শাহজানাবাদে যেদিন এলুম, তারাই এসে আমার সঙ্গে কথা বলল, যাদের কথা ইতিহাসে লেখা হয় না, মান্টোভাই। শাহজাহানাবাদে গড়ার জন্য তাদের জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল। তা হলে কিস্সাটা একটু গোড়া থেকেই বলি। তবে কোনটা গোড়া, আর কোনটা আগা, তা আমি আজও বুঝতে পারি না। আমি সেই বুড়ো গাছটা, জানেন তো, হাজার হাজার বছর ধরে বেঁচে আছে, যার গায়ে কেউ কুঠার দিয়েও আঘাত করে না, আসলে গাছটা যে কারুর কোনও কাজে আসে না। দাঁড়িয়ে আছি তো আছেই। মনে হয়, আমার মাথাটাই শিকড়, আকাশ ছুঁড়ে কোথায় চলে গেছে, না, না, জন্নতের দিকে তো নয়ই, আর আমার পা ডুবে আছে নরকের আগুনে। তবু আল্লাকে তো আমি বলেছিলুম :
অব জফা-সে-ভী হৈ মহরূম, আল্লাহ আল্লাহ;
ইসঁ কদ দুশমন্-এ-অর্বাব-এ-বফা হো জানা।।
(এখন নিষ্ঠুরতা থেকেও বঞ্চিত আমি-হায় ঈশ্বর
একনিষ্ঠ প্রেমিকের সঙ্গে এতখনি শত্রুতা )
যে কথা হচ্ছিল। আপনারা তো জানেন, শাহজাহানাবাদের আগে মুঘলদের রাজধানী ছিল আকবরাবাদ, মানে আগ্রায়। জাঁহাপনা আকবর আগ্রায় এসেছিলেন ১৫৫৮ সালে। এসব ইতিহাসের কথা শুনতে কি আপনাদের ভাল লাগবে? সেজন্য ইতিহাসের কত কিতাব রয়েছে। সম্রাট বাহাদুর শাহ আমাকে তো মুঘলদের ইতিহাস লেখবার বরাত দিয়েছিলেন; প্রথম খণ্ডের পর আমি আর লিখতে পারিনি। আমি কিস্সা শুনতে শুনতে বড় হয়েছি মান্টোভাই, ইতিহাস কি আমাকে জন্নতের পথ দেখাতে পারবে? বরং ১৮৫৭ থেকে ইতিহাসের জাহান্নমের আগুনে পুড়ে পুড়েই আমরা শেষ হয়ে গেলুম।
তবু আগ্রা নিয়ে দুএকটা কথা আমাকে বলতেই হবে। তার পথের ধুলোয় মিশে আছে আমার প্রথম জীবনের প্রেম। যমুনার স্রোত আমার সঙ্গে কথা বলত। আমি ঘুরে বেড়াতুম চহরবাগে, মোতি মহলে। জাফর খানের সমাধিসৌধের পাশেই ছিল বুলন্দবাগ; সে এক আশ্চর্য বাগান। সত্যি বলতে কী মান্টোভাই, আগ্রা ছিল আসলে বাগানের শহর। আর কত যে সরাই ছিল। তাজমহলের পাশের সরাইয়ের নাম ছিল তাজ-ই-মোকাম আমাদের আড্ডাবাজির ঠেক। বলতে পারেন তাজ-ই-মোকাম ছিল আমাদের কিস্সবাগ। একজন এই গল্প বলেছে তো আরেকজন। অন্য গল্প; আর আকাশ জুড়ে পতঙ্গবাজির মত হাসির হল্লা। মীর সওদার কিস্যাটা আমি ওখানেই প্রথম শুনেছিলাম, সওদাকে আমি কখনও বড় কবি মনে করিনি, তবে কসীদা লেখায় তাঁর আবদারির কথা স্বীকার করতেই হয়। বড় মজার একটা কথা বলতেন সওদা, এসব লোকমুখেই শোনা, আমি তো তাঁকে দেখিনি, তিনি নাকি বলতেন, আমি বাগানের সুন্দর ফুল নই ঠিকই, তবে কারুর পথের কাঁটাও নই। কিস্পটাই বলা যাক। মীর হাসানের ওয়ালিদ মীর জাহিদকে নিয়েই মজার কসীদাটা লিখেছিলেন সওদা। মীর জাহিদ খাবার পেলে আর কিছু চাইতেন না। জগৎ-সংসারে সব কিছুর মধ্যেই তিনি কিছু না কিছু খাবার খুঁজে পেতেন। সওদার কসীদাটা শুনলে আপনি হেসে গড়িয়ে পড়বেন মান্টোভাই। মীর জাহিদ একদিন হাঁ। করে তাঁর বেগমের আঙ্গিয়াঁর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। আরে, আঙ্গিয়াঁ, আঙ্গিয়াঁ বোঝেন তো? যা দিয়ে মেয়েরা বুক দুটোকে ঢাকে। বেগম তো অবাক, এ কী বেশরম বাত, মরদ এভাবে আঙ্গিয়াঁর দিকে তাকিয়ে আছে কেন?
বেগম লজ্জা পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কোই গলদ কিয়া জনাব?
-নেহি।
-তো আপ কিউ
-দেখ রহি হু বেগম।
-কেয়া।
-আঙ্গিয়াঁকা অন্দর কেয়া হ্যায় বেগম?
-কেয়া হ্যায় জি? মীর জাহিদ লাফিয়ে পড়ে বেগমের দুই বুক চেপে ধরে চেঁচিয়ে উঠলেন, রোটি হ্যায় বেগম, রোটি হ্যায়, য্যায়সে মখমল।
-ইয়া আল্লা। বলে তো বেগমের মুছা যাবার অবস্থা। আবার এক-একদিন বেগমের পেটিকোটের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে বলতেন, ইয়ে কেয়া হ্যায় বেগম? ইতনা নরম, ফির ভি ইতনা গরম। এ তো তাওয়ায় ভেজে আনা রোটি বেগম। কেন আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছ? দাও-দাও-বেগম, এ রোটির স্বাদই আলাদা। হাঃ হাঃ হাঃ-ভেবে দেখুন মান্টোভাই, সরাইখানায় বসে কী চলত? দিনে কত লোক আসছে, যাচ্ছে-চেনা-অচেনা-কত বিদেশী-আপনি জানেন, সেই আকবরাবাদে তখন যত লোক ছিল, তত লোক লন্ডনেও ছিল না। এই ছিল। আকবরাবাদ, রঙিন সুতোয় বোনা একটা তসবির, তাই বা বলি কেন, সে যেন ছিল এক তসবিরমহল, আর সেখানে খোদার কলম যেন আমাদের এঁকে দিয়ে গিয়েছিল। হাফিজ সাবের সেই শের মনে পড়ে যায়, মান্টোভাই :
রোষে বক্সে দোস্ত দারাঁ যাদবাদ
য়াদ বাদ আঁ রোষগারাঁ যাদবাদ।
(আজও মনে পড়ে সেইসব দিন
এসেছি যে একে অন্যের কাছে
বন্ধুত্বের টানে বাঁধা পড়ে–
সেসব দিন কি আজও মনে আছে?)
১৬৩৭ সালে জাঁহাপনা শাহজাহান দিল্লি চলে গেলেন। আগ্রার তাসবিরমহলও ভেঙে পড়ল। মীরসাব যেমন লিখেছিলেন :
বু-এ গুল যা নবা বুলবুল কী :
উম্র, অক্সোস কেয়া শিতাব গয়া।।
(গোলাপ ফুলের সৌরভ, বুলবুলের করুণ গান
এবং আমার জীবন, হায় কী দ্রুত শেষ হয়ে গেল।)
এবার শুরু হল শাহজাহানাবাদ তৈরীর কাজ। আগ্রা আর লাহোররের মধ্যে কোন জায়গায় রাজধানীর জন্য জায়গা দেখতে বলেছিলেন জাঁহাপনা শাহজাহান। যমুনা নদীর পারে ঠিক করা হল সেই জায়গা। শহরের কুণ্ডলিনী তৈরি করা হয়েছিল জানেন তো? জ্যোতিষীরা দিনক্ষণ ঠিক করেছিলেন। ১৬৩৯-এর ১২মের মধ্যে শুরু হয়ে গেল কাজকর্ম। এই শুরুর আগে যে শুরু, সে কিস্সাটাই আমি আপনাদের বলতে চলেছি, মান্টোভাই। একটা শহর কীভাবে মৃতের স্তূপের ওপর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, সেই মৃতরা, যাদের আত্মারা আমাকে ঘিরে এসে দাঁড়িয়েছিল।
