খিদে মেটাতে এবার ওরা হালুয়া খেতে চাইল।
হাল্লাজ হেসে বললেন, শুধু হালুয়া খেলেই পেট ভরবে, না আর কিছু চাই?
-না হুজুর। ওটুকু পেলেই আবার আমরা যেতে পারব।
-তা বটে। খাঁচাটুকু না থাকলে দীন-এর পথে যাবেই বা কী করে? বলে আবার তিনি হাওয়ায় হাত ঘুরিয়ে হালুয়া হাজির করলেন। তার সুবাসে ভরে গেল মরুভূমি। হালুয়া খাওয়ার পর
একজন বলল, এমন হালুয়া তো বাগদাদ ছাড়া কোথাও পাওয়া যায় না পীরসাব।
হাল্লাজ হেসে বলেছিলেন, বাগদাদ আর মরুভূমি, সবই খোদার কাছে এক জায়গা।
-আর খেজুর কোথা থেকে পেলেন?
হাল্লাজ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকলেন, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন, যেন একটা গাছ। বললেন, এবার আমাকে ধরে ঝাঁকাও।
-কেন পীরসাব?
-দেখোই না। হাল্লাজ হাসলেন।
সবাই হাল্লাজকে ধরে ঝাঁকাতে লাগল; হাল্লাজ যেন খেজুর গাছ হয়ে গেলেন, ঝরে পড়তে লাগল পাকা খেজুর। গাঢ় বাদামী খেজুর সূর্যের আলোয় মনির মতো ঝকঝক করতে লাগল।
আল্লারাখাসাবের জাদু দেখতে দেখতে আমি মনসুর হাল্লাজের এই গল্পটার কথাই ভাবছিলাম। মির্জাসাব, এ তো তা হলে নিছক জাদু, হাত সাফাইয়ের খেল নয়। একজন মানুষ যদি খেজুর গাছ হয়ে যেতে পারে, তবে জ্বলন্ত কয়লার ওপর দিয়ে হাঁটতে পারবে না কেন? তা হলে কত কুয়ত নিয়ে একজন মানুষ এই দুনিয়ায় আসে? কিন্তু সেই ক্ষমতার কতটুকুই বা প্রকাশ পায়? কতটুকু আমরা দেখতে পাই? কেন দেখতে পাই না, মির্জাসাব? মীরসাবের সেই শেরটা আপনার মনে আছে?
বা রে দুনিয়ামেঁ রহো গমজদহ্ য়া শাদ রহো
অ্যায়শা কুছ করকে চলে যাঁ কেহ্ বহুত য়াদ রহো।।
(মানুষের মধ্যেই থাকো, দঃখও পাবে আবার সুখও পাবে
এমন কিছু করে যাও যেন সহজে তোমায় লোকে ভুলতে না পারে।)
দুনিয়ামেঁ রহো। বুঝতে চেয়ো না ভাইজানেরা। দুনিয়ামেঁ রহো, য্যায়সা এক কিতাব। তাঁর পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় শুধু সব লিখে নিয়ে যেও।
তারপর কী হল, বলি, আপনাদের মুখগুলো বেজার হয়ে উঠেছে, বুঝতে পারছি।
সেদিন হঠাৎ আল্লারাখাসাব বললেন। তোমরা খোদাকে বিশ্বাস করো?
-জি হুজুর। ভিড়ের ভেতর আওয়াজ উঠল।
-আর আমাকে?
-হুজুর নবি। সবাই বলে ওঠে।
আল্লারাখাসাব হা হা করে হেসে উঠলেন। -নবি? নবিকে দেখেছ? নবি কে জান?
-হুজুর, বলুন।
-তা হলে একটা কিস্সা বলি শোনো। আবু সঈদ আবুল -খয়রের কথা শুনেছ কখনও? খোরাসানের সুফি সাধক। সে সব বারোশো-তেরোশো বছর আগের কথা। তখন দুনিয়াটা কেমন ছিল জান?
-কেমন হুজুর?
-কতরকম হাওয়া বইত। আর সেই হাওয়া গায়ে লাগিয়ে এক একজন এক-একরকম পাগল হয়ে যেত। বলতে বলতে হেসে উঠলেন আল্লারাখাসাব।-তা পীর আবু সঈদ একদিন তাঁর শিষ্য দরবেশকে নিয়ে বনের মধ্য দিয়ে চলেছেন। সেই বনে থাকত বিষাক্ত সব সাপেরা। হঠাৎ একটা সাপ এগিয়ে এসে আবু সঈদের পা পেঁচিয়ে ধরল। শিষ্য তো ভয়ে একেবারে। পাথর হয়ে গেছে। শিষ্যের অবস্থা দেখে আবু সঈদ বললেন, ভয় পেও না। এই সাপটা আমাকে সেজদা জানাতে এসেছে। ও আমাকে কামড়াবে না। তুমি কি চাও, ও তোমাকেও সেজদা জানাক?
-নিশ্চয়ই। দরবেশের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
-নিজেকে যতক্ষণ না ভুলে যেতে পারবে, ও কখনও তোমাকে সেজদা জানাবে না। ইনি হচ্ছেন। একজন নবি ভাইসব। তাঁর নিজের বলে আর কিছু নেই। শুধু আল্লার কথা জানাবেন বলেই এই দুনিয়ায় এসেছিলেন। নাও, এবার পরীক্ষা দাও।
কীসের পরীক্ষা? কী পরীক্ষা চান আল্লারাখাসাব? ভিড়ের সবাই এ-ওর মুখের দিকে তাকায়।
-আল্লাকে বিশ্বাস করো বলেছ। আমাকেও করো। তা হলে যার বিশ্বাস আছে, এগিয়ে এসো, আমার সঙ্গে আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটো।
আল্লারাখাসাবের কথা শুনে ভিড় আস্তে আস্তে পাতলা হতে থাকে। কেউ চুপি চুপি সরে যায়, কেউ আগুনের দিকে তাকিয়ে দৌড়ে পালায়। আর তখন, আমি আর বসে থাকতে পারলাম না। মির্জাসাব, এগিয়ে গেলাম আল্লারাখাসাবের দিকে। জুতো-মোজা খুলে কুর্তা গুটিয়ে নিলাম।
আল্লারাখাসাব অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুই আমার সঙ্গে হাঁটবি বেটা?
-জি।
-আয় তা হলে। তিনি আমার হাত ধরে টানলেন। কলমা বল। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহহা মোহম্মাদুর রসুলাল্লাহ।
-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহো মোহম্মাদুর রসুলাল্লাহ।
কলমা বলতে বলতে মনে হল, শরীরটা যেন হাওয়ার মতো হালকা হয়ে গেছে। আমি আল্লারাখাসাবের হাত ধরে আগুনের বৃত্তের মধ্যে ঢুকলাম, মির্জাসাব। তার পেছন পেছন হাঁটতে লাগলাম জ্বলন্ত কয়লার ওপর দিয়ে। হ্যাঁ, মির্জাসাব, সেই আমি নিজেকে প্রথম খুঁজে পেলাম। আমার বাবার চোখরাঙানির বাইরে, আমার উচ্চশিক্ষিত বৈমাত্রেয় ভাইদের অবজ্ঞার বাইরে, আমার নিজের পথে, আল্লারাখাসাবের পেছনে পেছনে, আগুনের বৃত্তের ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে। না, আমার পায়ে ফোস্কা পড়েনি, মির্জাসাব।
সত্যি বলতে কী, লাওয়ারিশের মতো কেটে যেত দিনগুলো। স্কুলের পড়াশোনা করতে তো একদম ভাল লাগত না। স্কুলে পড়ার সময়েই সাহিত্য আমার মজ্জায় যেন মিশে গিয়েছিল। আগা জাফর কাশ্মীরির নাটক করার জন্যই একটা দল তৈরী করেছিলাম আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে। একদিন বাবা এসে হারমোনিয়াম, তবলা-সব ভেঙে দিলেন। বললেন, এসব করা যাবে না। আর ততই আমার রোখ চেপে গেল। পড়ার বই ফেলে নানা রকম আফসানা পড়তাম; বড়দের জন্য লেখা, আমার বয়েসে যেসব বই কেউ পড়ে না। স্কুলে বদ ছেলে হিসেবেই নাম পেয়ে গেলাম টমি। তিনবারের চেষ্টায় থার্ড ডিভিশনে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করলাম, আর মজার কী জানেন, আমি ফেল করেছিলাম উর্দুতে। হা-হা, ভাবুন মির্জাসাব, উর্দুতে আমি ফেল করেছিলাম।
