দিল্লিতে এসে আমি যেদিন কিলা-ই-মুয়াল্লার সামনে দাঁড়িয়েছিলুম। সেদিন আকাশে চাঁদ ছিল না; কিলা-ই-মুয়াল্লাকে একটা বিরাট প্রেতের মতো মনে হয়েছিল আমার। আর আমি অনুভব করেছিলাম কারা যেন আমার চারপাশে ঘিরে এসে দাঁড়াচ্ছে, তাদের নিশ্বাসে পচা মাংসের গন্ধ।
-আসাদ-কে যেন আমাকে ডাকল।
আমি চারপাশে তাকিয়েও কাউকে দেখতে পেলাম না। সবে তো দিল্লি এসেছি, কেই-বা আমাকে চিনবে? -কে আপনি? আমি ভয়ে ভয়ে বললুম।
কুতুব।
-আপনাকে তো চিনি না। আপনি কোথায়? আপনাকে তো দেখতে পাচ্ছি না কেন?
-আমাদের দেখা যায় না আসাদ।
-কেন?
-ওরা আমাদের মুছে ফেলেছে।
-কারা?
-শাহজাহানাবাদ যারা তৈরী করেছে। ওরা বেছে বেছে আমাদের ধরে এনেছিল।
-তারপর?
-সবাইকে মেরে কবর দিয়েছিল। সেই মাটির ওপরই তো এই শাহজাহানাবাদ দাঁড়িয়ে আছে।
-কেন তোমাকে মারা হয়েছিল?
-আমি ওদের সামান্য জমিটুকু দিতে চাই নি। তাই আমাকে খাল্লাস করে দিল। বলল, জাঁহাপনার বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় অপরাধ আর হয় না। আমাকে ওরা দাগী আসামী বানিয়ে দিল। অন্ধকার কারাগারে আটকে রাখল দিনের পর দিন।
-আসাদ ভাই
-তুমি কে?
-আমি ইউসুফ।
-তুমি কী করেছিলে?
-শুধু তাকে দেখেছিলাম।
-কাকে?
-তার নামও আমি জানি না। হাভেলির বারান্দায় সে দাঁড়িয়েছিল। শুধু বোরখার ভেতর দিয়ে তার চোখ দুটো দেখেছিলাম। আসাদ ভাই, কেমন সেই চোখ জান? যেন দুটো বুলবুল। আমি সেই বুলবুল দেখতে রোজ হাভেলির সামনে যেতাম। কিন্তু আর কখনও দেখিনি। তবু ওরা। আমাকে শিকল দিয়ে বেঁধে ধরে নিয়ে গেল, একটা অন্ধকূপে ঢুকিয়ে দিল। তারপর একদিন
-তুমিও কবরে চলে গেলে ইউসুফ?
-জি।
-কেউ কিছু বলল না?
– কে কী বলবে? মহব্বত হারাম, মহব্বত দোজখ। কে কী বলবে আসাদ ভাই? আমাদের
জীবনে মহব্বত কোথায়?
-আর আমি শুধু রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতাম।
-তুমি কে?
-হাসান। কেন ঘুরে বেড়াতাম আসাদ?
-কেন?
-ধুলো খুঁজব বলে।
-ধুলো? কেন? কার ধুলো।
-সেই ধুলো দিয়েই তো আদমকে বানিয়েছিলেন আল্লা। বলো, কাউকে না কাউকে তো সেই ধুলো খুঁজতেই হবে।
-তাই ওরা তোমাকে ধরে নিয়ে গেল?
-বলল, ধুলো খুঁজিস? ধুলো দিয়ে আদম বানাবি? আল্লা হবি? মৌলবিরা আমার জামাকাপড় ছিঁড়ে দিল। শধু পাথর ছুঁড়ে ছুঁড়ে আমাকে মেরে ফেলল। আসাদ ভাই, আমি ওদের কিছু বলিনি। সিনা চিতিয়ে দাঁড়িয়েছি। মার তোরা, কত মারবি মার, আমার চোখ খুবলে নে, মাংস কেটে কেটে নিয়ে যা। জন্নতেও তো আমি ধুলোই খুঁজব। তখন তোরা আমার কী করবি? আমি ওদের চিৎকার করে বলেছিস মার, কত পাথর ছুঁড়ে মারবি, আমি আল হাল্লাজ। আল হাল্লাজকেও তো ওরা পাথর ছুঁড়েই মেরেছিল, না? আল হাল্লাজই তো বলেছিল, আমি আল্লা। আমিই আল্লা। আমি শুধু ধুলো দিয়ে আদম বানাতে চেয়েছিলাম আসাদ ভাই। শধু এই জন্য আমি মুনাফেক?
মান্টোভাই, সেদিন সারা রাত আমি সেই আত্মাদের কথা শুনছি, যাদের কোনও না কোনওভাবে অপরাধী বানানো হয়েছিল, তারপর হত্যা করে কবর দেওয়া হয়েছিল। আর সেই কবরের মাটির ওপর গাঁথা হয়েছিল শাহজাহানাবাদের ভিত। আমি দিল্লি এসেছিলুম অনেক স্বপ্ন চোখে নিয়ে, বড় শায়ের হব, মুশায়েরার পর মুশায়ারায় আমার গজল শুনে রিস আদমিরা কেয়া বাত কেয়া বাত, মারহাব্বা মারহাব্বা বলে উঠবেন। কিন্তু এ-কোন ভটকতা হুয়া আত্মাদের শহরে এসে আমি পৌঁছলুম? সারা রাত ধরে আমি তাদের জীবনের কথা শুনেছি। তারা কেউ মুজরিম ছিল না, কিন্তু অপরাধীর ছাপ্পা মেরে দেওয়া হয়েছিল তাদের শরীরে। কেননা একটা শহর তৈরীর জন্য এইরকম অপরাধীদের দরকার, যাদের বিনা কারণে হত্যা করে কবর দেওয়া হবে। সাদিক মিঞার আত্মা আমাকে বলেছিল, আপনি গজল লিখবেন আসাদ সাব?
-আমি তো আর কিছু পারি না মিঞা।
-আমাদের মতো আত্মাদের কথা লিখবেন না?
-লিখব।
-তা হলে আপনার গজল কেউ বুঝবে না আসাদ সাব। কুতুব হেসেছিল।
-কেন?
-শুধু তো মৃত্যুর গন্ধ পাবে সবাই।
-তারপর কী হবে জানেন? সাদিক মিঞা হাসতে হাসতে বলে।
-কী?
-আপনি একটা বেওয়ারিশ কুকুরের মত মরবেন।
আত্মারা ঠিকই বলেছিল, মান্টোভাই। তবু রাস্তার কুকুর হলেও, একসময় দেখতে তো আমি সুন্দরই ছিলুম। কেউ কেউ আমাকে আদরও করত। মুঘলজান, মুনিরাবাইরাও আমাকে ভালবাসত। তারপর একদিন দেখলুম, ললামগুলো উঠতে শুরু করেছে, সারা শরীরে পোকা কিলবিল করছে। সব লোমও একদিন উঠে গেল, ঝলসানো চামড়ার নীচে কয়েকটা হাড়। দিবানখানায় বসে আমি সেই হাড় কখানার দিকে তাকিয়ে থাকতুম, তারপর ক্লান্ত হয়ে একসময় ঘুমিয়ে পড়তুম। আর খোয়াবে দেখতুম দিল্লি ভেঙে পড়ছে, বালি ঝরছে, শুধু বালি; মরুভূমির ভেতরে আমি তলিয়ে যাচ্ছি। কত পুরানো আত্মাদের হাত ধরে আমি দিল্লি এসে পৌঁছেছিলুম ভাবুন, মান্টোভাই।
১০. গোস্তাকি মাফ করবেন
খরাবী দিলকী ইস হ হ্যায় কেহ্ য়হ্ সমঝা নহীঁ জাতা,
কেহ্ আবাদী ভী য়াঁ থী য়া-কে বীরাহ মুদ্দৎ কা।।
(হৃদয় আমার এমন উজাড় হয়েছে যে বোঝাই যায় না
এখানে কোনও দিন বসতি ছিল, না কি যুগ যুগ ধরে উজাড় হয়েই আছে।)
মির্জাসাব, ভাইজানেরা, গোস্তাকি মাফ করবেন, বদনসিব মান্টোর কথা এবার আপনারা একটু শুনুন। পেটের ভেতরে কথারা গলগল করে উঠছে, বাঁধ মানতে চাইছে না, আমি কথা বলতে শুরু করলে ইসমত শুধু হাসত আর মুখের ভেতর বরফ নিয়ে নাড়াচাড়া করত, বরফ খেতে কী যে ভালবাসত ইসমত, আর আমি কথা বলে যেতাম, পগালের মতো বলে যেতাম, শফিয়া বেগম মাঝে মাঝে এসে আমার মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসত। আমি জানি, ওরা আমার কথা, বেশীক্ষণ সহ্য করতে পারত না, মুখে তে সব সময় খিস্তি, কথার আগে-পিছে শালা ছাড়া বলতেই পারতাম না; কী করব বলুন মির্জাসাবের মতোই তো পথে পথে, চায়ের দোকানে, কফিখানায় কেটে গেছে আমার জীবন; আম্মিজান ছাড়া কে ছিল আমার, যে আমার দিকে ফিরে তাকাবে?
