বাবার কথা তেমন কিছু বলার নেই, মির্জাসাব। রইস আদমি, লুধিয়ানার সমরালায় সরকারি অফিসার, দু-দুটো বিয়ে করেছিলেন। তাঁর ছোট বিবির ছেলে আমি। আমার দিকে কোনওদিন ফিরেও তাকাননি। মায়ের সঙ্গেই ছিল আমার সব খুনসুটি, আমি তাকে ডাকতাম বিবিজান। আর আমার নিজের বোন ইকবাল। মির্জাসাব, বাবা যেন একটা জিনের ছায়া, যে-ছায়াটা সারা জীবন আমাকে ছেড়ে যায় নি। অনেক পরে আমি কাক্কার জাজমেন্ট গল্পটা পড়ে চমকে উঠেছিলাম। সেই গল্পেও এক বাবা, দৈত্যের মতো এক বাবা, যার জন্য ছেলে জানলা দিয়ে। নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। মির্জাসাব, আমার প্রত্যেকটা গল্পে ওইরকম কেউ না কেউ একটা দৈত্যের মতো বাবা হয়ে ফিরে এসেছে, আর তাকে আমি হত্যা করতে চেয়েছি।
আমার বাবা মৌলবি গুলাম হাসান তাঁর বড় বিবির তিন ছেলেকে লেখাপড়া শেখালেন, বিদেশে পাঠালেন, প্রতিষ্ঠিত করলেন, আর এই মান্টোকে ছেড়ে দিলেন রাস্তায়-যাও শালা, ঘুরে বেড়াও, বেওয়ারিশ কুকুরের মতো, লোকের ফেলে দেওয়া মাংসের হাড়ি খুঁজে খাও। মহম্মদ হাসান, সীদ হাসান, সালিম হাসান-তাঁর বড় বিবির তিন ছেলে ইংল্যান্ডে মির্জাসাব, আর আমি সমরালার রাস্তায়, কী করছি? বাদরের নাচ দেখছি, আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার খেলা দেখছি। ম্যাট্রিক অবধি পড়াশুনো করে ছেড়ে দিলাম। কে দেবে পড়ার খরচ? মৌলবি গুলাম হাসান তাঁর তিন ছেলেকে ইংল্যান্ডে রইস আদমি বানাবেন না? মির্জাসাব আমি আর কী করি, একদিন শরাবখানায় ঢুকে পড়লাম। পুলিশ আমাকে মারতে মারতে জেলখানায় নিয়ে গেল। কদিন পরে খালাসও পেয়ে গেলাম, কীভাবে কে জানে। তারপর প্রায়ই শরাবখানায় যেতে শুরু করলাম। বিবিজানের বাক্স থেকে পয়সা চুরি করা এভাবেই শুরু হল। শরাবের পর ঘুম, ঘুমের ভেতরে খোয়াব, আর সেই খোয়াবে কে এসে দাঁড়াত জানেন? মৌলবি গুলাম হাসান, শালা শুয়ার কা বাচ্চা, আমি ওর দিকে পাথর ছুড়তাম, গু ছুড়তাম, কিচর ছুড়তাম, লোকটা তবু হা হা করে হাসত, এত বেশরম আদমি। খবিশ, জানেন মির্জাসাব, ওই লোকটা আমার জীবনের অপদেবতা ছাড়া কিছু না। আমার দিকে কীভাবে তাকিয়ে থাকত জানেন? যেন আমি একটা পোকা, নর্দমা থেকে উঠে এসে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছি। আম্মিজানকে কী বলত জানেন, এই লাফাঙ্গাটাকে এত ভালবাসো কেন বিবি, ওকে তো আসলে দায়েরে পাঠানো উচিত।
দায়ের, হ্যাঁ দায়েরেই তো আমার সারা জীবন কেটে গেল মির্জাসাব। শুধু গল্প লেখার জন্যই। তো কতবার দায়েরে গিয়ে দাঁড়াতে হল আমাকে। ছোটবেলা থেকে আগুনের ফণা এসে ঘিরে ধরল আমাকে। মীরসাবের সেই শেরের কথা মনে আছে মির্জাসাব?
দিলকে তঈঁ আতশ-এ-হিজরাঁ-সে বচায়া নহ্ গয়া
ঘর জলা সামনে পর হমসে বুঝায়া নহ্ গয়া।।
(হৃদয়টাকে বিরহের দাহ থেকে বাঁচানো গেল না;
দেখতে দেখেতে ঘর পুড়ে গেল তবু আগুন নিভাতে পারলাম না।)
তেমনই এক আগুনের ভেতরে গিয়ে আমি দাঁড়িয়েছিলাম ছেলেবেলায়। মির্জাসাব, সেই দিন থেকে আমি আগুনের বাসিন্দা হলাম। নাকি আগ কা দরিয়া বলবেন? যাই বলুন না কেন, পুড়তে পুড়তে তেতাল্লিশটা বছর পার হয়ে গেল। শাফিয়া বেগম বলত, এইভাবে নিজেকে পুড়িয়ে কী পেলেন মান্টোসাব?
– কিস্সা, বেগম।
-কাদের কিস্সা?
-ওই যে ওরা-ওরা-বড় রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে, দেখতে পাচ্ছ না? ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্যে মিশে দাঁড়িয়ে আছে।
-কারা?
-মান্টোর আত্মারা।
আগুনের গল্পটা আগে বলে নিই মির্জাসাব। ভাইজানেরা, জেনে রাখুন, এই সেই মান্টো, সাদাত হাসান কবেই মারা গেছে, কিন্তু মান্টো আগুনের ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়েছিল। একদম সাচ বাত। এক বঁদ ঝুটা নেহি। মান্টো ঝুটা জানে না, ঝুটা জানত না, তাই ওরা তাকে বারবার কোর্টে টেনে নিয়ে গেছে, সাহিত্যের বড় বড় বান্দারা বলেছে, মান্টো আবার লিখতে পারল কবে, আর কমিউনিস্টরাও তো ছেড়ে কথা বলেনি, শালা মান্টো, শুয়ারকা বাচ্চা, সাহিত্যের নামে কিচর ছড়িয়ে যাচ্ছে। বন্ধু বলে যারা আমার পরিচয় দিয়েছে, তারাই আমাকে নিয়ে হেসেছে, বলেছে আমি সিনিক, প্রতিক্রিয়াশীল। আমি নাকি মরা মানুষের পকেট থেকেও সিগারেট বার করে ধরাই। ছোটবেলায় যে-আগুনের ওপর আমি গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, সেই আগুন ছাড়া আর কোথাও দাঁড়ানোর জায়গা ছিল না আমার, মির্জাসাব। কবেই তো আপনি একটা শের-এ লিখেছিলেন :
গম-এ হস্তী-কা, অসদ, কিস-সে হো জুজ মর্গ ইলাজ,
শমা হর র-মে জলতী হৈ সহর হোনে তক।।
(মৃত্যু ছাড়া জীবনযন্ত্রণার আর কী ওষুধ আছে আসাদ,
প্রদীপকে তো সবরকমের জ্বলা জ্বলতেই হবে ভোর হওয়া পর্যন্ত।)
ধরা যাক, ১৯১৮-তে যদি আমি জন্মে থাকি, যদি অবশ্য মৌলবি গুলাম হাসান তা স্বীকার করেন, তা হলে তখন আমি দশ কী বারো বছরের একটা কুত্তা। আপনারা জানেন না, সেবার লন্ডনের পিকাডিলি সার্কাসে চোখে কালো কাপড় বেঁধে গাড়ি চালিয়ে হল্লা মাচিয়ে দিয়েছিল মাস্টার খুদা বক্স। সে কী হইচই তখন। শালা, আমরা যেন দুনিয়াদারি পেয়ে গেছি। তা, কী হল জানেন, সেবারই এক কাণ্ড ঘটল, যেন খোদাই খবর পাঠালেন আমার কাছে। মির্জাসাব, আপনি তো জানেন, এটা একটা ঘটনা কীভাবে জীবনটা পূর্ণিমার রাতের সমুদ্রের মতো বদলে দেয়। যেমন সেই বেগম ফলক আরা। আমি জানি, আপনি কখনও আর তাঁর কথা বলবেন না; ইক কী তা তো আপনি তাঁর কাছেই শিখেছিলেন। হাফিজসাব তো আপনার জন্যই লিখেছিলেন :
