স্লোগান। ভগৎ ছিলেন আমার আদর্শ। আমার পড়ার টেবিলে ভগৎ সিংয়ের একটা ছবি ছিল। পথে পথে যখন ঘুরে বেড়াচ্ছি, তখন একদিন জালিয়ানওয়ালাবাগের একটা গাছের তলায় বসে মনে হয়েছিল, পৃথিবীটাকে এমনভাবে তছনছ করে দেওয়া যায় না, যাতে টমিগুলো আমাদের ওপর আর নির্বিচারে গুলি চালাতে না পারে? জানেন মির্জাসাব, বেশ কয়েকবার বোমা তৈরির কথাও ভেবেছিলাম। শালা অমৃতসর উড়িয়ে দেব, সাদা শুয়োরের বাচ্চাগুলোকে দেশ ছাড়া করবই। বালা, আশিক, ফকির হুসেন, ক্যাপ্টেন ওয়াহিদ, জ্ঞানী অরুর সিংদের এইসব কথা বলতাম। ওরা হো হো করে হাসত। সব দোস্ত আমার। ওদের কথা মৌজ করো, মস্তি করো, গুলি মারো অমৃতসরের। আজিজের হোটেলে বসে আমরা গাঁজা খেতাম। আজিজের কাবাবের সঙ্গে জমে যেত গাঁজার দম। আশিক ছবি তুলত, ফকির লিখত কবিতা, জ্ঞানী অরুর সিং ছিল দাঁতের ডাক্তার। ক্যাপ্টেন যে কে, তা আর মনে নেই। গাঁজার দম মেরে রফিক গজনবির স্টাইলে গান ধরত আশিক। আর আনোয়ার, ছবি আঁকত, সেই গান শুনে শুধু বাঃ বাঃ করে। যেত। আজিজের অন্ধকার হোটেলে আনোয়ার মাঝে মাঝে নিজেও গেয়ে উঠত, এ ইশ কহি লে চল। আখতার শেরানির কবিতাকে ও গান বানিয়ে নিয়েছিল। আজিজের হোটেল এখন কোন কবরে কে জানে?
১১. আকাশ চক্রাকারে ঘুরছে
মুহব্বৎ সে হ্যায় ইন্তজাম-এ জহাঁ।
মুহব্বৎ গর্দীশমেঁ হ্যয় আসঁমা।।
(এই পৃথিবীর যত আয়োজন সবই তো প্রেমের জন্য
প্রেমের আকর্ষণেই আকাশ চক্রাকারে ঘুরছে।)
ইয়া আল্লা, কী জীবনটাই আপনার শুরু হয়েছিল, মান্টোভাই। খোদা আপনার নসিবে দোজখে যাওয়ার সব ব্যবস্থা একেবারে পাকা করেই রেখেছিলেন। যেমন আমার বেলাও খেয়াল ছিল। তাঁর; আরে এ বেটা জন্নতে গিয়ে করবে কী? সত্যিই তো, কী করতাম বলুন, না হয় একটা হুরি-পরি দেওয়া হত আমাকে, কিন্তু সেই একজনের মুখের দিকে তাকিয়ে কতদিন থাকা যায় বলুন? জন্নতের শান্তি মরেও সইত না আমার। সবই খোদার কলমে লেখা। আমার ব্যর্থতার কথা বলবার ভাষা সারা জীবনেও তো খুঁজে পাইনি আমি। এত যে ফারসি-উর্দু গজল লিখলাম, তার পরেও মনে হয়, না মান্টোভাই, সে-ক্ষতকে আমি ছুঁতে পারি নি, তার যন্ত্রণা ফুটে ওঠেনি আমার গজলের ভাষায়। তবে, মাঝে মাঝেই আমার মনে হত, যন্ত্রণা ছাড়া কি সত্যিই কোনও সৌন্দর্য তৈরী হয়েছে এই দুনিয়ায়? ধরুন না কেন, সাইপ্রেস গাছের ডাল-পালা হেঁটে-হেঁটেই না তাকে জামাল করে তোলা হয়। সেই খুবসুরতির জন্য কত যন্ত্রণাই না সইতে হয় সাইপ্রেসকে।তারপর ধরুন গিয়ে দারু। তা তো আঙুরদের কষ্ট না দিয়ে পাবেন না। কলম তৈরির জন্য কঞ্চিকে ঠিক ঠিক ভাবে কেটেকুটে নিতে হবে। তারপর ধরুন, আপনি খৎ লিখবেন। সে জন্য কাগজকে কাটতে হবে মাপ মতন,তার বুকে কালি দিয়ে আচড় বসাতে হবে। এক-একটা। আঁচড়ই তো এক একটা ক্ষত,আর তাঁর ফলে কী তৈরি হল? আশিকের কাছে আপনার মনের। রূপ রহস্যের কথা।তা, আমি দেখলুম, সবই তো হচ্ছে এইভাবে; যন্ত্রণা ছাড়া তো সুন্দরের জন্ম দিতেই পারিনা আমরা। খোদাও কী তা পারেন? তাঁর দুনিয়ায় এত যে ভাঙাগড়ার খেলা, এসবই তো নতুন নতুন খুবসুরতির জন্ম দেওয়ার জন্যই এই আমার কথাই ধরুন। এক মুঠো ধুলো দিয়ে তো তিনি তৈরি করেছিলেন আমাকে; তারপর আকাশে তুলে ধরলেন, সেখানে রইলুমও কিছুকাল; কিন্তু হঠাৎ একদিন দুনিয়ার বুকে ছুঁড়ে দিলেন, আমি এসে পড়লুম এখানে, আর এমন ভাবেই পড়লুম যে তাঁর দাগ রয়ে গেল এই পৃথিবীর বুকে; পৃথিবী ধারণ করল সেই ক্ষত,যার নাম মির্জা গালিব; কিন্তু সেই ক্ষতের সৌন্দর্যকেই বা কে অস্বীকার করবে,মান্টোভাই! এভাবেই চলেছে দুনিয়াদারি, তাই না?
দেখুন,দেখুন,আমাদের সব ভাইজানেরা আবার শুয়ে পড়তে শুরু করেছেন। কী হল – কী হল আপনাদের? দুটো বুরবাকের এই সব কথাবার্তা বড় জালেম মনে হচ্ছে তাই না? ঠিক হ্যায়, আজ তবে অন্য কিছু হোক, কী বলেন মান্টোভাই? জীবন-তা আমার হোক, হজরতের হোক, কী যুবরাজ সেলিমের হোক – জীবন এমনিতে খুব ম্যাড়ম্যাড়ে, তাঁকে বইবার জন্য ধোপার গাধা হয়ে যেতে হয়, টানছিই, বোঝা টেনেই চলেছি। তাকে সইয়ে নেবার জন্য মাঝে মাঝে হিকায় -এর কাছে ফিরতে হয় আমাদের; কিস্সা নয়, হিকায়; কিস্সা তো আমাদের জীবনের; আর হিকায়ৎ যেন আয়নায় ফুটে ওঠা অন্য এক দুনিয়ার ছবি। আমার কথা বলার সময় তো পড়েই রইল, আমরা তো কেউই আর কবর ছেড়ে পালাচ্ছি না,কিন্তু হিকায়ৎ-এর কথা যখন এল, তাই ই না হয় বলা যাক। হিকায় এই ভেসে, আবার হারিয়ে যায়।
