চ কু হলে বীনশে মা খাকে আস্তানে শুশস্ত
কুজা রবমে বফর্মা অযী জনাব কুজা।।
(আমরা যে মিলেছিলাম একদা সে সুখস্মৃতির হল অবসান
কী করে, আপনি মিলাল সে সব মোহনী মায়া, সেই অভিমান!)
হ্যাঁ, কাউকে কাউকে কবর দিতে হয়, হৃদয়ের একেবারে গভীরের দরগায়, সে তো পীরস্থান, এই শরীরের ভিতরের জন্নত, যেখানে আমিও কবর দিয়েছিলাম ইসমতকে-ইসমত চুঘতাই বরফ চিবোতে কী যে ভালবাসত। বাসনার সেই দরগায় বেগম নেই; নেই তো নেই; তাতে আমি কী করতে পারি, মির্জাসাব, কে আমার জন্নত আর জাহান্নমে থাকবে আর থাকবে না, তা তো আমরা ঠিক করতে পারি না, মির্জাসাব, ঠিক করে দেন তিনি, আল-ফতাহ্। কথাটা আপনি মানেন তো?
এই মিশকিনকে মাফ করুন ভাইসব, মান্টো তার কিস্সা থেকে বারে বারেই গায়েব হয়ে যাচ্ছে। এটাই আমার স্বভাব ছিল। যদি আমার কিস্সাগুলো আপনারা পড়তেন, তা হলে বুঝতে পারতেন, মান্টো এই আছে তো, এই নেই, একটা কোফর আত্মার মত পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। না পালিয়ে তো উপায় ছিল না। সাদাত হাসান কখনও মান্টোর মুখোমুখি দাঁড়াতে পারত না। সাদাত হাসানের কত ঠাটঠমক, কত আভিজাত্য, এই রকম পোশাক চাই, ওইরকম লাহোরি জুতো না হলে তাঁর চলবে না, আনারকলি বাজারে কারনাল বুট শপ থেকে অন্তত দশ থেকে বারো জোড়া চপ্পল কিনতেই হবে; কত তার খুশখেয়াল। আর মান্টো তার কান ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলত, শালা শুয়ারকা বাচ্চা, নবাবি মারাচ্ছ, যা লিখছ, তার নিয়তি জান? কালো কাপড়ে মুখ বেঁধে অন্ধকূপে ফেলে দেবে ওরা তোমাকে। সারা হিন্দুস্থান ম ম করবে তোমার লেখার বদবুতে। শালা, শুয়ার কাহিকা, ঠাণ্ডা গোস্ত লেখো, এত বড় কাফের তুমি? কী বলে ওরা, শুনেছ? শুধু নারী-পুরুষের মাংসের গল্প লিখেছ, রেড লাইট এরিয়া ছাড়া আর কী আছে তোমার লেখায়! হাত তুলে দিলাম মির্জাসাব, না কিছু নেই, হত্যা আছে, ধর্ষণ আছে, মৃতের সঙ্গে সঙ্গম আছে, খিস্তির পর খিস্তি আছে-আর এই সব ছবির পেছনে লুকিয়ে আছে। কয়েকটা বছর-রক্তে ভেসে যাওয়া বছর-১৯৪৬, ১৯৪৭, ১৯৪৮-আছে নো ম্যানস ল্যান্ড, দেশের ভেতরে একটা ভূখণ্ড, যেখানে টোবা টেক সিং মারা গেছিল। টোবা টেক সিং-এর নাম আপনারা শোনেন নি। শুনবেনই বা কোথা থেকে? সে তো একটা উন্মাদ ছাড়া আর কিছু ছিল না!
না, না, ঘাবড়াবেন না ভাইজানেরা, আগুনের কিস্সাটা এবার শুরু হবে। টোবা টেক সিংকে। নিয়ে গাঁজাল পাড়তে বসব না আমি। তবে কি জানেন, এই মান্টোকে তো অনেকে নানাভাবে বুঝতে চেষ্টা করেছে-এই শুয়োরের বাচ্চাটা আসলে কে -পাগল, না ম্যানিয়াক, মানসিক রোগী, না ফরিস্তা-মানুষের এই সবটা বোঝার ইচ্ছের ওপর আমার হিসি করে দিতে ইচ্ছে করত, কী করে বুঝবি রে শালা, তুই কি আমার মতো করে কখনও সূর্যাস্ত দেখেছিস, তা হলে কী করে বুঝবি, আমি কেন প্রথমেই মেয়েদের পায়ের দিকে তাকাতাম, তাই বোঝার চেষ্টা ছাড়, মান্টোকে যদি কোথাও খুঁজতেই হয়, তা হলে ওর কিস্সাগুলো পড়-ওই যে লোক আর মেয়েমানুষগুলোকে দেখছিস, রাস্তার, চাওলের, রেন্ডিপট্টির, বম্বের স্টুডিওর-ওই-ওই ওদের মধ্যে মান্টোকে খুঁজে পেলেও পেতে পারিস। ওরা বলত, এইসব কিস্স না কিচর? আরে ভাই, যে সময়টায় বেঁচে আছি, তাঁকে যদি বুঝতে না পারিস, তা হলে আমার আফসানাগুলো পড়, আর আমার কিস্সাগুলো যদি সহ্য করতে না পারিস, তা হলে বুঝবি, এই সময়টাকেই সহ্য করা যায় না। কিন্তু এসব বলে লাভ কী? ওরা তো মান্টোর গায়ে গনগনে আগুনের শিক দিয়ে দাগা দিয়ে। দিয়েছে, ও আবার লেখক নাকি, ও তো পর্নোগ্রাফার, মানুষের জীবনের নোংরা দিকগুলো নিয়েই ওর কারবার। অথচ যখনই আমি কোন গল্প শুরু করেছি, ৭৮৬ সংখ্যা, বিসমিল্লার নাম লিখতে ভুলিনি। ভাইজানেরা, এসবই আমার জ্বলন্ত কয়লার ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার ইনাম।
মাস্টার খুদা বক্সের কথাটা মনে আছে তো আপনাদের? সেই চোখে কালো কাপড় বেঁধে গাড়ি চালিয়ে পিকাডিলি সার্কাসে নতুন সার্কাসের খেল দেখিয়েছিলেন। খুদা বক্সের পর অমৃতসরে আল্লারাখা নামে একজন এসে হাজির হলেন, তিনি নাকি খুদা বক্সের গুরু, রাস্তার ওপর গর্ত খুঁড়ে তিনি তাতে কয়লা জ্বালিয়ে দিলেন, তারপর সেই গনগনে আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটতেন। আল্লারাখাসাবের জাদু দেখতে তো দিনের পর দিন ভিড় বাড়তে লাগল। কত কথা, কত কিস্য। ছড়িয়ে পড়ল তাঁকে নিয়ে। আমি চুপচাপ বসে লোকটাকে দেখে যেতাম। জ্বলন্ত কয়লার ওপর দিয়ে কীভাবে হেঁটে যায় একজন মানুষ? হাঁটার পর তিনি পা তুলে দেখাতেন, একটাও ফোস্কা পড়েনি। বিবিজানের কাছে আল হাল্লাজের গল্প শুনেছিলাম আমি। একবার হাল্লাজ অনেককে নিয়ে মরুভূমি পেরিয়ে মক্কায় যাচ্ছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে খিদেয় যাত্রীরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তারা হাল্লাজকে বলল, এখানে একটু খেজুর পাওয়া যাবে না পীরসাব?
হাল্লাজ হেসে বললেন, খেজুর খাবে?
-জি, বহুৎ ভুখ। আর পা চলে না।
-দাঁড়াও। হাল্লাজ মরুভূমির হাওয়ায় হাত ঘোরাতেই দেখা গেল তাঁর হাতে খেজুরভরা এক পাত্র।
আবার চলা শুরু, আবার খিদের জ্বালায় মরুভূমির ওপর বসে পড়া। সে এক সময় ছিল ভাইজানেরা, তাই না মির্জাসাব, যখন জীবন মানেই ছিল মরুভূমির পর মরুভূমি পেরিয়ে যাওয়া। আর রাতগুলো কেটে যেত মরুভূমির আকাশের তারাদের সঙ্গী হয়ে। সে পথ পীর, সাধক, হজরতের। কত, কতদিন আগে আমরা সে পথ থেকে সরে গিয়ে এই দোজখের দিকে চলে এসেছি, আমাদের হল্লাগুল্লায়, নরকে, পচা মাংসের গন্ধে।
