মান্টোভাই, শাহজাহানাবাদে আমি ঢুকেছিলুম বদনসিব আত্মাদের বলা কথা শুনতে শুনতে। সবার মুখে মুখে তো দিল্লিই, কিন্তু শাহজাহানাবাদ নামটা উচ্চারণ করতে আমার ভাল লাগত; এক একটা নামে কেমন খুশবু জড়িয়ে থাকে না? জাহাঙ্গিরী আতরের মতো খুশবু। নাম। শোনেননি বুঝি? এসব আর কজনই বা জানে, বলুন? জাঁহাপনা জাহাঙ্গির দাবি করতেন, তাঁর রাজত্বেই আতরের জন্ম। এসব হচ্ছে রাজা-বাদশাদের খেয়াল। তবে সে আতর কে বানিয়েছিল জানেন? বেগম নূরজাহানের মা অসমত বেগম। জাহাঙ্গিরের খুব আফসোস ছিল যে তাঁর ওয়ালিদ জাঁহাপনা আকবর এই জাহাঙ্গিরী আতরের সুবাস নিয়ে কবরে যেতে পারেননি। জাঁহাপনা আকবর। মান্টোসাব, তিনি যেন জন্নতের খাস দরওয়াজা। কত দূর সত্যি জানি না, দিল্লির খাস আদমিদের কাছেই শুনেছি, অসমত বেগম গোলাপজল বানানোর সময় জলের ওপর যে ফেনা তৈরি হত, তার ওপর ঢালা হত গরম গোলাপ জল; এরপর সেই ফেনা একটি একটু করে জমানো হত আতরদানে; আর এভাবেই জন্ম জাহাঙ্গিরী আতরের। এই আতরের এক ফোঁটা হাতে লাগালে নাকি হাজারো মানুষের মজলিসে জেগে উঠত গুলবাগ। এমন সে সুগন্ধ, যার টানে নাকি হারিয়ে যাওয়া আত্মারাও ফিরে আসত।
আমিও যেন এক হারানো আত্মার মতো দিল্লি এসেছিলুম। নাকি একটা খোয়াবের মতো, কি মনে হয় আপনাদের? আমার জীবনটা কী, বলুন? একটা খোয়াবই, তবু আমি তো গায়েগতরে একটা মানুষই ছিলাম। না কী? আমি আল্লার খোয়ব-বদখোয়াব। কিন্তু আল্লা কেন এই বদখোয়াব দেখেছিলেন জানেন? তিনি জানতেন, আমি এই দুনিয়াতে সেই কবিতা নিয়ে আসব, তার ভেতর দিয়ে একের পর এক আয়নামহল পেরিয়ে যাবেন আপনারা। আর দেখবেন, কীভাবে বদলে বদলে যাচ্ছে আপনাদের হকিকত। আমার অস্তিত্ব ধুলোর মত আয়নামহলের মেঝেতে ছড়িয়ে থাকবে। সেই ধুলো, যা দিয়ে আল্লা প্রথম মানুষ তৈরী করেছিলেন।
কোন্ কথা থেকে কোন্ কথা এসে গেল। আচ্ছা মান্টোভাই, আমি তো আপনাদের শাহজাহানাবাদে আসার কথা বলছিলুম? হ্যাঁ, তাই তো বলছিলুম, না হলে আর খুশবুর কথা আসবে কেন? শব্দের জগৎ বড় মজার জানেন তো? এই যে বলেছিলুম না, যে, বদনসিব আত্মাদের বলা কথা শুনতে শুনতে আমি শাহজাহানাবাদে এসেছিলুম, তাই তো এসে গেল খুশবুর কথা। আত্মারা হল গিয়ে এক-একটা খুশবু। কিন্তু এই খুশবু আপনি কোন মুঘল জাঁহাপনার খুশবুখানায় পাবেন না। এ হল গিয়ে আল্লার তৈরি খুশবু। প্রতিটি আত্মাকে। খোদাতালা নতুন নতুন খুশবু দেন। কোনও কোনও খুশবু এই দুনিয়ার তৈরি আতরের সঙ্গে মিলে যায়। তাই সেই খুশবু এই দুনিয়াতেও থাকে আবার জন্নতেও থাকে। কী হল বলুন তো মান্টোভাই, শাহজাহানাবাদে আসার কথা বলতে গিয়ে কেন বার বার আগ্রার দিনগুলোর কথা। মনে পড়ছে এই কবরে? মীরসাব তো কবেই বলে গেছেন:
বসীয়ৎ মীরনে মুঝকো য়হী কী
কেহ্ সব কুছ হোনা তু, আশিক নহ্ হোনা।।
প্রেমের কথা যখন উঠলই, আর মীরসাব যখন বলে গেছেন, আর যা কিছু হতে চাও হও, কিন্তু প্রেমিক কিছুতেই নয়, মীরসাবের দিবানা হওয়ার কথাটাই না হয় বলে নিই। হয়তো ভুলে যাব, আর কখনও বলাই হবে না, তাই গোস্তাকি মাফ করবেন,আমি মীরসাবের যন্ত্রণার কথাটা এই ফুরসতে বলে নিতে চাই। দোজখের আত্মবন্ধুরা আমার, এভাবেই চলুক না আমাদের কথাবার্তা; এগিয়ে পিছিয়ে-হারিয়ে গিয়ে, যেন কোনও ঢেউয়ের পর আর এক ঢেউ আসছে, বুঝতেই পারা যায় না। কী হল, আপনারা সবাই উঠে বসলেন কেন? কেমন এক অন্ধকার ছায়া নেমে এসেছে আপনাদের মুখে। কী হয়েছে মান্টোভাই? আমি কি কোনও ভুল করলুম? একের পর এক ভুল করতে করতেই তো কেটে গেল আমার জীবন। উমরাও বেগম একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, মির্জাসাব, আপ কওন হ্যায়?
-মতলব?
-আপনি কে?
আমি হা হা করে হেসে উঠেছিলুম।-নোক্তা, বেগম, ম্যায় তো এক নোক্তা হুঁ।
-নোক্তা?
নোক্তা-বিন্দু-কখন, কোথায় বসবে, কখন কোনদিকে সেই বিন্দু থেকে রেখা টানা হবে, তা কে জানে বলুন, মান্টোভাই? কিন্তু আপনারা এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন সবাই? কী ভুল করেছি আমি? আচ্ছা, আমাকে একটু থামতে দিন, ভেবে দেখি, আমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারব, কোথায় আমার ভুল, একটু সময় দিন..
.
হ্যাঁ, শাহজাহানাবাদে আসার কথাই আমাকে আগে বলে নিতে হবে। ওরা সবাই আমার সঙ্গে কথা বলে গেল এখনই, সে আত্মারা, দিল্লিতে আসবার দিন ওরাই তো আমার সঙ্গে কথা বলেছিল। ওরা বলল, বুরবাক, আমাদের কথা আগে না বললে, তোমার কথা কেউ শুনবে না।
-কেন?
-মাটির গভীরের কথাই তো মানুষ আগে শুনতে চায়। আর আমরা সেই গভীরে-
-তোমরা কোথায় শুয়ে আছ?
-দিল্লির মাটির নীচে। আমদের কথা আগে বলো। এই শহরটা তো আমাদের রক্তমাংসের। ভিতের ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে। মীরসাবের কথা কে না জানে? আমরা তো বেখবর, আমাদের কথা তুমি না বললে, কে বলবে? শাহজানাবাদে তুমি যেদিন এলে, সেদিন কারা কথা বলেছিল তোমার সঙ্গে? কে চিনত তোমাকে আসাদ? আমরাই তো কথা বলেছিলাম। আমি এখন তাদের কথা বলছি, আপনারা দিমাক জাগিয়ে রেখে শুনুন। এ এক শহর আফশোসের কিস্সা-দুঃখে তার জন্ম, দুঃখেই তার মৃত্যু। সেই মৃত্যু আমি দেখেছি, মান্টোভাই, সেসব কথা আমি বুদ বুদ বলে যাব। বলে যেতেই হবে। এই শহরই তো আমার শরীর। আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না, চাঁদনি চক ছিল আমার মেরুদণ্ড, কিলা-ই-মুয়াল্লা আমার এই বেঢপ মাথাটা, আর দিল? সে তো জামা মসজিদ, এটুকু তো বোঝেন? কিলা-ই-মুয়াল্লার মুখ পশ্চিমে, মক্কার দিকে। চাদনি চক পশ্চিমে, আবার জামা মসজিদের মুখও পশ্চিমে। শহরের দরজাগুলো হল বিশ্বরুপ। চারদিকের দরজাগুলো তো আসলে জন্নতের চার দরওয়াজা। জামা মসজিদের সামনে বসেই আমি প্রথম খাজা মইনুদ্দিন চিস্তির কিস্সা শুনেছিলাম। খাজা কী বলেছিলেন জানেন? আয়নায় কার মুখ? আমার আত্মার পটে কোন সৌন্দর্য এসে ধরা দিল? এই মহাবিশ্বকে কে সাজিয়েছে। প্রতিটি অনুতে প্রতিবিম্বিত কে? প্রতিটি বালুকণাকে আলোয় ভরিয়ে দেয় কে? আমি তো মাংস দেখি, মজ্জার মধ্যে লুকিয়ে আছে কে? আত্মার শান্তির গান গায় কে? সে নিজেকেই দেখে নিজেকেই ভালবাসে। কে সে? কে সে? তিনি গরিব নওয়াজ। ভুখা মানুষের বন্ধু।
